ঢাকা | বঙ্গাব্দ

অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি সরকার, RTI-এ ফাঁস তথ্য

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 23, 2026 ইং
অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি সরকার, RTI-এ ফাঁস তথ্য ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

নির্বাচনী পর্ষদের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার খামখেয়ালি আচরণের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কেন্দ্রীয় প্রশাসন। এমনকি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করা সত্ত্বেও কোনো প্রকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। একটি তথ্য অধিকার আইনের আবেদনের প্রেক্ষিতে এই সমস্ত তথ্য জনসমক্ষে চলে এসেছে। আইনসম্মত পন্থায় প্রকাশিত সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই করতে চেয়ে আবেদনটি করেছিলেন জনৈক সমাজকর্মী কমোডর লোকেশ কে বাত্রা।

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রথম এই বিরোধের কথা প্রকাশ পায়। সেখানে জানানো হয়েছিল যে, নির্বাচন কমিশনের স্বৈরাচারী মনোভাবের প্রতিবাদে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি। প্রধান এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ উপনির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কার্যপ্রণালী নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তাঁরা ক্যাবিনেট সচিবের দপ্তরে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছিলেন। তথ্য কমিশনার পরে এই ধরনের পত্র প্রেরণের বিষয়টি সত্য বলে স্বীকার করে নেন।

তথ্য অধিকার আইনের উত্তর অনুযায়ী, তৎকালীন ক্যাবিনেট সচিব টিভি সোমনাথন ওই চিঠিপত্র হাতে পাওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি ওই অভিযোগপত্রের প্রতিলিপি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের দপ্তরেও পাঠিয়েছিলেন।

তবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরেও ক্যাবিনেট সচিবালয় কিংবা প্রধান নির্বাচন কমিশনার—কারও পক্ষ থেকেই অভিযুক্ত জ্যেষ্ঠ উপনির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ জুলাই ক্যাবিনেট সচিব বরাবর পৃথকভাবে দুটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার। কমোডর লোকেশ কে বাত্রার বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে জানানো হয় যে, ক্যাবিনেট সচিব ওই দুটি চিঠিকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বতন্ত্রভাবে বিবেচনা করেছিলেন।

সচিবের সেই সময়কার অবস্থান ছিল যে, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই চিঠিগুলো পাঠানো হয়নি। দুই কমিশনার নিজ নিজ অবস্থান থেকে পৃথকভাবে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ফলে সেই অভিযোগগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হলেও, সচিবালয় কমিশনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানো সমীচীন মনে করেনি, যেহেতু পূর্ণাঙ্গ কমিশনের অনুমোদন নিয়ে চিঠিগুলো ইস্যু করা হয়নি।

তা সত্ত্বেও, উক্ত চিঠিগুলো পাওয়ার সত্যতা ক্যাবিনেট সচিবের কার্যালয় পুরোপুরি নিশ্চিত করেছে। তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের প্রধান ব্যক্তিগত সচিবের দপ্তরে সংশ্লিষ্ট পত্র দুটির অনুলিপিও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

অভিযোগপত্রে দুই কমিশনার সান্ধু ও যোশি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছিলেন যে, জ্যেষ্ঠ উপনির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কোনো কিছু না জানিয়েই নিজের মতো করে কাজকর্ম পরিচালনা করছিলেন। তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত এককভাবে নিচ্ছিলেন। তাঁদের বিচারবুদ্ধিতে এই ধরনের আচরণ সম্পূর্ণ ‘স্বৈরাচারী’ মানসিকতার পরিচায়ক ছিল। তাঁদের কোনো প্রকার অবগতির তোয়াক্কা না করেই মণীশ গর্গ ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার, ডিরেক্টর জেনারেল এবং অন্যান্য অধীনস্থ কর্মচারীদের মধ্যে দপ্তরের কাজ বণ্টন করে দিয়েছিলেন।

কমিশনার বিবেক যোশি তাঁর পাঠানো পত্রে এ কথাও জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন যে, জরুরি ভিত্তিতে কোনো ফাইল তলব করা হলেও কমিশনের প্রশাসনিক বিভাগ ইচ্ছাকৃতভাবে তা তাঁকে সরবরাহ করছিল না।

এই চিঠি পাঠানোর ঘটনা এবং ক্যাবিনেট সচিবালয়ের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে একাধিক জটিল প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দুই কমিশনার আলাদাভাবে চিঠি দিলেও তাঁরা নিজেদের পদের কোনো অপব্যবহার করেননি। তাছাড়া উভয়ের আনা অভিযোগের মূল সুর ও প্রকৃতি ছিল একইরকমের।

এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে যে, ক্যাবিনেট সচিব সোমনাথন কেন সেই অভিযোগগুলোকে দাপ্তরিক বা আনুষ্ঠানিক হিসেবে গণ্য করলেন না? কেন তাঁর মনে হলো যে কমিশনাররা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই অভিযোগগুলো দায়ের করেছেন? নির্বাচন কমিশন তো মূলত একটি তিন সদস্যের সমষ্টিগত প্রতিষ্ঠান। সেখানে দুজন সদস্য যখন অপর একজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনছেন, তখন তা গ্রাহ্য না করে কেন বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হলো?

দ্বিতীয়ত, দুই নির্বাচন কমিশনার কেন তাঁদেরই অধস্তন একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে সরাসরি ক্যাবিনেট সচিবের কাছে চিঠি পাঠাতে গেলেন? মণীশ গর্গের নিয়োগকর্তা কর্তৃপক্ষ কি ক্যাবিনেট সচিবালয়? তাঁরা কেন কমিশনের ভেতরে বসে এই কর্মপদ্ধতির অসংগতিগুলো মিটিয়ে নিতে পারলেন না? এই সমস্ত আলোচনার মধ্য থেকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ওপর দুই কমিশনারের গভীর আস্থার অভাবের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সামনে চলে আসছে।

বিভিন্ন মহলে এই দাবিও জোরালো হচ্ছে যে, ক্যাবিনেট সচিব পুরো বিষয়টি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের গোচরীভূত করা সত্ত্বেও তা নিয়ে কমিশনের অন্দরে কোনো আলোচনা হয়েছিল কি না, আর যদি না হয়ে থাকে তার পেছনের কারণ কী, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধীসহ অন্যান্যদের দায়ের করা আবেদনের ভিত্তিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ইতিমধ্যেই মামলা দায়ের হয়েছে। সেই বিচারাধীন মামলায় জ্ঞানেশ, সান্ধু ও যোশিকে নোটিশও পাঠানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আদালতের পরবর্তী শুনানির সময় এই প্রসঙ্গগুলো আবারও বিস্তারিতভাবে আলোচিত হবে।

নির্বাচন কমিশনের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সেই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে চলা ‘জ্ঞানেশ হটাও’ ও ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া বাতিলের আন্দোলনকে দেশের প্রধান শাসক দল বিজেপি একটি গভীর বিদেশি ষড়যন্ত্র ও দেশবিরোধী শক্তির চক্রান্ত হিসেবে দেখছে।

দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নেতারা এই কথিত চক্রান্তের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালোভাবে সোচ্চার হয়েছেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশন আজ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোকে মিথ্যা বলে দাবি করেনি। এমনকি একটি মাত্র অভিযোগও তারা এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে খণ্ডন করতে পারেনি। উল্টো তাদের দৈনন্দিন আচরণ এবং একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগই সম্পূর্ণ সত্য।

সহকর্মী দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশিকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার একাই বহু গুরুত্বপূর্ণ ও দূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। আর এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তিনি বহু ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, নতুন ভোটারদের অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত ‘ফর্ম ৬’-এর নিয়মে পরিবর্তন আনা কিংবা ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আইনি অধিকার প্রদানকারী ‘ফর্ম ৭’-এর ব্যাপক অপব্যবহারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ জোগানোর মতো ঘটনা রয়েছে।

নির্বাচনী ব্যবস্থার এই সমস্ত গুরুতর অসংগতি ও ত্রুটিগুলো অবিলম্বে দূর করার জন্য বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকরা কমিশনের কাছে দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত কোনো প্রতিকার মেলেনি এবং কমিশনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলেই রয়েছে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
মিরকাদিমে ইলিশের ঝিলিক, দামও চড়া

মিরকাদিমে ইলিশের ঝিলিক, দামও চড়া