ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ব্যবসায়ে বরকত ও কল্যাণ অর্জনের তিন দিক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 26, 2026 ইং
ব্যবসায়ে বরকত ও কল্যাণ অর্জনের তিন দিক ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সাধারণত বাণিজ্য পরিচালনার প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে অতিরিক্ত মুনাফা বৃদ্ধি কিংবা অংশীদারদের লভ্যাংশ সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করার ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়ে থাকে। পবিত্র ইসলামি জীবনব্যবস্থায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পরিসর কেবল আর্থিক লাভ ও লোকসানের হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি।

ইসলামের দৃষ্টিতে বাণিজ্য কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি সামগ্রিকভাবে জনসমাজকে সেবা প্রদান এবং সেখানে সার্বিক কল্যাণ ও ইতিবাচক পরিবর্তন সাধনের একটি অন্যতম প্রধান পথ।

কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যদি প্রচুর অর্থ বা সম্পদ অর্জন করে অথচ তার কার্যক্রমের ফলে পরিবেশ ধ্বংস হয়, বাজারে ভেজাল পণ্য বিক্রি হয় অথবা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, তবে ইসলামি নীতিমালায় সেই বাণিজ্য তার মূল উদ্দেশ্য অর্জনেই সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলে বিবেচিত হয়।

একজন প্রকৃত মুসলিম উদ্যোক্তা যখন এই সুমহান নিয়ত ও উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন যে তাঁর কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজের সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধিত হবে এবং তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে হালাল পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করবেন, তখন সেই সাধারণ বাণিজ্যিক উদ্যোগটিও তাঁর জন্য মহান আল্লাহর ইবাদতে রূপান্তরিত হয়।

সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীদের মর্যাদা এবং পরকালীন অবস্থান সম্পর্কে মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন যে, সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী হাশরের ময়দানে নবীগণ, সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিগণ এবং শহীদগণের সঙ্গে একত্রে অবস্থান করবেন, যা সুনানে তিরমিজির ১২০৯ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

একজন মুমিন ব্যক্তির দৈনন্দিন ব্যবসা-বাণিজ্যে কীভাবে প্রকৃত বরকত নেমে আসতে পারে, তার বিশেষ তিনটি কারণ ও দিকনির্দেশনা নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কেবল অর্থ উপার্জনের চেয়েও সবচেয়ে কঠিন দিক হলো প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে নৈতিক সৌন্দর্য বা ইহসান এবং ইনসাফ বা ন্যায়পরায়ণতা পূর্ণ মাত্রায় বজায় রাখা, এমনকি যদি এর জন্য কোনো ব্যক্তিকে সাময়িক আর্থিক লোকসানের মুখোমুখিও হতে হয়।

সাধারণ বা প্রচলিত লাভ-লোকসানের হিসাব-নিকাশের মানদণ্ডে এটিকে অনেক সময় সম্পূর্ণ অযৌক্তিক কোনো আর্থিক ক্ষতি বলে মনে হতে পারে, কিন্তু মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ট ও নিখুঁত বিচারে এই আন্তরিক ভালোবাসাই মূলত সংশ্লিষ্ট ব্যবসাকে বরকতময় ও কল্যাণকর করে তোলে।

অভিজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে দেখা যায় যে, কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় চুক্তিবদ্ধ কোনো শ্রমিক কিংবা সাব-কন্ট্রাক্টর যদি কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন, তবে প্রচলিত রাষ্ট্রীয় আইন সাধারণত সেই উদ্যোক্তাকে কোনো বাড়তি আর্থিক সহায়তা প্রদানে বাধ্য করে না।

কিন্তু একজন মুমিন বা বিশ্বাসী উদ্যোক্তা কেবল নিজের আত্মিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই সেই অসহায় ও বিপন্ন কর্মীর চিকিৎসা ও সহায়তা নিয়মিতভাবে চালিয়ে যান।

পবিত্র আল-কোরআনে মহান আল্লাহ অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে নির্দেশ দিয়ে এরশাদ করেছেন যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সর্বদা ইনসাফ, ইহসান বা উত্তম আচরণ এবং নিকটাত্মীয়দের যথাযথ দানের নির্দেশ প্রদান করেন, যা সুরা নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানে নতুন কর্মী নিয়োগ বা মানবসম্পদ নীতি বা এইচআর পলিসি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়ত মূলত মূল দুটি বিষয়ের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করে থাকে, যার একটি হলো কাজের দক্ষতা এবং অন্যটি হলো পূর্ণ সততা বা আমানতদারি।

পবিত্র কোরআনে হজরত শোআইব (আ.)-এর কন্যার একটি বিশেষ উক্তির চমৎকার উপস্থাপনের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের এই শাশ্বত মূলনীতি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছিল যে, তাদের একজনের পক্ষ থেকে বাবাকে বলা হলো, আপনি তাঁকে মজুরি প্রদান করে নিজের প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত করুন; কারণ আপনার মজুর হিসেবে যাঁদের নিয়োগ করা হয়েছে তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যিনি একই সঙ্গে অত্যন্ত শক্তিশালী বা দক্ষ এবং পূর্ণ বিশ্বস্ত, যা সুরা কাসাসের ২৬ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।

কোনো কর্মী যখন কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর যথাযথভাবে খাপ খাইয়ে চলতে পারেন না অথবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবশ্যকতা দেখা দেয়, তখন তাঁকে হঠাৎ বা আকস্মিক চাকরিচ্যুত না করে বরং সম্মানজনক উপায়ে বিদায় জানানো উচিত।

একইভাবে, কোনো কর্মী যখন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হন এবং তাঁকে বাদ দিতে হয়, তখন আকস্মিক কর্মহীন না করে পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে বিদায় দেওয়া বাটার পাশাপাশি তাঁকে নতুন কর্মসংস্থান খুঁজে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সুনির্দিষ্ট সময় ও সুযোগ প্রদান করা অত্যন্ত মহৎ একটি মানবিকতার পরিচয় বহন করে।

বাণিজ্য কেবল বস্তুগত অর্থ কামানোর কোনো যন্ত্র নয়; এটি মূলত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার এবং সাধারণ বান্দাদের নিঃস্বার্থভাবে সেবা করার একটি অন্যতম ইবাদত।

ব্যবসা-বাণিজ্য ও উপার্জনে বরকত ও কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে মহান প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিদিন সকালের সূচনার সময় একটি বিশেষ দোয়া নিয়মিত পাঠ করার সুমহান শিক্ষা প্রদান করেছেন।

দোয়াটির বাংলা উচ্চারণ হলো: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআ, ওয়া রিজকান তাইয়্যিবা, ওয়া আমালান মুতাকাব্বালা।’

এই দোয়াটির সুনির্দিষ্ট বাংলা অর্থ হলো: ‘হে আল্লাহ! আমি একান্তভাবে আপনার কাছে প্রার্থনা করছি উপকারী জ্ঞান, পবিত্র ও হালাল রিজিক এবং আপনার দরবারে গ্রহণযোগ্য আমল।’ যা সুনান ইবনে মাজাহর ৯২৫ নম্বর হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।

আসুন, আমরা সকলে আমাদের দৈনন্দিন ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি পদক্ষেপে কেবল বস্তুগত ও পার্থিব লাভের পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে নীতি-নৈতিকতা, আমানতদারি, কর্মচারীদের প্রতি অকৃত্রিম দয়া এবং সামাজিক কল্যাণের এই অনন্য বরকত সংস্কৃতি গড়ে তুলি। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলের উপার্জনে এবং ব্যবসায়িক সকল প্রচেষ্টায় বরকত দান করুন।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলেন পিএসসির দুই সদস্য

ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলেন পিএসসির দুই সদস্য