নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষায় প্রথম দিকে বেশ বড় ধরনের ভুল ও সিদ্ধান্তহীনতার মুখে পড়তে হয়েছিল আসিফ মোক্তাদিরকে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি সেমিস্টারে ২০ থেকে ২২ ক্রেডিট নেওয়ার অভ্যাস থাকলেও, আমেরিকার সাধারণ ১২, ১৫ বা ১৮ ক্রেডিটের নিয়মটি তখন তিনি বুঝতে পারেননি।
জেদের বশে সেবার অত্যন্ত কঠিন কিছু কোর্স বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ভাষার প্রতি জড়তা, সম্পূর্ণ অপরিচিত এক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে চলা, পার্টটাইম কাজের পাশাপাশি পড়াশোনার চাপ এবং জীবনযাত্রার ভারসাম্য রক্ষা করা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত দুরূহ হয়ে উঠেছিল।
কঠিন সেই দিনগুলোতে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছা তাঁর ছিল না, বরং কোনোমতে পাস করে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষার ফলাফল হাতে পাওয়ার পর তাঁর মনে মারাত্মক সংশয় তৈরি হয়েছিল যে তিনি আদৌ পড়াশোনাটা চালিয়ে নিতে পারবেন কি না।
এত কষ্ট করে স্বপ্নের দেশে পাড়ি জমিয়ে এই সুবর্ণ সুযোগটি তিনি কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চাননি। ছোটবেলার সুপ্ত বাসনা এবং মা-বাবার লালিত স্বপ্নগুলোর কথা সবসময় তাঁর অনুভবের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে শুরু করেন। পাশাপাশি আমেরিকান সহপাঠীদের কাছে তাদের পড়াশোনার পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চান এবং তারা কীভাবে প্রস্তুতি নেয় তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
এই ধারাবাহিক চেষ্টার ফলে একসময় পড়াশোনার একটি নির্দিষ্ট ধারা বা কৌশল তাঁর আয়ত্তে চলে আসে এবং পরবর্তীতে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে তিনটি ডিনস অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ফিজিশিয়ান অ্যাসোসিয়েট স্টাডিজের ওপর মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এই বিশেষ ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে চিকিৎসকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে রোগীর চিকিৎসাসেবা প্রদান, প্রেসক্রিপশন তৈরি এবং বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক টেস্টের আদেশ দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা যায়।
মাস্টার্স শেষ করার পর তিনি মেডিকেল সায়েন্সের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করেন। বর্তমানে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের পাবলিক হেলথ বিভাগে প্রথম সেমিস্টারে অধ্যয়নরত আছেন।
আইভি লিগের যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য তাঁর আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিবাচক ফলাফল আসার পর তাঁর আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
তবে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময় তিনি মনে মনে স্থির করে রেখেছিলেন যে, যদি শেষ পর্যন্ত হার্ভার্ডে সুযোগ না মেলে, তবে তিনি আর নতুন করে কোথাও পড়াশোনা শুরু করবেন না।
বোস্টন শহরটি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ভীষণ পছন্দ এবং এর পাশাপাশি হার্ভার্ডের বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ভ্যালু ও পৃথিবীজুড়ে বিস্তৃত শক্তিশালী অ্যালামনাই নেটওয়ার্কের কথা তিনি বিবেচনায় রেখেছেন।
এখানে নিয়মিত বিশ্বমানের বড় বড় বিজ্ঞানী ও বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন সেমিনারে অংশ নিতে আসেন। এ ছাড়া আরেকটি বিশেষ আকর্ষণের জায়গা হলো ক্রস-রেজিস্ট্রেশন সুবিধা, যার মাধ্যমে পাবলিক হেলথে পড়াশোনা করেও বিজনেস স্কুল, মেডিকেল স্কুল এমনকি এমআইটিতে গিয়েও ক্লাস করার সুযোগ পাওয়া যায়।
ভর্তির যোগ্যতার বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান যে, বিশেষ করে মাস্টার্সের ক্ষেত্রে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজ বা সহশিক্ষা কার্যক্রম, স্নাতকের সিজিপিএ, স্টেটমেন্ট অব পারপাস বা এসওপি এবং রেকমেন্ডেশন লেটারের মান অত্যন্ত চমৎকার হওয়া প্রয়োজন।
হার্ভার্ড কেবল প্রচলিত জিপিএ বা ফলের ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থী বাছাই করে না, বরং তারা জানতে চায় কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনার পেছনে আপনার প্রকৃত উদ্দেশ্য বা আগ্রহ কী।
অনেক শিক্ষার্থীই আবেদনের এক সপ্তাহ বা এক মাস আগে এসওপি লেখা শুরু করার ভুল করেন, যদিও অনেকে চার থেকে ছয় মাস আগে শুরু করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
তবে তাঁর সুনির্দিষ্ট পরামর্শ হলো, যত দ্রুত সম্ভব এই লেখালেখির কাজ শুরু করা উচিত, কারণ বারবার এটি সংশোধন বা এডিট করার প্রয়োজন হয়।
অ্যাডমিশন রিভিউ কমিটি বা ভর্তি পর্যালোচক দল তো দূর থেকে আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনে না, তাই আপনার লেখা এসওপি-ই একমাত্র মাধ্যম যার মাধ্যমে তাদের কাছে নিজের পরিচয় ফুটিয়ে তুলতে হয়।
কোনোভাবেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অনলাইন থেকে কোনো টেমপ্লেট হুবহু কপি করা যাবে না, কারণ আপনার জীবনের প্রেক্ষাপট আর অন্য দশজনের প্রেক্ষাপট কখনো এক হতে পারে না।
জীবনের কোন বিশেষ ঘটনা বা অভিজ্ঞতা আপনাকে এই নির্দিষ্ট বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য অনুপ্রাণিত করেছে, সেই মৌলিক গল্পটি লেখার ভেতরে ফুটিয়ে তুলতে হবে।
যদি কখনো প্রাতিষ্ঠানিক সিজিপিএ কিছুটা কম থাকে, তবে সেই নেতিবাচক দিকটির পেছনের কারণ এসওপিতে সংক্ষেপে ও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।
‘আমি খুব পরিশ্রমী মানুষ এবং সমাজকে সাহায্য করতে চাই’—এ ধরনের গতানুগতিক বা জেনেরিক কথা লিখে আবেদন করলে কোনো লাভ হবে না।
লেখাটি এমন মুন্সিয়ানায় ফুটিয়ে তুলতে হবে, যাতে তা পড়ে রিভিউ কমিটি যেন নিজের থেকেই বলতে বাধ্য হন যে, এই নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীকেই তারা তাদের বিভাগে পেতে চান।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর