নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
জাল ও বানোয়াট ভাউচারের ওপর নির্ভর করে ইউনিয়ন পরিষদের মোট পঞ্চান্নটি ভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেবল এই অনিয়মের মাধ্যমেই শেষ হয়নি, বরং অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণের জন্য নির্ধারিত বিশেষ কর্মসূচিতে এমন সব ব্যক্তিদের শ্রমিক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে যাঁরা বাস্তবে মৃত কিংবা বর্তমানে দেশের বাইরে প্রবাসী হিসেবে অবস্থান করছেন। পরবর্তীতে এই মৃত ও প্রবাসীদের নামে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনপূর্বক সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
উক্ত দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন এবং তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কুড়িজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্ত এনায়েত হোসেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা রাজনৈতিক সংগঠনের স্থগিত হওয়া কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার দুর্নীতি দমন কমিশন চট্টগ্রামের নিজস্ব কার্যালয়ে বসে উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বাদী হয়ে এই দুটি পৃথক মামলা করেন।
মামলা দায়েরের সত্যতা সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করে দুর্নীতি দমন কমিশন চট্টগ্রামের উপপরিচালক রিয়াজ উদ্দিন জানান, অভিযুক্ত সাবেক চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা পরস্পর মিলে মৃত এবং প্রবাসে অবস্থানরত ব্যক্তিদের শ্রমিক সাজিয়ে ইজিপিপি প্রকল্পের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। পাশাপাশি ২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সালের দীর্ঘ সময়সীমায় ইউনিয়নটিতে রূপায়ণের উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা নানান প্রকল্পে কৃত্রিম ভাউচার তৈরি ও অন্যান্য দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এসব অপরাধমূলক কাজের জন্যই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রতিটি মামলাতেই প্রধান আসামি হিসেবে নাম রয়েছে এনায়েত হোসেনের।
তদন্তকারী সংস্থার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের এক শতাংশ কর থেকে প্রাপ্ত অর্থে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই প্রকল্পগুলোর যাবতীয় কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের বক্তব্য নেওয়ার মাধ্যমে দুর্নীতির শক্ত প্রাথমিক প্রমাণ পায় দুর্নীতি দমন কমিশন। বিস্তারিত অনুসন্ধানের সময় প্রকল্পগুলোর প্রায় সব ভাউচারই জাল বলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। মূলত কোনো ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেই ভুয়া ভাউচার বানিয়ে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে মামলার বিবরণে।
তদন্তের সময় ভাউচারে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত মালিকেরা দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাদের স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ওই সমস্ত কাগজপত্রে থাকা হাতের লেখা কিংবা স্বাক্ষর কোনোটিই তাঁদের নিজস্ব নয়। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাগুলোর কার্যবিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নথিপত্রের মধ্যে চেয়ারম্যান ও নির্দিষ্ট ইউপি সদস্যদের বাইরে কমিটির বাকি সদস্যদের অধিকাংশ স্বাক্ষরই জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
উল্লেখ্য যে, এক শতাংশ করের অর্থে গ্রহণ করা পঞ্চান্নটি প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সার্বিক তদারকি করার মূল দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন সাবেক চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন এবং তাঁর সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যরা। তাঁদের সবার পারস্পরিক যোগসাজশ ও সুপরিকল্পিত প্রবঞ্চনার মাধ্যমেই প্রকল্পের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাল ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের দায়ে অভিযুক্ত এনায়েত হোসেন ওরফে নয়ন ছাড়াও এই মামলাগুলোর অন্যান্য আসামিরা হলেন করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সংরক্ষিত নারী সদস্য কল্পনা রানী চক্রবর্তী, শেলী মজুমদার, তাহেরা বেগম এবং সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আবু তাহের, মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ, মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, ফেয়ার মিয়া মিন্টু, মোহাম্মদ আজাদ উদ্দিন ও কোরবান আলী।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ইজিপিপি প্রকল্পের ত্রিশ লাখ আটাশি হাজার টাকা অবৈধভাবে আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে আলাদা আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে বলা হয়েছে যে, সম্পূর্ণ কাল্পনিক এবং মৃত ব্যক্তিদের শ্রমিক হিসেবে কাগজপত্রে দেখিয়ে তাঁদের নামে ব্যাংক থেকে সরকারি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। এমনকি বহু প্রকৃত শ্রমিকের নিয়মিত মজুরির অর্থও তাঁদের হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে জানা যায়, মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের পশ্চিম জোয়ার এলাকায় বসবাসকারী মোহাম্মদ হারুন ২০১৮ সালের চৌদ্দই সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেছিলেন। অথচ অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তাঁর মৃত্যুর দীর্ঘ সময় পর অর্থাৎ ২০১৯ সালের উনত্রিশে এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের উনচল্লিশে জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে মোট চল্লিশ হাজার পাঁচশ টাকা উত্তোলন করা হয়। এই ঘটনাটি জানার পর মৃত ব্যক্তির স্ত্রী হাসিনা বেগম চরমভাবে বিস্মিত হন। ঠিক একই কায়দায় এলাকার আরেক বাসিন্দা মোস্তফার মৃত্যুর পর তাঁর ব্যাংক হিসাব থেকেও একইভাবে অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক থেকে এভাবে টাকা তুলে নেওয়ার বিষয়ে তাঁদের পরিবার সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিল এবং তারা কিছুই জানতেন না বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন মোস্তফার স্ত্রী শামসুন নাহার।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর