নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ভারতের চার রাজ্যের সাম্প্রতিক বিধান পরিষদের নির্বাচনী ফলাফল দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দল বিজেপি এবং কংগ্রেস—উভয় শিবিরকেই গভীর ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির উদ্বেগের মূল কারণ হলো, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজস্ব লোকসভা নির্বাচনী আসন বারানসি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের প্রধান কার্যালয় নাগপুর—উভয় জায়গাতেই তাদের পরাজয় ঘটেছে। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, ভোট হওয়া মোট ২৮টি আসনের মধ্যে একমাত্র নাগপুর বাদে দেশের আর কোথাও তারা কোনো বিজয় অর্জন করতে পারেনি।
কংগ্রেসের জন্য সবচেয়ে বড় হতাশার চিত্রটি ফুটে উঠেছে কর্ণাটক রাজ্যে, অথচ বর্তমানে সেখানে তাদের নিজেদের সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। এই দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া বিধান পরিষদের চারটি আসনের প্রতিটিতেই কংগ্রেস প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। গত বুধবার এই নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা পোস্ট করে কংগ্রেস দলকে তীব্র ভাষায় কটাক্ষ করেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হ্যান্ডেলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লিখেছেন যে উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার ও কর্ণাটক—এই চার বড় রাজ্যে বিধান পরিষদের মোট ২৮টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে এই নির্বাচনটি সম্পূর্ণভাবে ব্যালট পেপারের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে। এরপর তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে জানতে চান যে এই নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস দল মোট কয়টি আসন নিজেদের দখলে নিতে পেরেছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই তীব্র কটাক্ষের পেছনে প্রধানত দুটি বড় কারণ কাজ করেছে, যার একটি হলো নির্বাচনে কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয় এবং অন্যটি হলো ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের বিরুদ্ধে দলটির লাগাতার সমালোচনা। বিগত দিনে কংগ্রেস দল বিভিন্ন নির্বাচনে ‘ভোট চুরি’র গুরুতর অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশন পাশাপাশি ইভিএম ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে আসছে।
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বরাবরই দাবি করা হয়ে আসছে যে নির্বাচন কমিশন ইভিএমে কারচুপি করে থাকে এবং সেই কারণে তারা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের বদলে ব্যালট পেপারে ভোট গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছিল। এবারের বিধান পরিষদের নির্বাচনটি যেহেতু ব্যালট পেপারের মাধ্যমেই অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সুযোগ পেয়ে কংগ্রেসকে সেই বিষয়টি অত্যন্ত সুকৌশলে স্মরণ করিয়ে দিতে ভুল করেননি।
অবশ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই কটাক্ষমূলক মন্তব্যটি প্রকাশ করেছিলেন, তখনো মহারাষ্ট্রের নাগপুর আসনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। পরবর্তীতে গভীর রাতে যখন সমস্ত ভোট গণনা শেষ হয়, তখন দেখা যায় যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মূল ঘাঁটি এবং মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশের নিজের নির্বাচনী আসন নাগপুরে কংগ্রেসের প্রার্থী অভিজিৎ ওয়াংজারি ৩ হাজার ২৭১ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন।
নাগপুর আসনের এই ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পরপরই কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী মোদির সেই কটাক্ষের কড়া জবাব দেওয়া হয়। দলের জাতীয় মুখপাত্র পবন খেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা লিখে জানান যে মোদি সাহেব নিজের লোকসভা আসনের অন্তর্গত বিধান পরিষদ আসনটি হারিয়েছেন এবং নাগপুরেও খোদ বিজেপি পরাজিত হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন যে এই পরিস্থিতিতে এখন নাগপুরে কারা জয়ী হয়েছে তা দেশবাসী দেখতে পাচ্ছে।
এদিকে এবারের নির্বাচন বিজেপির পক্ষেও উত্তর প্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বড় ধরনের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে অবশিষ্ট রয়েছে। ভারতের জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে মোট ১১টি আসনে বিধান পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যার মধ্যে বিজেপি জেকেছে মাত্র ৬টিতে। বাকি ৫টি আসন চলে গেছে সমাজবাদী পার্টি বা এসপির দখলে, যারা বিগতবারের তুলনায় এবার অতিরিক্ত ২টি আসন নিজেদের ঝুলিতে পুরেছে।
যে রাজ্যে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে পরবর্তী বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, সেই রাজ্যের বারানসির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসনে সমাজবাদী পার্টির কাছে বিজেপির হার এবং এসপির আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনাটি রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর চেয়েও বড় কথা হলো, বারানসিতে যে দুটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়েছিল, সেখানকার মূল ভোটার ছিলেন সমাজের শিক্ষক সমাজ এবং উচ্চশিক্ষিত স্নাতকেরা।
শিক্ষিত ও সচেতন এই ভোটারদের দলগতভাবে বিজেপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত ইঙ্গিতবাহী ও গভীর ভাবনার বিষয়। ভারতের বিধান পরিষদের গঠনপদ্ধতি অনুযায়ী, এই উচ্চকক্ষের মোট আসনের এক–তৃতীয়াংশ নির্বাচিত হন রাজ্যের সাধারণ বিধায়ক ও পৌরসভা-পঞ্চায়েতের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে।
এছাড়া মোট আসনের ১২ ভাগের এক ভাগের নির্দিষ্ট নির্বাচকমণ্ডলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষক সমাজ ও বিভিন্ন স্তরের স্নাতকেরা, আর ৬ ভাগের এক ভাগ আসন সরাসরি রাজ্যপাল কর্তৃক মনোনীত হয়ে থাকে। এবারের নির্বাচনে যে চারটি রাজ্যে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলোর পুরো নির্বাচকমণ্ডলীই গঠিত হয়েছিল শুধুমাত্র শিক্ষক এবং স্নাতক ভোটারদের নিয়ে।
ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থায় যেমন কেন্দ্রীয় পর্যায়ে লোকসভা ও রাজ্যসভা নামক দুটি কক্ষ রয়েছে, ঠিক তেমনই রাজ্য স্তরের শাসনব্যবষ্টায় নিম্নকক্ষ হলো বিধানসভা এবং উচ্চকক্ষ হলো বিধান পরিষদ। তবে পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলমসহ দেশের অধিকাংশ রাজ্যেই ইতিমধ্যে এই বিধান পরিষদ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে মাত্র ছয়টি রাজ্যে এই উচ্চকক্ষটি বহাল রয়েছে।
যে ছয়টি রাজ্যে বিধান পরিষদ এখনো সচল রয়েছে সেগুলো হলো উত্তর প্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা এবং অন্ধ্র প্রদেশ। এর মধ্যে মহারাষ্ট্রের ফলাফল বিজেপি শিবিরকে বিশেষভাবে চিন্তার মধ্যে রেখেছে, কারণ সেখানকার পাঁচটি আসনের মধ্যে তাদের গড়া ‘মহাজুটি’ জোট মাত্র দুটি আসনে জয় পেয়েছে। বাকি তিনটি আসনই চলে গেছে বিরোধী দলগুলোর গড়া ‘এমভিএ’ জোটের হাতে।
নাগপুরে বিজেপির এই পরাজয় দলটির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, কারণ এই আসনটি ২০২০ সালের নির্বাচনেও কংগ্রেসের পক্ষেই গিয়েছিল। কিন্তু এই আসনটি উদ্ধারের জন্য সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা ও সেখান থেকেই বিধানসভায় নির্বাচিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশ এবং প্রভাবশালী সংসদ সদস্য নিতিন গড়করি চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেননি। উল্লেখ্য, এই নাগপুর থেকেই টানা ২৪ বছর ধরে বিধান পরিষদের সম্মানিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এসেছেন নিতিন গড়করি, অথচ সেখানেও হার মানতে হলো।
বিজেপিকে যেমন উত্তর প্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের ফলাফল গভীরভাবে চিন্তান্বিত করে রেখেছে, ঠিক তেমনি কংগ্রেস দলের প্রধান দুশ্চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্ণাটক রাজ্য। দক্ষিণাঞ্চলের এই রাজ্যে যে চারটি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তার মধ্যে তিনটি আসন পূর্বে বিজেপির দখলে ছিল এবং মাত্র একটি আসন ছিল কংগ্রেসের হাতে।
কর্ণাটকে দলের নিরঙ্কুশ নেতৃত্ব পাওয়ার পর ডি কে শিবকুমারের জন্য এটিই ছিল প্রথম কোনো রাজনৈতিক নির্বাচন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই নির্বাচনে দলের দুটি আসন নিশ্চিতভাবে জয়ের ব্যাপারে সম্পূর্ণ আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেল যে তাদের পূর্বের জেতা আসনটিও শেষ পর্যন্ত হাতছাড়া হয়ে গেছে।
কংগ্রেসকে পরাজিত করে সেই আসনটি ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপির পুরোনো শরিক দল জনতা দল বা জেডি(এস), আর বিজেপিও তাদের আগের তিনটি আসন অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছে। কর্ণাটক রাজ্যের পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৮ সালে, ফলে দল গোছানোর জন্য ডি কে শিবকুমার এখন যথেষ্ট সময় হাতে পাবেন।
তবে এই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত ও দূরত্ব যদি দ্রুত না মেটে, তবে আগামী দিনেও কর্ণাটক কংগ্রেস দলকে বড় ধরনের হতাশাজনক ফলাফলের মুখে ফেলতে পারে। অন্যদিকে, এই বিধান পরিষদের নির্বাচন বিহার রাজ্যের নতুন রাজনৈতিক তারকা হিসেবে আবির্ভূত জনসুরাজ পার্টির প্রশান্ত কিশোরের মুখেও প্রশস্ত হাসি ফুটিয়েছে।
বিজেপি দলের সভাপতি নীতিন নবীনের নিজস্ব বিধানসভা আসন বাঁকিপুরের উপনির্বাচনে দুর্দান্ত জয়ের ধারা বজায় রাখার পর জনসুরাজ পার্টি এবার সরাসরি বিধান পরিষদের আঙিনাতেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিল। তারা বিহারের দ্বারভাঙা অঞ্চলের শিক্ষক কোটার আসনটিতে কংগ্রেস প্রার্থীকে ৩২৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। বিহারে এবার মোট আটটি আসনে বিধান পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যার মধ্যে বিজেপি ৩টি, তাদের রাজনৈতিক সঙ্গী জেডি(ইউ) ১টি, আরজেডি ১টি, জনসুরাজ পার্টি ১টি এবং বাকি ২টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর