ঢাকা | বঙ্গাব্দ

যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে তিন দিনের সফর ও বর্তমান পরিস্থিতি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 30, 2026 ইং
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে তিন দিনের সফর ও বর্তমান পরিস্থিতি ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

লেখক এম সাখাওয়াত হোসেনের বর্ণনায় উঠে এসেছে তেহরান সফরের পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা। টেব মেডিক্যাল ট্যুরিজমের আমন্ত্রণে তিনি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষভাগে তিন দিনের সফরে ইরানের রাজধানী তেহরানে পদার্পণ করেছিলেন। ক্ষুদ্র এই প্রতিনিধিদলটিতে সাকুল্যে তিনজন সদস্য ছিলেন। ইতিপূর্বে ২০১৯ সালে দীর্ঘ প্রায় সতেরো দিন তারা পারস্যের নানা দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন।

বাংলাদেশি নাগরিকদের চিকিৎসাসেবা ও আর্থিক সুবিধা প্রদানের বিষয় নিয়ে এক বিশেষ সেমিনারে একজন ইরানি চিকিৎসকসহ তার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা ঢাকায় এসেছিলেন। সেই আলোচনায় তারা বাংলাদেশে ফার্টিলিটি ও ক্যানসার সেন্টার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বর্তমান তেহরান সফরেও ইরানের মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট একই ধরণের প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন।

পরবর্তীতে তেহরানের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে লেখকের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তারা দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ চালুর জোরালো আগ্রহের কথা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের সবুজ সংকেত মিললে ঢাকা থেকে তেহরান সরাসরি ফ্লাইট চালুর ব্যাপারে ইরানি পক্ষ অত্যন্ত আগ্রহী বলে জানানো হয়।

মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশে প্রাচীন পারস্য তথা আজকের ইরানের অতুলনীয় অবদানের কথা সবারই জানা। স্থাপত্য ও সাহিত্যসহ সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে এই উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আদালত এবং প্রশাসনিক কাজে ফারসি ভাষা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের দিকে পারস্যের সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট ব্যাবিলন দখল করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক জয়ের পর একটি পোড়ামাটির সিলিন্ডারে বিশেষ ঘোষণা খোদাই করা হয়, যা সাইরাস সিলিন্ডার হিসেবে পরিচিত। বর্তমান সময়ে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে মূল সিলিন্ডারটি সংরক্ষিত আছে। ২০১৯ সালের সফরে লেখক পারসেপোলিস ও এই সিলিন্ডারের একটি প্রতিলিপি দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন।

প্রায় সাত বছর বাদে তেহরানে দ্বিতীয়বারের মতো উপস্থিত হলেও এবার পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। এবারের সফরটি সম্পন্ন হয়েছে এক ভয়াল যুদ্ধের আবহের মধ্যে। ২০২৬ সালের ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে ভয়াবহ আক্রমণ চালায়। সেই আগ্রাসনে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় কর্তাব্যক্তিরা প্রাণ হারান। পরবর্তীতে ইরানের পাল্টা আঘাত ও আঞ্চলিক সংঘাতের আঁচ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ থেকে ইরানকে দূরে রাখাই এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে প্রতিবেশীদের ওপর দেশটির আক্রমণাত্মক তৎপরতা বন্ধ করা এবং সাধারণ ইরানিরা যাতে নিজেরাই নেতৃত্ব পরিবর্তন করতে পারেন, এমন পরিবেশ সৃষ্টির কথাও তিনি বলেছিলেন।

যুদ্ধের জেরে ইরানের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন আসবে এমন প্রত্যাশা বাস্তবে মেলেনি বলে লেখকের মনে হয়েছে। বরং এই সফরকালে তিনি যাদের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের একটা বড় অংশের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি সমর্থনের মনোভাব দেখতে পেয়েছেন। তবে মাত্র তিন দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে কোনো রাষ্ট্রের সামগ্রিক জনমত পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে ইরানের পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিপরীতে ইরানের পাল্টা আঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও মিত্রদের ঘাটিগুলোও আক্রান্ত হয়েছে। গত জুনে যুদ্ধবিরতির একটি প্রাথমিক সমঝোতা হলেও তা দ্রুত ভেস্তে যায় এবং পুনরায় হামলা ও প্রতিহামলা শুরু হয়। বর্তমান সফরের সময়েও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল, পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগর ঘিরে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। মার্কিন জ্বালানি তথ্য সংস্থার উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই কোটি নয় লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও আনুষঙ্গিক পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। এই পরিমাণটি সেসময়ের বৈশ্বিক তরল পেট্রোলিয়াম জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় বিশ শতাংশের সমান।

প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ হলো ইরান। মার্কিন জ্বালানি সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের প্রাক্কলনে প্রমাণিত জ্বালানি তেলের মজুতের বিচারে দেশটি বিশ্বে তৃতীয় এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। সেসময় দেশটির প্রমাণিত তেলের মজুত ছিল প্রায় দুইশো নয় বিলিয়ন ব্যারেল এবং গ্যাসের মজুত ছিল প্রায় চৌত্রিশ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার।

পশ্চিমা বিশ্ব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের তেল রপ্তানি ও অর্থনীতিকে দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত করে রেখেছে। তা সত্ত্বেও তেহরান নানা বিকল্প পন্থায় জ্বালানি তেল বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা দেশ হিসেবে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ইরানের জ্বালানি খাতের ইতিহাসের সঙ্গে দেশের আধুনিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে জড়িত। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগের শাসনামলে ১৯৫১ সালে দেশটির তেলশিল্প জাতীয়করণের আওতায় আনা হয়। তখন ব্রিটিশদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি দেশটির জ্বালানি খাতে প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি ছিল। পরবর্তীকালে ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মদদপুষ্ট এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেগকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসন আরও শক্ত হয়।

চলমান সংঘাতে উভয় পক্ষই প্রচুর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এই যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রচুর অর্থ অপচয় করেছে এবং ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে তেহরানও তাদের আক্রমণাত্মক ধারা বজায় রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটিতে বড় ধরনের স্থল অভিযান পরিচালনা করা কতটা দুরূহ হবে, তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে।

দীর্ঘ ইতিহাসজুড়ে বহুবার বহিঃশক্তির আগ্রাসনের শিকার হয়েছে পারস্য ও ইরানের ভূখণ্ড। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে আলেকজান্ডার পারস্যের সম্রাট তৃতীয় দারিয়ুসকে পরাস্ত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আরব বাহিনীও এই অঞ্চল দখল করে নেয়। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালে সোভিয়েত ও ব্রিটিশ বাহিনী ইরানে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। সেসময় রেজা শাহকে সিংহাসন ছাড়তে হয় এবং তার পুত্র মোহাম্মদ রেজা পাহলভি নতুন শাহ হিসেবে অভিষিক্ত হন।

জাতীয়তাবাদ, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতি ইরানের নিজস্ব প্রতিরক্ষায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশটির মোট আয়তন প্রায় ষোলো লক্ষ আটচল্লিশ হাজার বর্গকিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে এটি এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্র।

ইরানের ভৌগোলিক গঠন অনেকটাই পাহাড়বেষ্টিত। এর প্রধান দুটি পর্বতমালা হলো আলবোর্জ ও জাগ্রোস। জাগ্রোস পর্বতমালা উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে দেশটির পশ্চিম সীমানা রক্ষা করছে। অন্যদিকে আলবোর্জ পর্বতমালা উত্তরে কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ অংশ জুড়ে অবস্থান করছে। এছাড়া দেশের মধ্যাঞ্চল ও পূর্বাংশে বিশাল মরুভূমি ও পাহাড়ি শুষ্ক অঞ্চল রয়েছে।

এই বিশেষ ভূপ্রকৃতি ইরানকে এক ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা সুবিধা প্রদান করেছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারগুলো দেশটি অস্ত্র সংরক্ষণ এবং সামরিক নিরাপত্তার কাজে সফলভাবে ব্যবহার করেছে। এর ফলে বাইরের আক্রমণকারীদের পক্ষে এসব গোপন সামরিক স্থাপনা খুঁজে বের করা ও গুঁড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একদিকে অনন্য ভৌগোলিক অবস্থান ইরানকে বিশ্ব ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী করে তুলেছে, অন্যদিকে সামরিক শক্তির কাঠামোতেও এই প্রাকৃতিক সুবিধা নিখুঁতভাবে কাজে লাগানো হয়েছে। দেশটির সামরিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি। বিভিন্ন প্রদেশে এই শক্তিশালী বাহিনীর সুসংগঠিত উপস্থিতি বজায় রয়েছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
একক নয়, সর্বসম্মতভাবেই এসআইআর সিদ্ধান্ত: সুপ্রিম কোর্টে ইসি

একক নয়, সর্বসম্মতভাবেই এসআইআর সিদ্ধান্ত: সুপ্রিম কোর্টে ইসি