নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ঢালিউডের পরিচিত চিত্রনায়িকা পরীমনির জন্মদিন একসময় বড় হোটেল ও রঙিন সাজসজ্জার কারণে বিনোদন অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করত। বিমানবালার বেশ ধারণ কিংবা অভিনব পোশাকে উপস্থিত হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর উদযাপনের নিয়মিত চিত্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিশাল পরিসরের উৎসব পাল্টে গেছে এবং তিনি এখন ঘরোয়া আয়োজনেই সন্তুষ্ট থাকেন।
আজকের দিনটি এই অভিনেত্রীর জীবনে চৌত্রিশ বছর পূর্ণ হওয়ার মুহূর্ত নিয়ে এসেছে। গতকাল রাতে ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছোঁয়ার পর দুই সন্তানকে পাশে নিয়ে তিনি কেক কাটার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। এই বিশেষ মুহূর্তে তাঁর মনের ভেতর নানা শামসুল হক গাজীর স্মৃতি তীব্রভাবে ভেসে ওঠে।
গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান যে অভিভাবক বেঁচে থাকার সময় গভীর রাতে ঘুম ভেঙে তাঁকে কেক কাটানোর ব্যবস্থা করতেন। সেই প্রিয় মানুষটির অনুপস্থিতি তাঁকে ব্যথিত করে এবং ভাবলেই চোখের কোণ ভিজে ওঠে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দর্শকের ভালোবাসায় সিক্ত অভিনয়যাত্রায় বিগত এক দশকে তাঁর নামের পাশে যুক্ত হয়েছে বিপুল পরিচিতি এবং ইন্টারনেট দুনিয়ায় প্রায় দুই কোটি অনুসারী। এত কিছুর পরও রূপালি পর্দায় তাঁর প্রকৃত খ্যাতির প্রতিফলন ঠিক কতখানি অর্জিত হয়েছে, সেই কৌতূহল মানুষের মনে থেকে গেছে।
১৯৯২ সালের এই দিনে সাতক্ষীরায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর মূল নাম শামসুন্নাহার স্মৃতি। তাঁর পিতার নাম মনিরুল ইসলাম এবং মাতার নাম সালমা সুলতানা। মাত্র তিন বছর বয়সে মাতৃস্নেহ হারানোর পর পিরোজপুরের বাড়িতে নানার আশ্রয়ে তাঁর শৈশব কাটতে শুরু করে।
পরিবারের সেই প্রবীণ ব্যক্তিটিই ছিলেন তাঁর অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রেরণা ও ভরসার স্থল। পরবর্তী সময়ে সেই শৈশবের দিনগুলোই তাঁর অস্তিত্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত হয়।
বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বারবার স্পষ্ট করেছেন যে আনন্দ প্রকাশের এই দিনটি তাঁর কাছে কেবল ব্যক্তিগত উৎসব নয়, বরং আপনজনদের সঙ্গে সুখ ভাগাভাগির মাধ্যম। মুরব্বি বেঁচে থাকা অবস্থায় তাঁর সস্নেহ সান্নিধ্যেই কেক কাটার রেওয়াজ ছিল।
২০২৩ সালে আশ্রয়দাতাকে চিরতরে হারানোর পর বড় আয়োজনের উৎসাহে ভাটা পড়ে। অভিভাবকহীন হয়ে পড়ার পর থেকে আগের মতো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে তাঁকে আর দেখা যায় না।
ভার্চুয়াল মাধ্যমে পূর্বে একটি সরাসরি অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছিলেন যে এই আপনজনকে ছাড়া নিজেকে প্রচণ্ড নিঃসঙ্গ লাগে। জীবনের এই বড় পরিবর্তন তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দিকটি সবার সামনে নিয়ে এসেছে।
দৃশ্যপটে বা যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁকে অত্যন্ত প্রাণবন্ত মনে হলেও বাস্তব জীবনে স্বজন হারানোর গভীর বেদনা তাঁর নিত্যসঙ্গী। সেই কষ্ট বুকে নিয়েই তিনি নতুনভাবে পথ চলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান।
শৈশবে অভিনয়ের স্বপ্ন তাড়া করেই তিনি নৃত্যশিক্ষার জন্য বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টসে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে বেশি দিন অতিবাহিত না করলেও সেই নাচ শেখার ব্যাকগ্রাউন্ড পরবর্তীতে তাঁর শিল্পীজীবনে যথেষ্ট সাহায্য করেছে।
কিছুদিন পর ছোট পর্দার মাধ্যমেই তাঁর অভিনয়ে হাতেখড়ি হয় এবং প্রথম কাজ হিসেবে ‘সেকেন্ড ইনিংস’ নাটকে অংশ নেন। পরবর্তীতে আরও কিছু খণ্ড নাটকে কাজ করার সুবাদে তিনি ধীরে ধীরে রূপালি পর্দার দিকে পা বাড়ান।
২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ভালোবাসা সীমাহীন’ চলচ্চিত্রের সুবাদে বড় পর্দায় তাঁর আনুষ্ঠানিক অভিষেক ঘটে। সেই সিনেমায় তাঁর সহশিল্পী হিসেবে কাজ করেছিলেন জায়েদ খান।
চলচ্চিত্রে নাম লেখানোর পূর্বেই একাধিক সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সুবাদে তিনি বিনোদন পাতার আলোচনার খোরাক হন। একই সময়ে অন্য একটি আলোচিত সিনেমায় তাঁর যুক্ত হওয়ার খবর সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নেয়।
তবে সেই ছবিটির প্রদর্শনীর পথ নানা জটিলতায় আটকে যায় এবং শুরুর দিকে তাঁকে ঘিরে প্রত্যাশার মাত্রা ছিল আকাশচুম্বী। তাঁর শারীরিক সৌন্দর্য ও নাচের পটুতা দ্রুত মানুষের মাঝে পরিচিতি এনে দেয়।
যদিও অতিমাত্রায় ছবিতে চুক্তি করা যে পেশাদার জীবনে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের চাবিকাঠি নয়, তা পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পরিচালক গিয়াস উদ্দিন সেলিমের নির্মিত ‘স্বপ্নজাল’ ছবিটি তাঁর শিল্পীজীবনের অন্যতম একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। যেখানে শুভ্রা চরিত্রে রূপদান করে তিনি চারপাশের মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা কুড়ান।
এই চলচ্চিত্রে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন উদীয়মান অভিনেতা ইয়াশ রোহান। চটকদার ইমেজের বাইরে গিয়ে চরিত্রের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলার সুযোগ তিনি পান।
সমালোচক ও সাধারণ দর্শকের কাছে এই কাজটি তাঁকে সম্পূর্ণ নতুন পরিচয়ে পরিচিত করে তোলে। এছাড়া ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্রে নিজের সন্তুষ্টির কথা তিনি বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের সামনে ব্যক্ত করেছেন।
তাঁর অভিনীত অন্যান্য চলচ্চিত্রের তালিকায় রয়েছে বৈচিত্র্যময় সব কাজ। এসব প্রজেক্টে তাঁকে একেক সময় একেক রকম চরিত্রে রূপায়ণ করতে দেখা গেছে।
বিশেষ করে একটি বিশেষ চলচ্চিত্রে সন্তানহারা জননীর চরিত্রে তাঁর নিপুণ অভিনয় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি অভিজ্ঞতা।
পুরো ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে এটা স্পষ্ট হয় যে তাঁর অভিনয় প্রতিভার গভীরতা নিয়ে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। মূল প্রশ্নটি হলো সেই প্রতিভাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর মতো চিত্রনাট্য তিনি কতবার পেয়েছেন।
‘স্বপ্নজাল’-এর মতো কাজের মাধ্যমে যে দক্ষতার ইঙ্গিত মিলেছিল, সেটিকে নিয়মিত রূপ দেওয়ার কাজটি চালিয়ে যাওয়া আবশ্যক।
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় তাঁর বিপুল অনুসারী বাহিনী তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম বড় খুঁটি হিসেবে কাজ করে। ফেসবুকে তাঁর ফলোয়ারের সংখ্যা ইতিমধ্যে এক লাখ সত্তর হাজারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
নতুন পোশাকের প্রদর্শনী, নান্দনিক চিত্রগ্রাহিতা, ভ্রমণ কাহিনি কিংবা সন্তানদের দৈনন্দিন মুহূর্ত নিয়মিত ভক্তদের সঙ্গে তিনি ভাগ করেন। এর ফলে নতুন কোনো চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে না এলেও সাধারণ মানুষের মনোযোগ তাঁর ওপর বজায় থাকে।
জন্মদিনের উদযাপনের বাইরেও নানা ঘটনা তাঁকে গণমাধ্যমের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। তাঁর ভিন্নধর্মী পোশাক বা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ বহুবার প্রশংসিত হয়েছে।
একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও নানা আলোচনা-সমালোচনাও তাঁকে ঘিরে জনমতের জন্ম দিয়েছে।
২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগে তাঁর আটক হওয়া এবং কারাবাস ছিল জীবনের অন্যতম বড় একটি ধাক্কা। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও সেই অধ্যায় নিয়ে আলোচনা থামেনি।
এর পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং বিভিন্ন মন্তব্য তাঁকে বারবার খবরের শিরোনামে এনেছে। তবে এসব বিতর্ককে ছাপিয়ে একজন কুশলী শিল্পী হিসেবে তাঁর কাজের যথাযথ মূল্যায়নও অত্যন্ত জরুরি।
ব্যক্তিগত জীবনে বেশ কয়েকবার সম্পর্কের টানাপোড়েন ও বিচ্ছেদের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। পরিচালক কামরুজ্জামান রনির সঙ্গে তাঁর ঘর বাঁধলেও তা বেশি দিন টেকেনি।
পরবর্তীতে একটি সিনেমার শুটিং চলাকালে অভিনেতা শরীফুল রাজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। ২০২১ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পরের বছরের শুরুতে পারিবারিকভাবে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। ওই বছরের আগস্ট মাসে তাঁদের কোলজুড়ে আসে পুত্রসন্তান।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর