ঢাকা | বঙ্গাব্দ

অস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নিচ্ছেন ইশরাক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 19, 2026 ইং
অস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নিচ্ছেন ইশরাক ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচিতি, রাজপথের লড়াই এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবারই প্রতিমন্ত্রীর চেয়ারে বসা ছিল ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক জীবনের বড় প্রাপ্তি। কিন্তু গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী একটি অভিযানে সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে তাঁর অংশ নেওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। যার পরিণতি হিসেবে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হচ্ছে তাঁকে।

বর্তমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভার যাত্রার বয়স আট মাস পূর্ণ হয়েছে, আর এই একই সময়জুড়ে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন ইশরাক হোসেন। অস্ত্র হাতে তাঁর ওই অভিযان বিতর্কের জন্ম দেওয়ার পরদিন সকালেই তাঁকে তলব করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং ওই বৈঠকেই তাঁকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ফেসবুকে দেওয়া এক বার্তার মাধ্যমে ইশরাক নিজেই দুপুরবেলা পদত্যাগ করার সিদ্ধান্তের কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন।

এই ঘটনাকে কেবল একজন কম বয়সী প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি বর্তমান প্রশাসনের সকল মন্ত্রী ও নেতার জন্য একটি স্পষ্ট ও কঠোর সতর্কবার্তা। গত বছরের ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পতনের পর থেকে দেশের মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের দায়িত্বশীল আচরণ ও জবাবদিহিতা আশা করে আসছে।

ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অপ্রয়োজনীয় শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের জাহির করার পুরোনো সংস্কৃতি থেকে রাজনীতিকেরা সত্যিকার অর্থে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন কি না, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণ করছেন সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর দেশের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি এবং বড় ধরনের পরিবর্তনের অঙ্গীকার করে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তারেক রহমান।

এর আগে গত মাসেই মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঘটে যাওয়া এক অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনায় দলীয় নারী সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকেও পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলেন সরকারপ্রধান। ইশরাকের সাম্প্রতিক অস্ত্র উঁচিয়ে এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পর থেকেই কঠোর কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আসার প্রবল গুঞ্জন ছিল, যা প্রমাণ করে প্রধানমন্ত্রী তাঁর কঠোর নীতি থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসেননি।

বয়সের দিক থেকে ৩৯ বছর বয়সী ইশরাক হোসেন হলেন বিএনপির প্রয়াত হেভিওয়েট নেতা, মন্ত্রী এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটির শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সন্তান। পুরান ঢাকায় তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে বাবার প্রয়াণের পর সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সম্বল করেই মূলত মূলধারার রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন ইশরাক।

শিক্ষাজীবনে প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি মূলত ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে পা বাড়ান। ঢাকা দক্ষিণ মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার পাশাপাশি তিনি দলের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক কমিটির সদস্য ছিলেন এবং পুরান ঢাকায় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে অংশ নিয়ে তরুণ কর্মীদের মাঝে পরিচিতি লাভ করেছিলেন।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার সুবাদে তাঁকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এর আগে ২০২০ সালের ঢাকা সিটির নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যাওয়ার পর আদালতের রায়ে মেয়রের দায়িত্ব দাবি করে আসছিলেন তিনি।

নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বিজয়ী ঘোষণা করার পর নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করলেও শপথ নেওয়া নিয়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বড় ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির তৈরি হয়। এই বিরোধ একপর্যায়ে আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং তার জেরে গত বছরের মে মাসে তাঁর সমর্থকেরা নগর ভবন ঘেরাও করে প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে সাধারণ মানুষের নাগরিক সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেন।

সেই সময় ইশরাক নিজেও সেই বিক্ষোভে যোগ দিয়ে সরকারকে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার না মানলে তিনি নিজেই মেয়রের চেয়ার দখল করবেন। এই ধরনের আন্দোলন একদিকে যেমন শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম ছিল, অন্যদিকে জনগণের ভোগান্তি বাড়ানোর কারণে দলের ভেতরেই তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্বতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল।

মাদকবিরোধী ওই অভিযানে ইশরাকের আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নিজের শক্তিমত্তা জাহির করা, যার মাধ্যমে তিনি এর আইনি পরিণতি বা নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে একেবারেই ভাবেননি। একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী কিংবা রাজনীতিকের পদপদবি অনুযায়ী যে ধরনের সংযম ও পরিমিতিবোধ বজায় রাখা উচিত, তার স্পষ্ট অভাব বারবার ফুটে উঠেছে তাঁর কার্যকলাপে।

এর আগেও বিভিন্ন সময়ে তাঁর আচরণ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল, যার মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আগারগাঁওয়ে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠান অন্যতম। সেখানে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের সঙ্গে তীব্র বাক্‌বিতণ্ডা শুরু হলে ইশরাক পরিস্থিতি ঠান্ডা না করে উল্টো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

সে সময় তিনি উপস্থিত লোকজনকে আক্রমণ করে বলেন যে তাঁরা নিজেদের জাহির করতে বা ডকুমেন্টারি দেখাতে এসেছেন কি না এবং শহীদদের জন্য তাঁরা কিছুই করেননি বলে মন্তব্য করেন। তাঁর এমন উত্তপ্ত বক্তব্যের ফলে অনুষ্ঠানস্থলের পরিবেশ আরও জটিল হয়ে ওঠে, যা পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্যান্য নেতাদের হস্তক্ষেপে শান্ত হয়।

এ ছাড়া গত জুলাই মাসে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠানেও প্রটোকল ভেঙে তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে একসঙ্গে স্যালুট দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন ইশরাক। ঐতিহ্যগত নিয়মের বাইরে গিয়ে তাঁর এমন অনধিকার চর্চার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁকে নিয়ে নানা উপহাস ও সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কোনো আইনি ব

স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কোনো আইনি ব