নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সাম্প্রতিক এক মাসের ব্যবধানে ভিন্ন চার ভূখণ্ডের চারটি রাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় নির্বাচন। এই ভোটগ্রহণগুলো বিশ্বজুড়ে অসংখ্য নতুন রাজনৈতিক ঘটনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিটি রাষ্ট্রের ভোটাভুটি সেখানকার সাধারণ মানুষের সুগভীর আশা ও আকাক্সক্ষাকে জোরালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
যদিও রাষ্ট্রগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান, নির্বাচনী পদ্ধতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, তবুও বর্তমান যুগে এক রাষ্ট্রের জনগণের প্রত্যাশা কিংবা সাফল্য-ব্যর্থতা অন্য রাষ্ট্রেও গভীর প্রভাব ফেলে। এই চারটি রাষ্ট্রের ভোটের ফলাফল গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব যে বর্তমান ভূরাজনীতিতে কীভাবে বিশ্ব জনমত তৈরি হচ্ছে।
ইউরোপের সার্বিয়ার ভোট কি মহাদেশটির অন্য জনপদে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের সাফল্যের পূর্বলক্ষণ বহন করে? দক্ষিণ আমেরিকার ডানপন্থী রাজনৈতিক ধারাকে উপেক্ষা করে ব্রাজিলের লুলার ফের ক্ষমতায় বসা কি যুক্তরাষ্ট্রের নেতার আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ?
এশিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলের ভোট কি দীর্ঘ তিন দশক ধরে চলা নেতানিয়াহুর যুদ্ধবাদী নীতিতে সাধারণ নাগরিকদের চরম বোরিং হয়ে ওঠার লক্ষণ? বিগত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভোটাররা কি শেষ পর্যন্ত বিশেষ নেতার নীতির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে?
এই জটিল প্রশ্নগুলোর উত্তর অত্যন্ত সরলভাবে হ্যাঁ বা না দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবুও এই ফলাফলগুলোর গভیر অনুসন্ধান করলে পৃথিবীর নানা প্রান্তের সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদার কিছু সাধারণ যোগসূত্র অবলীলায় খুঁজে পাওয়া যায়।
বিগত ৩ নভেম্বর সম্পন্ন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তীকালীন সাধারণ নির্বাচন। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন এই ভোট বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট ওই নেতার জনপ্রিয়তা গত দুই বছর ধরে কেবল উর্ধ্বমুখী থাকলেও, এই নির্বাচনে তার গ্রাফ হুট করে নিচে নেমে গেছে।
অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কোনো কারণ ছিল না, কেননা বেশ কিছুদিন ধরেই দেশটির বিভিন্ন জনমত জরিপ দলটির বড় ধরণের পরাজয়ের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। ভোটের লড়াইয়ে সেই নির্দিষ্ট নেতা ও তাঁর দল শোচনীয় পতনের মুখোমুখি হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটরা সংসদের উচ্চকক্ষ সিনেটের একশটি আসনের মধ্যে চুয়ান্নটিতেই জয় তুলে নিয়েছে। পাশাপাশি নিম্নকক্ষ কংগ্রেসে তারা চারশ পঁয়ত্রিশটির মধ্যে দুইশ তিপ্পান্ন আসনে বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।
এই নির্বাচন এমন অসংখ্য ঘটনার জন্ম দিয়েছে, যা বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে সাংবাদিকতার ভাষায় একাধিক কলামের প্রয়োজন হয়ে পড়বে। টেক্সাস অঙ্গরাজ্য আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত।
যে টেক্সাসকে এতদিন রক্ষণশীল দলটির নিরাপদ দুর্গ হিসেবে গণ্য করা হতো, সেখানে আইনসভা, সিনেট কিংবা গভর্নর পদ সব জায়গাতেই তাদের আধিপত্য ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে। কানসাস অঙ্গরাজ্যে গত একশত বছরের ইতিহাসে এই প্রথম একজন ডেমোক্র্যাট দলের প্রতিনিধি সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
মার্কিন রাজনৈতিক মানচিত্রে যে সমস্ত অঙ্গরাজ্য লাল রঙে রক্ষণশীলদের জন্য সংরক্ষিত বলে মনে করা হতো, এবারের ভোটে সেগুলোর সবই যেন প্রতিপক্ষের নীল রঙের প্লাবনে ভেসে গিয়েছে। এই নির্বাচনে রক্ষণশীলদের পরাজয়ের পেছনে বিশ্লেষকরা নানা মুনির নানা মত দিয়েছেন।
কেউ এর পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে দায়ী করেছেন, কেউবা কানাডার মতো বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সংঘাতকে কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন, আবার অনেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন।
এগুলোর সবগুলো কারণই হয়তো সত্য হতে পারে, তবে এতসব জটিল বিশ্লেষণে না গিয়ে খুব সংক্ষেপে বলা যায় যে নির্দিষ্ট নেতার কর্মকাণ্ডের কারণেই তাদের এই বিপর্যয় ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ধৈর্যের পরিধি বেশ দীর্ঘ।
বিশ্বের অন্যান্য অনেক জনপদের মতো মার্কিন নাগরিকরা কথায় কথায় রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাবে না কিংবা বড় কোনো ধ্বংসাত্মক হানাহানিতে লিপ্ত হবে না। মার্কিন মুল্লুকে প্রতিবাদ জানানোর সবচেয়ে মোক্ষম এবং শক্তিশালী অস্ত্র হলো ভোটদান প্রক্রিয়া।
আর ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমেই সেই নির্দিষ্ট নেতার বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ ফুটিয়ে তুলেছে, যাকে একধরনের নীরব ভোটবিপ্লব বললেও অত্যুক্তি হবে না। এই পুরো রাজনৈতিক আন্দোলনে দেশটির তরুণ ও যুবসমাজ প্রগতিশীল শক্তিকে বিজয়ী করতে অত্যন্ত জোরালোভাবে অংশ নিয়েছিল।
সব ধরনের প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে এই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র পেল একজন মুসলমান সিনেটর হিসেবে ড. আবদুল আল-সাইয়েদকে। তাঁর জন্য এই নির্বাচনী লড়াই মোটেও সহজ ছিল না, কিন্তু মিশিগানের ভোটাররা তাঁকে বিজয়ী করে তাঁর আধুনিক মনন এবং নির্দিষ্ট একটি দেশের সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থানকে দারুণভাবে সমর্থন জানিয়েছে।
মার্কিন মুল্লুকে শেষ পর্যন্ত সেই বিশেষ নেতার একচোখা নীতির মুখোশ পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ বিপুল ব্যবধানে নির্দিষ্ট নেতার সেই আত্মকেন্দ্রিক নীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ডেমোক্রেটিক দলের একাধিক নির্বাচিত সংসদ সদস্য অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে সরকারপ্রধানসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব আনার কথা উচ্চারণ করেছেন।
আগামী দুটি বছর মার্কিন নেতাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ ফেলতে হবে, নতুবা তিনি নিজের জন্য আরও বড় কোনো রাজনৈতিক বিপদ ডেকে আনতে পারেন। মার্কিন এই নির্বাচনের ঠিক কিছুদিন আগে গত ২৭ অক্টোবর মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্র ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সাধারণত ইসরায়েলের সাধারণ মানুষ প্রধানত সেই রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন করে থাকে, যারা ফিলিস্তিনের নাগরিকদের তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে নতুন নতুন ভূমি দখল করতে সক্ষম হয়। তবে এবারের নির্বাচনে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ইসরায়েলি নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টিও।
পারমাণবিক শক্তিধর দেশটির সঙ্গে উত্তেজনার সময় তাদের অবিরাম বোমাবর্ষণের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। প্রতিদিন নিয়মিতভাবে নিরাপদ আশ্রয়ের বাঙ্কারে দৌড়াতে দৌড়াতে সাধারণ মানুষ মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
নেতানিয়াহু গত ত্রিশ বছর ধরে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে কেবল যুদ্ধের অন্ধ গলির দিকে ঠেলে দিয়েছেন। সব মিলিয়ে এবারের ভোটের মাঠে ইসরায়েলি নাগরিকদের মন বেশ কিছুটা বিভ্রান্ত ও দ্বিধাবিভক্ত ছিল।
যদিও এই নির্বাচনে নেতানিয়াহুর অতি-ডানপন্থী জোট তাদের পূর্বের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে, তবে এটাও হয়তো সত্য যে ইসরায়েলি জনসাধারণ একবারে নেতানিয়াহুকে পুরোপুরি বর্জন করতেও প্রস্তুত নয়।
চলতি বছরের এই নির্বাচনে ইসরায়েলি ভোটাররা এক অদ্ভুত ধোঁয়াশা ও দ্বিমুখী নীতিতে আচ্ছন্ন ছিল। তারা পরিবর্তন বা সংস্কার চেয়েছিল, কিন্তু ভোটের মাঠে এমন কোনো স্পষ্ট বিকল্প ছিল না যাদের ভোট দিয়ে তারা নিজেদের জন্য সত্যিকারের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
ভোটগ্রহণের পূর্বে বিভিন্ন জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর দলের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ও নাজুক বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। ঠিক নির্বাচনের তিন দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহুর পক্ষে জোরালো সমর্থন জানিয়ে একটি বার্তা দিয়েছিলেন।
আমেরিকান নেতার এই সমর্থনই কি নেতানিয়াহুকে নির্বাচনী ময়দানে সম্পূর্ণ ভরাডুবি থেকে রক্ষা করতে পেরেছিল? মার্কিন নেতা নিজে অবশ্য ঠিক তেমনই দাবি করেন, তিনি দাবি করেছেন যে তাঁর সমর্থনই শেষ মুহূর্তে নির্বাচনের পুরো মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
আমেরিকান নেতার এই দাবি হয়তো মিথ্যাও নয়, কারণ এখনো বিপুলসংখ্যক ইসরায়েলি নাগরিক তাকে তাদের পরম ত্রাতা বা উদ্ধারকর্তা হিসেবে গণ্য করে থাকে। যদিও নেতানিয়াহু-বিরোধী পক্ষকে মধ্যপন্থী দল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, তবে তাদের রাজনৈতিক আদর্শে নিখাদ মধ্যপন্থা খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বিরোধী জোটের অন্যতম মুখ গাদি আইজেনকটকে ফিলিস্তিন প্রশ্নে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সমতুল্য একজন কট্টরপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা যায়। গাদি আইজেনকট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে ফিলিস্তিনি জনপদ নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় অপরিবর্তিত রয়েছে এবং দুই জাতির জন্য দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ফর্মুলাটি একটি বড় ভুল।
কেবল এতটুকুই বলা চলে যে গাদি আইজেনকট ঠিক নেতানিয়াহু নন, হয়তো কুর্সিতে বসলে তিনি পরিস্থিতির চাপে কিছুটা বাস্তবমুখী ও নমনীয় হতে পারেন। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে ইসরায়েলের রাষ্ট্রপ্রধান আইজ্যাক হারজগ সম্ভবত অচিরেই বিরোধী দলের এই নেতাকে নতুন সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন।
কারণ পার্লামেন্টের মোট একশ কুড়ি জন সদস্যের মধ্যে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে ইচ্ছুক সতাষটি জন সংসদ সদস্যের সমর্থন রয়েছে; যার মধ্যে উনিশ জনই হলেন ইসরায়েলি আরব প্রতিনিধি।
যদিও গাদি আইজেনকট সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি সেই আরব সদস্যদের নিজের সরকারে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করবেন না। তবে তাঁরা বাইরে থেকে নতুন সরকারকে শর্তহীন সমর্থন জুগিয়ে যাবেন, কারণ তাঁদের প্রধান লক্ষ্য হলো ক্ষমতা থেকে নেতানিয়াহুকে হটানো।
তবে এটাও বেশ জোর দিয়ে বলে রাখা ভালো যে ইসরায়েলের এই তথাকথিত জগাখিচুড়ি মার্কা সরকার কতদিন স্থায়ী হবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা নেই। বরখাস্ত হওয়া নেতানিয়াহু অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে পরবর্তী অনুকূল সুযোগের অপেক্ষায় ওত পেতে বসে আছেন।
বিগত তিন দশকে নেতানিয়াহু বহুবার রাজনৈতিকভাবে ডুবে গিয়েও অবিশ্বাস্য উপায়ে আবারও ভেসে উঠেছেন। বর্তমান সময়েও কি তার কোনো ব্যত্যয় ঘটতে পারে? সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে বিশ্ববাসীকে আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর