নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
যুবদল নেতা শাকের হোসেনকে খুন এবং দেড় শ ভরি সোনা লুটের অভিযোগে মাগুরা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. মারুফ হোসেনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত বৃহস্পতিবার এই রাজনৈতিক নেতাকে পুলিশি জালে বন্দি করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, আটকের পর মারুফ হোসেনের দেওয়া বিবরণের ওপর ভিত্তি করে লুট হওয়া সোনার পাঁচটি বার উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এই সোনা ছিনতাইয়ের ঘটনার সঙ্গে যুবদল নেতার হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সে ব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।
গত একুশে অক্টোবর ভোরের দিকে মাগুরা শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার রয়েল পরিবহনের কাউন্টার প্রাঙ্গণে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় ৩৯ বছর বয়সী যুবদল নেতা শাকের হোসেনকে। এই ঘটনার পর নিহত ব্যক্তির সহধর্মিণী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা ও অস্ত্র মামলা দায়ের করেন।
এই হত্যা মামলায় আজ শুক্রবার বিকালের মধ্যে মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে গত বুধবার রাতে রনি শিকদার ও শামীমা তাবাসসুমকে আটক করা হয়েছিল। গ্রেপ্তার হওয়া রনি শিকদার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এই দুজন বর্তমানে পাঁচ দিনের পুলিশি রিমান্ডে আছেন।
গত মঙ্গলবার ঝিনাইদহের গীতাঞ্জলি রোড এলাকার গিনি হাউস নামক জুয়েলারি দোকানের মালিক ও সোনা ব্যবসায়ী অনিমেষ মজুমদারকে (৫৫) সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। সবশেষ মাগুরা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মারুফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হলো এবং আজ বিকেলে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব পালন করছেন জেলা গোয়েন্দা শাখার উপপরিদর্শক মো. কামরুজ্জামান। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, শুক্রবার বিকেলে শুনানি শেষে আদালত আসামি মারুফ হোসেনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
এদিকে মাগুরা সদর থানা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত সাতচল্লিশ সালের বা ২৭ অক্টোবর গভীর রাতে মানিকগঞ্জের সিংগাইর এলাকার মো. মজিবর রহমান সোনা লুটের অভিযোগে একটি মামলা দير করেন। মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন যে, গত ৬ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে মাগুরা সদর থানার রামনগর বাজার এলাকায় দেড় শ ভরি সোনা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
বাদী মজিবর রহমান পেশায় একজন সোনা ব্যবসায়ী। ঘটনার দিন তিনি ঢাকার তাঁতীবাজারের পীযূষ নামের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৫০ ভরি সোনা সংগ্রহ করে তা ঝিনাইদহের ব্যবসায়ী অনিমেষ মজুমদারের নিকট পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গোল্ডেন লাইন পরিবহনের বাসে ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন।
বাসটি মাগুরার রামনগর বাজারে পৌঁছানোর পর ১২ থেকে ১৫ জনের একটি সশস্ত্র দল নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়ে বাসটির গতি রোধ করে। এরপর মজিবর রহমানকে জোরপূর্বক বাস থেকে নামিয়ে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় এবং তাঁর সঙ্গে থাকা সোনাগুলো হস্তান্তর করতে বাধ্য করার চেষ্টা চালায়।
ওই ব্যবসায়ী সোনা দিতে অস্বীকার করায় ডাকাত দলের সদস্যরা লোহার রড দিয়ে তাঁর মাথার ওপর আঘাত হানার চেষ্টা করে। তিনি মাথা সরিয়ে নিতে সক্ষম হলে আঘাতটি তাঁর ডান কাঁধে এসে লাগে, ফলে হাড় ভেঙে তিনি গুরুতর জখম হন।
পরবর্তীতে দুর্বৃত্তরা তাঁকে এলোপাতাড়ি কিল ও ঘুষি মেরে প্যান্টের বেল্টের নিচে বিশেষভাবে তৈরি পকেট থেকে প্রায় দুই কোটি ৯০ লাখ টাকা বাজারমূল্যের ১৫০ ভরি তেজাবি সোনা বা সোনার গুঁড়া দিয়ে তৈরি দণ্ড এবং নগদ ৬০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়।
ওই সময় মজিবর রহমানের আর্তচিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে ডাকাত দল নানা ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে লুট করা মালামালসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে মো. মজিবর রহমান টেলিফোনে প্রথম আলোকে জানান, ঘটনার পর তিনি নিকটস্থ নাকোল পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে তাঁকে জানানো হয় যে ওই এলাকাটি মাগুরা সদর থানার আওতাধীন। এরপর তিনি মাগুরা সদর হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
হাসপাতালে তাঁর কোনো পরিচিতজন উপস্থিত না থাকায় নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কায় তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে সেখান থেকে চলে আসেন। পরবর্তীতে গত ১৫ অক্টোবর তিনি থানায় উপস্থিত হয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অন্যদিকে মাগুরা সদর থানার নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ২৮ অক্টোবর রাতে পেনাল কোডের ১৭০, ৩৯৫ ও ৩৯৭ ধারায় সুনির্দিষ্ট মামলা রুজু করা হয়। নতুন দায়িত্ব গ্রহণকারী মাগুরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফারুক আহম্মেদ প্রথম আলোকে জানান, তিনি সম্প্রতি থানায় ওসির দায়িত্ব নিয়েছেন বিধায় পুরোনো নথিপত্র না দেখে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে পারছেন না।
এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক মোহাম্মাদ আশরাফুজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন যে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত এই মামলায় মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন পারনান্দুয়ালী ব্যাপারীপাড়ার নিবাসী মো. জুয়েল হোসেন, তৌকির আহমেদ, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মারুফ হোসেন এবং তাঁর আত্মীয় ফরিদ মণ্ডল। এদের মধ্যে মো. জুয়েল হোসেন ও তৌকির আহমেদকে গত বুধবার আটক করা হয় এবং তাঁরা বর্তমানে কারাগারে বন্দি আছেন।
পুলিশের তথ্যমতে, জুয়েল হোসেন ও তৌকির আহমেদ দুজনেই নিহত যুবদল নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। অন্যদিকে বৃহস্পতিবার যাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেই ফরিদ মণ্ডল হলেন একই মামলায় আটক হওয়া স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মারুফের শ্বশুর।
মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন শুক্রবার বিকেলে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এই মুহূর্তে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছেন তিনি। তবে খুব দ্রুতই চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পুলিশ সুপার আরও জানান, গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোনার পাঁচটি টুকরা জব্দ করা হয়েছে। বর্তমানে সেগুলোর ওজন মাপা হচ্ছে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় আদালতে উপস্থাপন করা হবে। হত্যাকাণ্ড ও ডাকাতির সমস্ত রহস্য উদঘাটনে পুলিশের গোয়েন্দা তদন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে চলমান রয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর