নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
শারদীয় দুর্গোৎসবের অষ্টম দিনে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পাথরঘাটা এলাকার রাধাগোবিন্দ শান্তনেশ্বরী মাতৃমন্দিরে বিশেষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে কুমারীপূজা। পবিত্রতা ও মাতৃশক্তির প্রতীক হিসেবে তিনটি শিশুকে দেবী প্রতিমার জীবন্ত রূপ হিসেবে অর্চনার মাধ্যমে এই ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। গত সোমবার বেলা সাড়ে দশটার দিকে এই পূজানুষ্ঠান শুরু হলে সেখানে শত শত ভক্ত ও পূজার্থীর সমাগম ঘটে।
চলতি বছর উক্ত মন্দিরে উমা, মালিনী এবং অপরাজিতা এই তিন নামে পূজিত হয়েছে যথাক্রমে রাধেশ্রী দত্ত বৃন্দা, ঋত্ত্বিকা দাশ ও অদিশ্রী কর নামের তিন শিশু। নানা ধরনের ফুল, চন্দন, বেলপাতা এবং তুলসীপাতা অর্পণের মাধ্যমেই মূলত এই পূজা-অচনার শুভ সূচনা করা হয়। মৃণ্ময়ী প্রতিমায় যে মহাশক্তির সাধনা করা হয়, কুমারীপূজার সময় ঠিক সেই দেবীকে জীবন্ত কুমারীর মাঝে কল্পনা করে বন্দনা করা হয়ে থাকে।
পূজা সম্পন্নকারী রাধাগোবিন্দ শান্তনেশ্বরী মাতৃমন্দিরের মোহন্ত শ্যামানন্দ দাশ গণমাধ্যমের কাছে এই পূজার সুদূর প্রসারী মাহাত্ম্য তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্যমতে, এই আচারটি মূলত সত্য যুগ থেকেই চলে আসছে এবং এর মাহাত্ম্য অত্যন্ত ব্যাপক। সত্য যুগে রাক্ষস কোলাসুরকে বধ করতে এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনকে সহায়তা করতে মহাশক্তি কুমারীর রূপ ধারণ করেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, ত্রেতা যুগে শ্রী রামচন্দ্রকে লঙ্কাপতি রাবণ বধের সঠিক উপায় বাতলে দিতেও কুমারী রূপেই দর্শন দিয়েছিলেন দেবী। পরবর্তী সময়ে কলি যুগে আচার্য শ্রীশঙ্করাচার্য এবং প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক স্বামী বিবেকানন্দও এই কুমারী মায়ের আরাধনা করেছিলেন।
শাস্ত্রীয় বিধানের কথা উল্লেখ করে উক্ত মোহন্ত জানান যে, কুমারীপূজা সম্পন্ন না হলে দেবীর আরাধনা কখনোই পরিপূর্ণ ফলপ্রসূ হয় না। সমগ্র প্রকৃতিজুড়ে যেমন দেবীর রূপ ছড়িয়ে রয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে মানবসমাজে নারীজাতির ভেতরেও সেই একই মাতৃশক্তি অবিকল বিরাজমান রয়েছে।
নারীর মধ্যে থাকা এই মাতৃরূপে পূজা অর্পণ করার অর্থ হলো সমাজে নারীজাতির সম্মান বৃদ্ধি করা এবং এর মাধ্যমে মানুষের মনে শুভশক্তির জাগরণ ঘটানো। এই বিশেষ পূজায় কোনো ধরনের জাতি, ধর্ম কিংবা বর্ণের ভেদাভেদ থাকে না, বরং দেবীজ্ঞানে যেকোনো বর্ণের কুমারীই পূজনের যোগ্য বলে বিবেচিত হন।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, নিখিল সৃষ্টির নারীর মধ্যেই দেবীশক্তির অস্তিত্ব রয়েছে এবং কুমারীকে সেই শক্তিরই সবচেয়ে নিষ্কলুষ প্রকাশ হিসেবে গণ্য করা হয়। আদি সৃষ্টির মূলশক্তিকে একজন কুমারীর অবয়বে কল্পনা করে তাঁকে স্বয়ং দেবীজ্ঞানে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়ে থাকে।
যদিও প্রাচীন শাস্ত্রগ্রন্থে এই পূজার কথা উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে আধুনিক যুগে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাধনা ও দর্শনের হাত ধরেই এই আচারটি নতুন মাত্রা লাভ করে। তিনি নিজের স্ত্রী সারদা দেবীকে স্বয়ং মাতৃজ্ঞানে পূজা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে উনিশ শ এক সালে স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে এর প্রচলন করেছিলেন।
মোহন্ত শ্যামানন্দ দাশের বর্ণনা অনুযায়ী, এই মহাবিশ্বে যে ত্রিশক্তির প্রভাবে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয় সাধিত হচ্ছে, তার বীজ রূপেই নিহিত রয়েছে কুমারীর মাঝে। কুমারীকে সামগ্রিক প্রকৃতি এবং নারীজাতির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা মূলত সৃষ্টির বীজাবস্থা।
এই কারণে কুমারীর মধ্যে দেবীভাব আরোপ করে তাঁর সাধনা সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। কুমারীপূজা আয়োজনের মধ্য দিয়ে কেবল প্রতিমার আরাধনা সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং নারীর ভেতরে থাকা শক্তি, মর্যাদা এবং সৃষ্টিশীলতার প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়।
মাতৃশক্তির এই সার্বজনীন বন্দনার মাধ্যমে সমাজে নারীর প্রতি সম্মান এবং শুভবোধ ত্বরান্বিত হবে—এমন ইতিবাচক প্রত্যাশাই পুরো পূজার মূল বার্তা হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর