নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
উপস্থাপক সামিয়া আফরিনের জীবন ও ক্যানসার জয়ের কঠিন লড়াইয়ের গল্প এখন অনেকেরই জানা। বর্তমানে তিনি ওভারিয়ান ক্যানসারের মুখোমুখি হয়ে নিয়মিত কেমোথেরাপির চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসকের পূর্বের সতর্কতা অনুযায়ী চুল ঝরে যাওয়ার বিষয়টি তিনি আগে থেকেই মানসিকভাবে গ্রহণ করছিলেন। প্রথমে নিজের চুল ছেঁটে ছোট করেন এবং পরবর্তীতে জ্যেষ্ঠ ছেলের হাত দিয়ে নিজের মাথা ন্যাড়া করিয়ে নেন। ঠিক এর পরপরই ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ স্বামী ও ছেলে নিজের মাথা থেকেও সব চুল ফেলে দিয়ে তাঁর পাশে সংহতি প্রকাশ করেন। গত পনেরো সেপ্টেম্বর সোশ্যাল মিডিয়ায় মাথা ন্যাড়া করার একটি বিশেষ ভিডিও ক্লিপ আপলোড করে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করেছিলেন তিনি। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে কেমোথেরাপির কারণে চুল হারানোর বিষয়টিকে নিয়ে অহেতুক মনঃকষ্ট না বাড়িয়ে বরং সহজভাবে মেনে নেওয়াই শ্রেয়। সবকিছু নিয়ে হতাশা প্রকাশ না করে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়াটাই হলো আসল বিষয়।
গত বছরের বিশ মার্চ রাজধানীর বনানী এলাকায় ক্যানসার আক্রান্ত রোগীরা যেন সহায়তা পায় সেজন্য আয়োজিত রিভোগ ওয়্যার টু কেয়ার পোশাক প্রদর্শনীতে নিজের অসুস্থতার কথা প্রথমবার জনসমক্ষে প্রকাশ করেন তিনি। এর আগে পরিবারের সদস্য ও একান্ত কাছের কিছু মানুষ ছাড়া আর কেউ তার এই মারণব্যাধির ব্যাপারে জানতেন না। গত এগারো অক্টোবর বনানীর নিজ বাসভবনে বসে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে খোলামেলা আলাপকালে সামিয়া জানান যে বাহ্যিক সৌন্দর্য বলতে চুলই হলো প্রধান, কিন্তু চুল থাকুক বা না থাকুক মনের ভেতর আত্মবিশ্বাস থাকাটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। সৃষ্টিকর্তা তাঁকে হায়াত দান করেছেন এবং নিজ পায়ে হেঁটে চলাফেরা করতে পারছেন এটাই তাঁর কাছে সবচাইতে বড় প্রাপ্তি বলে তিনি মনে করেন।
চলতি বছরগুলোতে সামিয়ার জীবনে একের পর এক ক্যানসার আঘাত হেনেছে। ২০২২ সালের শুরুর দিকে তাঁর শরীরে প্রথম কোলন ক্যানসার ধরা পড়েছিল। চিকিৎসকদের দেওয়া পরামর্শ অনুযায়ী ওই বছরের এপ্রিল মাসে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জ জমিয়েছিলেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান যে তাঁর ক্যানসার একেবারে চতুর্থ ধাপে গড়িয়েছে। অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপির নাম শুনে তিনি মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। এমনকি কোনো ধরনের চিকিৎসা না নিয়েই দেশে ফিরে আসার কথাও তার মাথায় এসেছিল। তিনি স্মৃতিচারণা করে জানান যে তাঁর চিকিৎসক দেবর যখন প্রথম এই দুঃসংবাদটি দেন, তখন তিনি ভেবেছিলেন যা হওয়ার হয়ে গেছে। এমনকি সেদিন সন্ধ্যায় সেজেগুজে দাওয়াতেও অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু সিঙ্গাপুরে গিয়ে যখন জানতে পারলেন ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে তখন তিনি ভেঙে পড়েন এবং প্রচুর কান্নাকাটি করেন। তাঁর মনে হয়েছিল এই চিকিৎসা শুরু হলে তাঁর সম্পূর্ণ জীবনযাত্রা পুরোপুরি বদলে যাবে।
পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাঁকে ইমিউনোথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেন এবং তিনি সেই ব্যয়বহুল চিকিৎসা নিতে সম্মত হন। এভাবেই শুরু হয় ক্যানসারের বিরুদ্ধে তাঁর সম্পূর্ণ নতুন আরেকটি কঠিন অধ্যায়। একুশ দিন পরপর এই থেরাপি নেওয়ার সময় তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। প্রথম দফার থেরাপির পর তিনি ঠিকমতো খাবার গিলতে পারতেন না এবং তাঁর পুরো ত্বকে তীব্র চুলকানির সমস্যা দেখা দিয়েছিল। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার সময় তিনি পায়ে হেঁটে চলাচল করলেও চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার সময় তাঁকে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হয়েছিল। ২০২৩ সালে দেশে ফিরে আসার পরও তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার শিকার হয়েছেন। এক পর্যায়ে পাতলা পায়খানার মারাত্মক সমস্যায় তাঁকে ডায়াপার পরে হাসপাতালে পর্যন্ত ভর্তি হতে হয়েছিল।
সেই কষ্টের তীব্রতা বোঝাতে গিয়ে তিনি জানান যে স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্মদানের সময় প্রসববেদনা যেমন হয়, তাঁর শরীরেও ঠিক সেই রকমের তীব্র যন্ত্রণা অনুভূত হতো। এতকিছুর পরেও তিনি চিকিৎসা বন্ধ রাখেননি। শুরুর দিকে সিঙ্গাপুরে যাওয়ার সময় স্বামী ও ননদসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তাঁর সফরসঙ্গী হতেন। তবে পরবর্তীতে তিনি একাই নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন। পরিবারের বাকিদেরও নিজস্ব কাজ ছিল এবং নিজের ভেতরেও শক্ত থাকার এক প্রচণ্ড জেদ কাজ করছিল। চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো ফল পাওয়ায় তিনি ধীরে ধীরে আগের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছিলেন। কিন্তু নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে ফলোআপ করার সময় জেনিটিক টেস্টে তাঁর শরীরে নতুন করে আবারও ক্যানসার ধরা পড়ে। এবার তাঁর ডিম্বাশয় বা ওভারিয়ান ক্যানসার শনাক্ত হয়। গত বাইশে জুলাই তিনি সিঙ্গাপুরে সফলভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করান। বর্তমানে তাঁর নিজ দেশেই কেমোথেরাপির প্রক্রিয়া চলছে। আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে তাঁর মোট ছয়টি কেমোথেরাপির কোর্স সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এবারের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে খাবারের কোনো স্বাদ বা গন্ধ কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না, মুখমণ্ডল লাল বর্ণ ধারণ করছে এবং মাথায় তীব্র চুলকানি হচ্ছে। তবে এই কষ্টের কথা কাউকে মুখ ফুটে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। একমাত্র যিনি এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাবেন কেবল তিনিই এর তীব্রতা উপলব্ধি করতে পারবেন।
জেনেটিক টেস্টের মাধ্যমে তাঁর শরীরের ভেতরে জিনগত কিছু ত্রুটি রয়েছে বলে ধরা পড়েছে বলে তিনি জানান। এর ফলে ভবিষ্যতে শরীরের অন্য কোনো অংশে আবারও ক্যানসার বাসা বাঁধতে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে। তা সত্ত্বেও তিনি বিন্দুমাত্র আশা হারাতে নারাজ। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন যে তিনি আশাবাদী তাঁর শরীরে এই রোগ আর ফিরে আসবে না।
পরিবারের অটুট শক্তিই হলো তাঁর মূল ভরসার স্থল। স্বামী ছাড়াও দুই সন্তান এবং বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী আবদুর রহিম ও গৃহিণী মা জীবন নাহারকে নিয়ে তিনি বনানীতে বসবাস করছেন। সাতাইশের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে স্বামী রেজাউল ইমরানকে তিনি প্রতিটি বিপদ ও কঠিন মুহূর্তে নিজের পাশে পেয়েছেন। এছাড়া নিজের বাবা এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছ থেকেও তিনি শুরু থেকেই সর্বাত্মক সহযোগিতা লাভ করে আসছেন। পরিবারের কোনো সদস্যের শরীরে ক্যানসার বাসা বাঁধলে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব যে সবার ওপরেই পড়ে তা ভালোভাবেই জানেন তাঁর বড় ছেলে আহানাফ আরাবি। তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসন বা বিবিএ বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। মায়ের শরীরে প্রথমবার ক্যানসার ধরা পড়ার সময় তিনি কানাডায় উচ্চশিক্ষা নিচ্ছিলেন। কিন্তু মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে মায়ের সান্নিধ্যে থাকার জন্য তিনি পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দেশে চলে আসেন। পরবর্তীতে তিনি দেশেই নতুন করে শিক্ষাজীবন শুরু করেন।
মাকে মাথা ন্যাড়া করতে সহযোগিতা করা এবং নিজের চুলও কেটে ফেলার কারণ ব্যাখ্যা করে আহানাফ জানান যে তিনি মূলত মাকে মানসিকভাবে সাহস জোগানোর জন্যই চুল কেটেছেন। তাঁর নিজেরও চুল ফেলে দিতে বেশ ভালোই লেগেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গেলে সহপাঠী বন্ধুরা চুল কেটে ফেলার কারণ জানতে চেয়েছে এবং মায়ের অসুস্থতার কথা শোনার পর সবাই তাঁকে সমর্থন জুগিয়েছে। সামিয়ার পরিবারে আরও একটি সন্তান রয়েছে যার অভিভাবকত্বের দায়িত্ব তিনি নিজেই কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তাঁর নিজের ভাইয়ের ছেলে আয়মান আওসাফের আইনি অভিভাবক হিসেবে তিনি তার দেখাশোনা করছেন। আয়মান বর্তমানে ও লেভেলে পড়াশোনা করছে। সামিয়ার মতে, এই মারণব্যাধির চিকিৎসায় শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি মানসিক চাপ সামলে চলাও অত্যন্ত জরুরি। একজন রোগী অনেক সময় কথায় কথায় রেগে যান, কাউকে সহ্য করতে পারেন না কিংবা কোনো পরিস্থিতি মেনে নিতে চান না। এই সময়ে পরিবারের সদস্যদের অসীম ধৈর্য এবং মানসিক সমর্থন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়।
কষ্টের কথা প্রচার না করে বরং মনের জোর নিয়ে শক্ত থাকার বার্তা ছড়াতে চান তিনি। গত বছরের বিশ মার্চ রাজধানী ঢাকার বনানীতে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের সাহায্যার্থে আয়োজিত রিভোগ ওয়্যার টু কেয়ার পোশাক প্রদর্শনীতে তিনি প্রথম নিজের ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন। এর আগে তাঁর ঘনিষ্ঠজন ছাড়া অনেকেই তাঁর এই স্বাস্থ্যগত জটিলতার বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন। এরপর থেকে নিয়মিতভাবেই তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্যানসার নিয়ে লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে এই রোগের সঙ্গে বসবাস করেও কীভাবে মানসিক দিক থেকে দৃঢ় থাকা যায়, সেই বিষয়ে তিনি তাঁর নিজের মূল্যবান অভিজ্ঞতা ফেসবুকের মাধ্যমে সবার সঙ্গে ভাগ করে নেন।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর