নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
উত্তর জনপদের অবকাঠামোগত কাঠামোর কিছু উন্নতি সাধিত হয়েছে। এই অগ্রগতির ফলে নতুন বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলেও, পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, জ্বালানি ঘাটতি এবং উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে শিল্প খাত কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না। সম্প্রতি এই অঞ্চলের বাণিজ্য পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এমদাদুল হক।
এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল স্তম্ভ হলো কৃষিজাত খাত। ধান, ভুট্টা, আলু, বিভিন্ন ধরনের সবজি এবং তামাক চাষাবাদ, বাণিজ্যিক বিপণন ও প্রক্রিয়াকরণ প্রক্রিয়া অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। এ ছাড়া উদ্যান চাষ ও নার্সারি ব্যবসার বিস্তার ঘটছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সমাদৃত শতরঞ্জি ছাড়াও বিভিন্ন কুটির ও হস্তশিল্পের বিশেষ কদর রয়েছে।
চাল, সার, পাটপণ্য, ভোজ্যতেল, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং কীটনাশকের পাইকারি ও খুচরা বাজার অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, শিক্ষা, পরিবহন ও আর্থিক সেবার পরিধিও প্রসারিত হচ্ছে। যোগাযোগের সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটলেও মূল্যস্ফীতি এবং ঋণ পাওয়ার জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীরা এখনো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন।
উদ্যোক্তাদের মুখোমুখি হওয়া প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মূলধন সংকট। ব্যাংকঋণের চড়া সুদের হার, কঠোর শর্ত এবং বিতরণে জটিলতার কারণে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে ব্যর্থ হচ্ছেন অনেকে। অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার গতি অত্যন্ত মন্থর হওয়ায় বড় বিনিয়োগের সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে।
সাতয়ের দশকে স্থাপিত রংপুর বিসিক শিল্পনগরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা, বর্ষার মৌসুমে জলাবদ্ধতা, নিরাপত্তার অভাব ও স্থানের তীব্র সংকট রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই আরেকটি বিসিক নগর গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো।
বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতার দরুন স্থানীয় বহু প্রতিষ্ঠান তাদের পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমদাদুল হকের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক কারখানা আংশিক উৎপাদনে চলছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।
এই অঞ্চলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কয়েকটি ইউনিট ছাড়াও বহু অটো রাইস মিল, প্লাস্টিক সামগ্রী ও কৃষিপণ্য প্যাকেজিং কারখানা এবং হিমাগার রয়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পের মধ্যে বেকারি, আটা-ময়দার মিল এবং অ্যালুমিনিয়াম পণ্য তৈরির কারখানা দৃশ্যমান। তবে খেলাপি ঋণ ও লোকসানের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রচুর পরিমাণে আলু, ধান, ভুট্টা ও আম উৎপাদিত হলেও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতটি এখনো শুরুর পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে কিছু চালকল, হিমাগার ও অল্প কিছু পাটকলের অস্তিত্ব রয়েছে। শিল্পায়ন দ্রুত করতে ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা এবং নির্দিষ্ট খাতে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে চেম্বার।
চারটি নির্ধারিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে অন্তত একটি দ্রুত প্রস্তুত করে ব্যবসায়ীদের জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে সব ধরনের অবকাঠামো ও পরিষেবা নিশ্চিত হলে বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং খাদ্যশিল্প, হালকা প্রকৌশল ও প্লাস্টিক খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারিত হবে।
অন্যদিকে, এই অঞ্চলে নারী ও তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাঁরা মূলত হস্তশিল্প, বুটিকস, শতরঞ্জি তৈরি, অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা, ক্যাটারিং, রেস্তোরাঁ এবং আইসিটি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে সফলতার সঙ্গে কাজ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর