নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিখ্যাত মার্জার পরিবারের সর্ববৃহৎ সদস্য হিসেবে পরিচিত বাঘের শারীরিক অবয়ব ও আচরণগত নানা বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বিড়ালের ব্যাপক সাদৃশ্য রয়েছে। জিনগত ও শারীরিক এই মিলের সূত্র ধরেই মূলত গ্রামীণ জনপদে বাঘকে স্নেহের সঙ্গে ‘বাঘের মাসি’ বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
সুরক্ষিত এই বন্য প্রাণীর গাত্রবর্ণ সাধারণত উজ্জ্বল হলুদ থেকে গাঢ় কমলার মিশ্রণে তৈরি হয়। এর পুরো অবয়বজুড়ে জটহীন কালো ডোরাকাটা রেখা শোভা পায়, যা একে ভিন্নধর্মী নান্দনিকতা প্রদান করেছে। অন্যদিকে প্রাণীটির সম্পূর্ণ উদর বা পেটের অংশটি নিখাদ ধবধবে সাদা রঙের হয়ে থাকে।
একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ বাঘের গড় ওজন প্রায় ২২০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে, যেখানে স্ত্রী বাঘ বা বাঘিনীর গড় ওজন প্রায় ১৪০ কেজি। কাঁধের অংশ বরাবর এদের উচ্চতা প্রায় ১০০ সেন্টিমিটারের কাছাকাছি পৌঁছায়। মার্জার প্রজাতির মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী প্রাণী হিসেবে স্বীকৃত।
সাধারণত একটি বাঘ সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। অন্যদিকে স্ত্রী বাঘ সাধারণত প্রতি তিন বছর অন্তর নিয়মিতভাবে তিনটি থেকে চারটি করে শাবক প্রসব করে থাকে। জন্ম নেওয়া এই শাবকেরা প্রায় এক বছর বয়স পর্যন্ত তাদের মাতৃকোলেই অবস্থান করে।
পায়ে হাঁটার সময় বাঘ যাতে কোনো শব্দ না করতে পারে, সেজন্য এদের থাবার নিচের অংশ অত্যন্ত নরম ও পুরু গাদায় মোড়ানো থাকে। বনাঞ্চলের ভেতরে চলাফেরা কিংবা শিকারের পেছনে ধাওয়া করার সময় এই বিশেষ শারীরিক গঠনের কারণে কোনো আওয়াজ তৈরি হয় না, যার ফলে সে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে শিকারের অতি নিকটে পৌঁছে যেতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জাতীয় পশু হলো বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এই বিপন্ন প্রাণীটি আমাদের দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনে বসবাস করে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক আবহাওয়া ও পরিমণ্ডলই এই রাজকীয় পশুর প্রধান ও স্থায়ী আবাসস্থল হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকে বাঘ পুরোপুরি মাংসাশী প্রাণী হিসেবে জীবন নির্বাহ করে। সুন্দরবনের স্থানীয় হরিণ, বুনো শূকর এবং বিভিন্ন প্রজাতির বানরের মাংস এদের প্রতিদিনের প্রধান খাবার। একটি সাবালক বাঘ সাধারণত প্রতিদিন নিয়মিতভাবে সাত থেকে আট কেজি পর্যন্ত কাঁচা মাংস গ্রহণ করে থাকে।
প্রাণীটির প্রখর দৃষ্টিশক্তি, সূক্ষ্ম শ্রবণেন্দ্রিয় এবং অত্যন্ত কার্যকর ঘ্রাণশক্তি একে বনের ভেতরে একজন পারদর্শী ও দক্ষ শিকারি হিসেবে গড়ে তুলেছে। এছাড়া এদের রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী থাবা ও নখর, যা হাঁটার সময় শব্দহীন থাকে কিন্তু আক্রমণের মুহূর্তে বেরিয়ে আসে। পাশাপাশি খাদ্য চিবানোর জন্য তাদের চোয়াল অত্যন্ত মজবুত এবং দাঁত অত্যন্ত ধারালো ও তীক্ষ্ণ হয়ে থাকে।
বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত এবং মানুষের বেআইনি শিকারের কালো থাবার কারণে সুন্দরবনের এই মূল্যবান রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপস্থিত হলে এদের জীবন চরম বিপদের মুখে পড়ে। এর বাইরে একশ্রেণির লোভী মানুষ মূল্যবান চামড়া ও অন্যান্য দেহাংশের মোহে বেআইনিভাবে বাঘ হত্যা করছে, যার ফলে প্রজাতিটি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এসে ঠেকেছে।
জলচর প্রাণীর মতো বাঘ খুব পটুভাবে নদী বা খাল সাঁতরে পার হতে পারে। জলাশয় পার হওয়ার সময় তারা লক্ষ্যস্থলের দিকে সোজাসুজি সাঁতার কেটে এগিয়ে যায়। যদি কখনো জলের প্রবল স্রোতের টানে তারা কিছুটা দূরে সরেও যায়, তবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সাঁতার কেটে আবার পূর্বের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ফিরে আসে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর