নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
গত সাত দিনে ফরাসি জনপদে তরুণদের পক্ষাবলম্বন করে রাজপথ দখল করেছিলেন বহু মানুষ। বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতের পোস্টারে দেখা মিলছিল একটি ব্যতিক্রমী ও অদ্ভুত শব্দগুচ্ছের। কথামালাটি হলো ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’।
ইসলাম ধর্মের প্রার্থনা সূচনার অভিব্যক্তি এবং ফরাসি ভাষার অন্ধকার সংক্রান্ত একটি শব্দের সমন্বয়ে এই বাক্যটি গঠিত হয়েছে। দৃশ্যত এই শব্দগুলোর একত্রে কোনো যুক্তিসংগত অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত উপকরণের ঘাটতি নিয়ে গত মাসে তরুণদের এই আন্দোলন মাথাচাড়া দেয়। সেই থেকে এই স্লোগানটি বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যকার ফারাকের একটি বড় প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরবর্তীতে এই প্রতিবাদী কর্মসূচি সহিংস রূপ ধারণ করে।
জানা যায়, স্ন্যাপচ্যাট নামক অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যমে প্রথম এই বাক্যটির ব্যবহার শুরু হয়েছিল। শিক্ষার্থী আন্দোলনের গোপন চ্যাটরুমে ঢোকার প্রচেষ্টাকারী এক ব্যক্তি এই উক্তিটি করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
বার্তা প্রেরক উক্ত অ্যাপের ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে নির্দিষ্ট এই অভিবাদন জানান। বাক্যটির গঠনভঙ্গি বেশ অস্বাভাবিক ঠেকেছে। ফ্রান্সে বসবাসরত তরুণ সমাজের প্রচলিত আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্রণকে অনুকরণ করেই মূলত এটি লেখা হয়েছে প্রতীয়মান হয়।
পরবর্তীতে সেই অ্যাকাউন্ট থেকে আরও যোগ করা হয়েছিল যে তারা সবকিছু ধ্বংস করে ফেলবে।
মামাদৌ কিংবা আবদুল্লাহ জাতীয় নাম এবং আলজেরিয়ার পতাকা সংবলিত বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্ট থেকেই মূলত এই বার্তাগুলো ছড়ানো হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যান্য ব্যবহারকারীরা এই বাক্যটিকে হাস্যকর হিসেবে নিয়ে সেগুলোর ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তবে নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রকাশিত এই বার্তাগুলোর মূল উৎস নিশ্চিত করতে পারেনি।
অনেক তরুণ নাগরিকের মনে সন্দেহ দানা বেঁধেছে যে বার্তাগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের পাঠানো। তাঁরা অত্যন্ত আনাড়িভাবে ছাত্র বিক্ষোভে অনুপ্রবেশের ফন্দি আঁটছিলেন।
বিক্ষোভকারীরা অবিলম্বেই এই বাক্যটিকে একটি উপহাসমূলক স্লোগান হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। আন্দোলন দমনে প্রশাসনের নানা অপচেষ্টাকে ব্যঙ্গ করাই ছিল এই অভিনব স্লোগানের মূল লক্ষ্য।
বর্তমান সময়ে এই স্লোগানটিকে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের দীর্ঘদিনের বৈরিতার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব বংশোদ্ভূত ফরাসিদের সঙ্গে প্রশাসনের বিরোধ এতে ফুটে ওঠে। ঔপনিবেশিক আমলের সাবেক বাসিন্দাদের সন্তান ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের কালিম্পুক্ত করার অপচেষ্টা চলছে বলে তারা অভিযোগ করে আসছেন।
সাংবাদিকরা যোগাযোগ করলে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের কোনো কর্মকর্তা এই বাক্য ব্যবহার করেছেন কি না সে বিষয়ে মুখ খুলেনি। তবে তারা স্বীকার করেছে যে অপরাধ দমনে তদন্তকারীরা অনলাইনে মাঝেমাঝে ছদ্মবেশ ধারণ করে থাকেন।
মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে এই পরিস্থিতিতে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের যোগাযোগ সংরক্ষণ এবং আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য ছদ্মনাম ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতদের কাছে এই অদ্ভুত উক্তিটি সরকার ও তরুণদের ব্যবধানকে স্পষ্ট করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের দাবি মানতে অনীহা প্রকাশ করা হয়েছে বলেই তারা মনে করছেন।
ফ্রান্সের শক্তিশালী ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিনিধি সাবরিন খারবাচ জানিয়েছেন যে কোনো তরুণ এমন ভাষায় কথা বলে না। তরুণেরা এই বাক্য নিজেদের আয়ত্তে এনে প্রমাণ করেছে যে নজরদারির চেষ্টা তাদের চোখ এড়ায় না এবং তারা নিজেদের গুছিয়ে নিতে সক্ষম।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদানি সাবাদি মনে করেন বার্তাগুলো প্রশাসনের পূর্বসংস্কারের বহিঃপ্রকাশ। কারা ব্যারিকেড তৈরি করছে কিংবা ভাঙচুর চালাচ্ছে তা তারা যেন আগেই অনুমান করে নিয়েছিল।
প্যারিসের উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রী ফেদ্রে কেমেন মন্তব্য করেছেন যে এই বাক্যটি একটি জাতীয় কৌতুক কিংবা তরুণদের অত্যন্ত বাজে নকল রূপ ছাড়া আর কিছু নয়।
তিনি আরও যোগ করেন যে এই উক্তির মাধ্যমে সম্পত্তি ভাঙচুরকারীরা সবাই আরব এমন একটি বর্ণবাদী ধারণাই প্রচার করা হয়েছে।
ফ্রান্সের গণ্ডি পেরিয়ে বেলজিয়াম ও জার্মানির অনুরূপ বিক্ষোভেও এই স্লোগানের বিস্তার ঘটেছে।
সুইডিশ পরিবেশবাদী গ্রেটা থুনবার্গ ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে নিজের সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তাকে এই স্লোগান উচ্চারণ করতে এবং তরুণ প্রজন্মের নানা অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করতে দেখা যায়।
নতুন এই স্লোগানের ব্যবহার ভারতের তেলাপোকা আন্দোলনের হাস্যরসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উন্নত শিক্ষার দাবিতে আয়োজিত সেই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়েছিল। প্রধান বিচারপতির এক অবমাননাকর মন্তব্যের পর প্রতিবাদকারীরা নিজেদের সেই নামেই পরিচিত করেছিল।
গত মাসে ফরাসি স্কুলগুলোতে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনের মূল দাবি ছিল জরাজীর্ণ ভবনের সংস্কার, শিক্ষক বৃদ্ধি, শিক্ষার্থী কমানো ও সময়সূচির শিথিলতা।
অনেক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু জায়গায় সহিংসতা ঘটে এবং অন্তত চব্বিশটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় প্রায় আট হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন শ্রমিক ও অন্যান্য দলের কর্মসূচির সঙ্গে মিশে দেশব্যাপী দাঙ্গায় রূপ নেয়।
পুলিশের কঠোর দমনপীড়ন আন্দোলনকারীদের আরও বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
গত মাসের শুরু থেকে চলা এসব বিক্ষোভে বলপ্রয়োগের চৌত্রিশটি অভিযোগের তদন্ত চলছে। এর মধ্যে পুলিশের কাছ থেকে নিক্ষিপ্ত কাঁদানে গ্যাসের শেলে এক চৌদ্দ বছর বয়সী কিশোরের পঙ্গু হয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর