নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবীব্যাপী মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে অত্যন্ত কঠিন ও দুর্বিষহ করে তুলেছে। সীমিত আয়ের বিপরীতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতি ও লাগামহীন পরিস্থিতির কারণে বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মারাত্মক অর্থসংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।
ইসলাম ধর্ম জাগতিক জীবনের যেকোনো জটিল সংকট মোকাবিলা করার জন্য অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও কার্যকর দিকনির্দেশনা প্রদান করে থাকে। এই চলমান অর্থনৈতিক চাপ সামলানোর জন্য একজন মুমিন বান্দা কীভাবে সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন, তার একটি সুন্দর রূপরেখা এখানে তুলে ধরা হলো।
অর্থসংকট সফলভাবে সামাল দেওয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে প্রধান হাতিয়ার হলো নিজের খরচে কঠোর লাগাম টানা এবং জীবনযাত্রার সব ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। ইসলাম ধর্মে কৃপণতা যেমন অত্যন্ত নিন্দনীয় একটি বিষয়, তেমনি যেকোনো ধরনের অপচয় করা এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করাও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মুমিন বান্দাদের ব্যয়ের সঠিক ভারসাম্য শেখানোর প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, তারা যখন কোনো কিছুতে ব্যয় করে তখন যেমন কোনো অপচয় করে না, তেমনি কৃপণতাও করে না; বরং তাদের ব্যয়ের পন্থাটি হয় এই দুইয়ের ঠিক মধ্যবর্তী। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঠিক সামঞ্জস্য বজায় রাখা গেলে অপ্রয়োজনীয় ধারদেনা থেকেও সহজে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়।
মহানবী (সা.) এই বিষয়ে ইরশাদ করেছেন যে, যে ব্যক্তি তার দৈনন্দিন ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বদা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে চলে, সে কখনো অভাবগ্রস্ত হয় না। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা ও শৌখিনতা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র মৌলিক চাহিদার দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
অল্পে তুষ্ট থাকার মানসিকতা বা যেটিকে ‘কানাআত’ বলা হয়, তা একজন মুমিনের জীবনের অত্যন্ত বড় একটি সম্পদ। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে চারপাশের আধুনিক চাকচিক্য দেখে অনেক সময় মানুষের মনে মারাত্মক হতাশা জাগতে পারে, তবে নিজের চেয়ে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের দিকে তাকালে অন্তরে প্রকৃত প্রশান্তি আসে।
মহানবী (সা.) সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন যে, তোমরা জাগতিক নানা বিষয়ের ক্ষেত্রে সর্বদা তোমাদের চেয়ে নিচু স্তরের মানুষের দিকে তাকাও, কখনোই ওপরের স্তরের মানুষের দিকে তাকিয়ো না। এতে করে তোমাদের প্রতি মহান আল্লাহর দেওয়া অগণিত নেয়ামতকে কখনো ক্ষুদ্র বা তুচ্ছ বলে মনে হবে না।
অভাবের এই কঠিন সময়ে অতিরিক্ত হা-হুতাশ না করে, যতটুকু সম্পদ বা সুযোগ হাতে আছে ঠিক ততটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা তৈরি করলে মনের মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়। পরিবারের মৌলিক ব্যয়গুলো মেটানোর জন্য কেবল একটি আয়ের উৎসের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না থেকে হালাল পন্থায় বাড়তি উপার্জনের চেষ্টা করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
অবসর সময়ে ছোটখাটো ব্যবসা, কোনো কারিগরি কাজ কিংবা নিজের ভেতরের পেশাগত দক্ষতা পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। ইসলাম ধর্মে হালাল রুজির সন্ধান করাকে ফরজ ইবাদত সম্পাদনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
প্রখ্যাত মনীষী ইবনে খালদুন তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, মানুষের রিজিক কখনোই হুট করে আসমান থেকে নিজে নিজে পড়ে না; বরং মানুষের ব্যক্তিগত শ্রম, মেধা ও পেশাগত বৈচিত্র্যের মাধ্যমেই মহান আল্লাহ তাআলা বান্দার রিজিকে প্রশস্ততা দান করে থাকেন। অর্থসংকটে পড়লে অনেকেই তাৎক্ষণিক কোনো সমাধানের আশায় চড়া সুদে ঋণ নেওয়া বা ক্রেডিট কার্ডের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
কিন্তু ইসলাম ধর্মে যেকোনো ধরনের ঋণ করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, আর সুদি ঋণ গ্রহণ করা তো সম্পূর্ণভাবেই হারাম। ঋণ মানুষের রাতের প্রশান্তির ঘুম চিরতরে কেড়ে নেয় এবং দিনের আলোতেও নানা ধরনের অপমানের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মহানবী (সা.) নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ধরনের ঋণ থেকে নিরাপদে বাঁচার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে বিশেষ আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। একান্ত বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়ে যদি ঋণ নিতেই হয়, তবে তা যেন অবশ্যই সুদমুক্ত অর্থাৎ করজে হাসানা হয় এবং সেই ঋণ দ্রুত পরিশোধ করার মতো একটি দৃঢ় নিয়ত যেন অন্তরে থাকে।
তিনি আরও বলেছেন যে, যে ব্যক্তি মূলত পরিশোধ করার নিয়তেই অন্য কোনো মানুষের সম্পদ ধার হিসেবে গ্রহণ করে, মহান আল্লাহ তাআলা নিজেই তার পক্ষ থেকে সেই ঋণ আদায়ের সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করে দেন। জীবনযাত্রার এই ব্যয় বৃদ্ধি একটি বৈশ্বিক ও কাঠামোগত সমস্যা হলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে পূর্ণ সচেতনতা ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা জরুরি।
শুনতে কিছুটা অবাক লাগলেও এটা সত্যি যে, তীব্র অভাবের সময় দান-সদকা করলে মানুষের সম্পদ কখনো কমে যায় না, বরং এর মাধ্যমে সম্পদে বরকত বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। বিপদের সেই মুহূর্তে নিজের তীব্র কষ্ট সত্ত্বেও অন্য কোনো অভাবী মানুষকে সাহায্য করলে মহান আল্লাহ খুশি হয়ে বান্দার জন্য রিজিকের নতুন নতুন দরজা খুলে দেন।
পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা সব ধরনের সুদকে নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং সদকাকে সবসময় বৃদ্ধি করেন। পাশাপাশি, যেকোনো ধরনের আর্থিক সংকটের সময়ে মানুষের বেশি বেশি করে ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তিগফার পাঠ করা উচিত।
পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, বেশি বেশি ইস্তিগফারের মাধ্যমে মহান আল্লাহ বান্দার ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে বরকত দান করে থাকেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি একটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও ব্যক্তিগত সচেতনতা, পরিকল্পিত অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং আল্লাহর ওপর ভরসার মাধ্যমেই এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
একজন প্রকৃত মুমিন সবসময় এই সুদৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে, মানুষের রিজিকের চূড়ান্ত ফয়সালা একমাত্র মহান আল্লাহই করে থাকেন এবং যেকোনো কঠিন পরিস্থিতির ঠিক পরেই স্বস্তি অবধারিতভাবে আসে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর