নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মানুষের মন থেকে দূরত্ব মুছে ফেলে হৃদয়ের সম্পর্ক গভীর করতে উপহারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল সাধারণ কোনো সামাজিক প্রথা নয়, প্রিয়জনকে কোনো সামগ্রী প্রদান করা বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি সুমহান ও সুমধুর সুন্নত হিসেবে পরিগণিত হয়।
একজন মুমিন ব্যক্তির প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি কর্মই ইবাদতে রূপান্তরিত হতে পারে, যদি তা সঠিক পদ্ধতি এবং পবিত্র নিয়তের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। এই কারণে অন্য কাউকে কোনো বস্তু হাদিয়া হিসেবে দেওয়ার পূর্বে ইসলামের নির্ধারিত শিষ্টাচার ও আদবগুলো ভালোভাবে জেনে নেওয়া একান্ত আবশ্যক।
এই ধরনের উপহার বিতরণের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা সুদৃঢ় করা এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। কোনো উপহার দেওয়ার বিনিময়ে গ্রহীতার কাছ থেকে অতিরিক্ত সুবিধা কিংবা আরও অধিক মূল্যের কোনো বস্তু পাওয়ার প্রত্যাশা করলে সেই হাদিয়ার ভেতরের আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।
পবিত্র কোরআন মজিদে নিঃস্বার্থভাবে দান করার প্রশংসা করে ইরশাদ করা হয়েছে, ‘তারা বলে, আমরা তো কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের খাদ্য দান করি; আমরা তোমাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিদান বা কোনো ধরনের কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।’ (সুরা ইনসান, আয়াত: ৯)
বিখ্যাত ইসলামি মনীষী ইমাম গাজালি (র.) তাঁর অমর গ্রন্থ ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন’ (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৪৩, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৯৮২ প্রকাশনা) কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, যখন কোনো দাতা ব্যক্তি কেবল গ্রহীতার ভালোবাসা এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশায় কোনো প্রকার স্বার্থ ছাড়াই কিছু দান করেন, কেবল তখনই তা খাঁটি উপহার বা ‘হাদিয়া’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর বাইরে যদি কোনো ধরনের দুনিয়াবি স্বার্থ এর সাথে যুক্ত হয়ে যায়, তবে তা আর হাদিয়া থাকে না, বরং সেটি একধরনের উৎকোচ বা বাণিজ্যিক লেনদেনে রূপান্তরিত হয়।
যাঁকে উপহার প্রদান করা হচ্ছে, তাঁর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মাধ্যম হলো সম্পূর্ণ হালাল ও পবিত্র পন্থায় অর্জিত অর্থ দিয়ে উপহার সামগ্রী ক্রয় করা। অবৈধ বা সন্দেহজনক পন্থায় অর্জিত অর্থের মাধ্যমে কেনা যেকোনো মহারঘ উপহারের তুলনায় হালাল পন্থায় উপার্জিত সামান্য একটি উপহার অনেক বেশি বরকতময় হয়ে থাকে।
এই প্রসঙ্গে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া অন্য কোনো কিছু গ্রহণ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
কোনো ব্যক্তিকে উপহার দেওয়ার পর সেই বিষয়ে অহংকার প্রদর্শন করা কিংবা পরবর্তীতে সেই উপকারের কথা গ্রহীতাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে খোঁটা দেওয়া অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয় একটি কাজ। এই ধরনের আচরণের ফলে ওই উপহারের বিনিময়ে প্রাপ্ত সমস্ত সওয়াব ও সম্মান পুরোপুরি বরবাদ হয়ে যায়।
পবিত্র কোরআনে এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে ইরশাদ করা হয়েছে, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রচার করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দানকে ওই ব্যক্তির মতো পণ্ড কোরো না, যে কেবল লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে নিজের ধনসম্পদ ব্যয় করে থাকে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬৪)
উপহার প্রদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই পূর্ণ আন্তরিকতা থাকা আবশ্যক। সমাজ কিংবা আত্মীয়স্বজনের চাপে পড়ে নিজের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কিংবা ধারদেনা করে অত্যন্ত ব্যয়বহুল উপহার কেনার কোনো রূপ বাধ্যবাধকতা ইসলাম ধর্মে রাখা হয়নি। বরং ছোটখাটো এবং নিজের সাধ্যের সীমার ভেତরে দেওয়া উপহারই মানুষের পারস্পরিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করার জন্য যথেষ্ট।
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) উম্মতকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে নিয়মিত উপহার আদান-প্রদান করো, কারণ এর মাধ্যমে তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৫৯৪)
হাদিয়ার ক্ষেত্রে বস্তুর আর্থিক মূল্যের চেয়ে দাতা ব্যক্তির আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। একদম সামান্য কোনো বস্তু হলেও যদি তা হাসিমুখে প্রাপকের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তবে তা গ্রহীতার মনের গভীরে গভীর রেখাপাত করে এবং সমাজের ওপর চেপে বসা লৌকিকতার যাবতীয় অহেতুক চাপ কমিয়ে দিতে সহায়তা করে। এই বিষয়ে ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (র.) তাঁর ‘ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি’ (খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২১০, দারুল মাআরিফ, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি) গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
পারিবারিক পরিমণ্ডলে উপহার বিতরণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয় হলো নিজ সন্তানদের মাঝে পূর্ণ সমতা ও ন্যায়বিচার বজায় রাখা। কোনো এক সন্তানকে অধিক ভালোবেসে তাকে খুব দামি উপহার দেওয়া এবং অন্য সন্তানকে তা থেকে বঞ্চিত করা ইসলামি ন্যায়পরায়ণতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
বিশিষ্ট সাহাবি হজরত নোমান ইবনে বশির (রা.)-কে তাঁর সম্মানিত পিতা একটি বিশেষ দাস উপহার হিসেবে প্রদান করলে বিশ্বনবী (সা.) সেই দান অনুমোদন করেননি। তিনি তাঁর পিতাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কি তোমার ঔরসজাত সব সন্তানকে এই ধরনের উপহার দিয়েছ?’ পিতা যখন ‘না’ বলে উত্তর দিলেন, তখন নবীজি তাঁকে সাবধান করে বললেন, ‘তাহলে তোমরা মহান আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজ সন্তানদের মাঝে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৮৭)
উপহার কেবল বস্তুগত কোনো কিছুর স্থূল আদান-প্রদান নয়, এটি মূলত দুটি মানব হৃদয়ের মাঝে মেলবন্ধন তৈরি করার মাধ্যম। পবিত্র নিয়ত, হালাল উপার্জন এবং শতভাগ আন্তরিকতার সুষম মিশ্রণে প্রদান করা সামান্য একটি উপহারও একজন মুমিন ব্যক্তির আমলনামায় বিরাট পুণ্যের কারণ হতে পারে, যা তাঁর ইহকাল ও পরকালের জীবনে এনে দিতে পারে চিরশান্তি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর