নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মন খারাপের কারণ নিয়ে চিন্তা করা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলেও, কোনো ব্যর্থতা, দুঃখজনক ঘটনা কিংবা অপ্রীতিকর স্মৃতি নিয়ে বারবার অবিরত ভেবে যাওয়া মানুষের মনে এক ধরনের নেতিবাচক চিন্তার চক্র তৈরি করে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই মানসিক অবস্থাকে ‘রুমিনেশন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
২০২০ সালে ‘বিহেভিয়র রিসার্চ অ্যান্ড থেরাপি’ নামক সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, এ ধরনের ক্ষতিকর চিন্তা মানুষের নেতিবাচক আবেগকে দীর্ঘায়িত করতে সক্ষম। এর পাশাপাশি এটি মানুষের সমস্যা সমাধানের স্বাভাবিক ক্ষমতা এবং দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে মনোযোগ দেওয়ার সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে দেয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মূলত একটি দুষ্টচক্রের সৃষ্টি হয়, যার ফলে মন খারাপ থাকার কারণে মানুষ সাধারণত তার প্রয়োজনীয় কাজকর্মগুলো এড়িয়ে চলতে শুরু করে। নির্ধারিত কাজগুলো সম্পন্ন না করায় সার্বিক পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরও বেশি জটিল ও কঠিন মনে হতে থাকে।
একপর্যায়ে মানুষের মনে এমন একটি ধারণার জন্ম নেয় যে, তার জীবনে সম্ভবত আর কখনো কোনো কিছু ভালো লাগবে না, যা পরবর্তীতে তার ভেতরের নেতিবাচক চিন্তার মাত্রা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে আত্মবিশ্লেষণ মাত্রেই সবসময় ক্ষতিকর কিছু; বরং একই বিষয় নিয়ে বারবার মনমরা হয়ে ভাবার পরিবর্তে মূল সমস্যাটি আসলে কী এবং বর্তমানে তার বিপরীতে করণীয় কী, সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত পন্থায় চিন্তা করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ।
২০২২ সালে ‘পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি রিভিউ’ নামক সাময়িকীতে প্রকাশিত দুই শতাধিক গবেষণার ওপর চালানো একটি মেটা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে মানসিকভাবে খানিকটা দূরত্ব তৈরি করা এবং সুনির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে চিন্তা করা নেতিবাচক আবেগ কমাতে সাহায্য করে।
এই উদ্দেশ্যে নিজের বর্তমান পরিস্থিতিকে কোনো বাইরের অপরিচিত মানুষের দৃষ্টিতে অবলোকন করার চেষ্টা করা যেতে পারে, যেখানে নিজেকেই প্রশ্ন করা প্রয়োজন যে—একই ধরনের সমস্যায় যদি কোনো বন্ধু পড়ত, তবে তাকে আপনি সুনির্দিষ্ট কী পরামর্শ দিতেন।
নিজের সঙ্গে এমন অনুশীলনের ফলে আবেগের বশে অন্ধভাবে না ভেবে বরং ঠান্ডা মাথায় গোটা পরিস্থিতি পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করা অনেক সহজ হয়ে ওঠে, যা মানসিক চাপ লাঘবে ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন পর্যালোচনা ও আলোচনায় সময়ের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, কারণ নেতিবাচক চিন্তা যখন মানুষের মনোযোগ সংকুচিত করে কাজের আগ্রহ একেবারে কমিয়ে দেয়, তখন গভীর আত্মবিশ্লেষণে না গিয়ে ছোট কোনো কাজ হাতে নেওয়া সহজতর হতে পারে।
মন এভাবেই কিছুটা স্থির ও শান্ত হলে তখন মূল সমস্যাটি নিয়ে গঠনমূলক ও ইতিবাচকভাবে চিন্তা করার দারুণ সুযোগ তৈরি হয়, যা ব্যক্তিজীবনের নানা জটিলতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।
এসবের নেপথ্যে মূলত কাজ করে মানুষের নিজস্ব আবেগ, অন্তర్নিহিত প্রেরণা এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডের মধ্যকার নিবিড় পারস্পরিক সম্পর্ক, যার মাধ্যমে মন খারাপ থাকলে মানুষ সাধারণত হাঁটাচলা কিংবা অন্য কোনো কাজ করার আগ্রহ সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে।
পরিশেষে, ঠিক এই ধরনের ছোটখাটো নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে ওঠার মাধ্যমেই মনের অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব, যা সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান না আনলেও মনোযোগ অন্যদিকে সরাতে এবং কর্মহীনতা দূর করতে বিশেষভাবে সহায়তা করে।
A,অর্থাৎ ভালো লাগার সুনির্দিষ্ট অনুভূতির অপেক্ষায় বসে না থেকে, বরং কাজ শুরু করার মাধ্যমেই নিজেদের ভেতর ভালো লাগার চমৎকার সুযোগ তৈরি করে নেওয়া যায়।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর