নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
টরন্টোর একটি মনোরম ও নিরিবিলি অঞ্চলের সুদৃশ্য লাল ইটের বাসভবনের বসার ঘরে উনুনপারের তাকের দিকে তাকালে জিওফ্রে হিন্টনের দীর্ঘ কর্মজীবনের অসাধারণ সাফল্যের নিদর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই তাকে অন্যান্য অনেক পুরস্কার ও স্মারক চিহ্নের মাঝখানে সযত্নে রাখা রয়েছে মর্যাদাপূর্ণ টিউরিং অ্যাওয়ার্ডের একটি ক্ষুদ্র রৌপ্য থালা, যা মূলত কম্পিউটার বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত। তিনি এই স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন সহযোগী বেঞ্জিও এবং সহকর্মী ইয়ান লেকানের সঙ্গে যৌথভাবে।
এর বাইরেও হিন্টনের বর্ণাঢ্য ঝুলিতে পদার্থবিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয়ে নোবেল পুরস্কার অর্জনের গৌরবও যুক্ত রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি ২০২৩ সালে বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, যাতে কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বাধা বা বিধিনিষেধের মুখে না পড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য সব ধরনের বিপদ নিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন।
আজকাল তাঁর গভীর উদ্বেগ কেবল প্রযুক্তির অগ্রগতি কিংবা এর নেতিবাচক প্রভাবের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং যারা এই অত্যন্ত শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো সরাসরি তৈরি করছেন, সেই সমস্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের রাজনৈতিক আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও তিনি যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। হিন্টন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জগতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারী মার্ক অ্যান্ড্রেসেন ও পিটার থিয়েল এবং সম্প্রতি নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সএআই-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্ক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে কোনো আস্থাই রাখেন না।
তাঁরা নিজেদের সাধারণ মানুষের ঊর্ধ্বে একধরণের অতিমানব বলে গণ্য করে থাকেন এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে পুরো সমাজব্যবস্থা কেবল তাঁদের নিজস্ব ইচ্ছে ও নিয়ন্ত্রণে চলা উচিত। আর নিজেদের এই সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সফলভাবে হাসিল করার একটি মোক্ষম উপায় হিসেবে তাঁরা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অত্যন্ত কার্যকরি একটি হাতিয়ার বা মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করছেন।
অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব ভালো করেই অনুধাবন করতে পেরেছেন যে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা কোম্পানিগুলোর বিপুল পরিমাণ বাজারমূল্য কীভাবে দেশটির শেয়ারবাজারকে সবসময় চাঙ্গা ও গতিশীল করে রেখেছে। সেই বাস্তবতার আলোকেই তিনি জোরালো দাবি করেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়গুলো সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আসলে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিধিমালার প্রয়োজন নেই, বরং এর জন্য কেবল একজন দক্ষ ও বুদ্ধিমান প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিই যথেষ্ট।
তিনি কোনো ধরনের সরকারি নীতিমালা বা সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে কোম্পানিগুলোর নিজস্ব ইচ্ছের ওপরই তাদের নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় লিখেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে তাঁর নিজের পছন্দ করা নতুন পরিভাষা ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি অন্য কেউ ব্যবহার না করলে তাকে সরাসরি শত্রু হিসেবে গণ্য করা হবে।
এই পুরো প্রেক্ষাপটের তীব্র সমালোচনা করে হিন্টন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ও বয়সের ভারে ন্যূব্জ অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করে আক্রমণ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, অতীতে তেল ও অ্যাসবেস্টস উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোও কি নিজেদের কার্যক্রম নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পছন্দ করত না? আমরা কি সত্যিই এমনটা মনে করি যে তামাক প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর নিজস্ব সিগারেটের প্যাকেটের ওপর সতর্কবার্তাগুলো নিজেদের মতো করে ডিজাইন করার অবাধ অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল?
যাতে তারা সেই প্রয়োজনীয় সতর্কতাগুলো খুব ক্ষুদ্র ছয়-পয়েন্ট ফন্টে এবং কালোর ওপর অত্যন্ত গাঢ় ধূসর রঙের সাহায্যে ছাপাতে পারে? হিন্টন আরও অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন যে, ট্রাম্প যেভাবে ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি যত্রতত্র ব্যবহার করে চলেছেন, তাতেই মূলত এটি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে যায় যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসলে কী বা কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে তিনি প্রায় কিছুই বোঝেন না।
তিনি বিষয়টি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন যে, ট্রাম্প এমন একটি অত্যন্ত কারিগরী বা প্রযুক্তিগত শব্দ ব্যবহার করছেন যার একটি খুব সুনির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে, অথচ তিনি সেটিকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ইচ্ছামতো ব্যবহার করছেন। সুপারইন্টেলিজেন্স কথাটির সোজা অর্থ হলো সাধারণ মানুষের বুদ্ধিমত্তার চেয়েও বহুগুণ বেশি উন্নত কোনো সত্তা, এবং এই বিশেষ পরিভাষাটি গত অন্তত দুই দশক ধরে প্রযুক্তি জগতে প্রচলিত রয়েছে।
এর একটি অত্যন্ত পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন অর্থ রয়েছে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি ঘোষণা দিচ্ছেন যে আমরা এখন থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সুপারইন্টেলিজেন্স বলব। কোনো একটি বস্তুর বা বিষয়ের নাম কেবল মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান দিলেই সেটি রাতারাতি মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়ে যায় না।
যেভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দিকে এগিয়ে চলেছে, তাতে ভবিষ্যতে এক বিরাট আকারের বিপর্যয় নেমে আসার এবং সমগ্র সমাজব্যবস্থা সেই পরিস্থিতি সামলে উঠতে ব্যর্থ হওয়ার ভয় দিন দিন বেড়েই চলেছে। তবে হিন্টনের সুচিন্তিত মতে, এই আশঙ্কার বাইরেও মানুষের সামনে আরও একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক বাধা বা দেয়াল রয়েছে।
আর সেই প্রধান বাধাটি হলো—মানুষের পক্ষে সহজে এই সত্যটি মেনে নেওয়া যে তারা এই পৃথিবীর একমাত্র বুদ্ধিমান জীব বা সত্তা নয়, বরং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বর্তমানে একধরনের ভিনগ্রহের বা এলিয়েন সদৃশ কৃত্রিম সত্তা তৈরি করে চলেছে। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন যে, মানুষ নিজেরা আসলে মানসিকভাবে কী বা তাদের মন কীভাবে কাজ করে, সেটাই তারা আজ পর্যন্ত পুরোপুরি বা ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারেনি।
আর ঠিক সেই মৌলিক কারণেই তারা বুঝতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে যে এই জটিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো আমাদের বর্তমান অস্তিত্বের কতটা কাছাকাছি চলে এসেছে। সমাজের বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ আজও জানে না যে চেতনা বা চেতনাজাত অভিজ্ঞতা আসলে ঠিক কী জিনিস, অথচ তারা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এই বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে—তারা নিজেরা বিষয়টি পরিষ্কার না বুঝলেও, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিশ্চয়ই কোনো চেতনা বা অনুভূতি নেই।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর