ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নির্যাতন এবং ভুক্তভোগীর হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 26, 2026 ইং
বদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নির্যাতন এবং ভুক্তভোগীর হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠ ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ জটিলতাগুলো অনুধাবন করতে সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যানের ‘টোটাল ইনস্টিটিউশন’ বা সর্বগ্রাসী প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বটি অত্যন্ত উপযোগী। মাদ্রাসা, এতিমখানা কিংবা বোর্ডিং স্কুলের মতো যেকোনো বদ্ধ আবাসিক প্রতিষ্ঠানের অন্তর্নিহিত ঝুঁকিগুলো এই ধারণার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব। যেখানে কঠোর ক্রমোচ্চ কাঠামো বিদ্যমান থাকে এবং বাইরের কার্যকর তদারকি থাকে না, সেখানে যেকোনো ধরনের নির্যাতন খুব সহজেই ধামাচাপা দেওয়া যায়। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গির্জা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ক্রীড়া সংগঠনে একই চিত্র দেখা গেছে। কোনো ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হলে অভিযুক্তকে রক্ষা করা, ভুক্তভোগীর পরিবারকে উল্টো কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এবং কাল্পনিক ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব প্রচার করা একটি পরিচিত কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনোবিজ্ঞানী জেনিফার ফ্রেইড এই পরিচিত আচরণের নামকরণ করেছেন ‘ডারভো’ (DARVO), যার অর্থ হলো অস্বীকার করা, পাল্টা আক্রমণ করা এবং অপরাধী ও ভুক্তভোগীর অবস্থান পরস্পরের সঙ্গে বদলে ফেলা। টঙ্গীতে ঠিক এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটছে কি না, তা কেবল সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। পাশাপাশি, কর্তৃপক্ষের আইনি অধিকার রয়েছে পাল্টা মামলা করার, তবে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব হলো এমন কোনো সন্দেহের অবকাশই তৈরি না করা।

নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে আলোচিত চড়টি নিছক কোনো শারীরিক আঘাত নয়, বরং এটি একটি গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করে। আমাদের সামগ্রিক সামাজিক সংস্কৃতিতে ধর্মীয় শিক্ষকরা সাধারণত প্রশ্নাতীত মর্যাদার আসনোসীন থাকেন। ফলে তাঁদের গায়ে হাত তোলা বা চড় মারা মানে একটি সামাজিক ট্যাবু বা প্রতিষ্ঠিত নিষেধকে স্পষ্টভাবে ভেঙে ফেলা। সম্ভবত এ কারণেই সাধারণ কোনো বড় মারধরের ঘটনা এতখানি আলোড়ন সৃষ্টি করে না, যতটা একটিমাত্র চড় তৈরি করেছে। দক্ষিণ এশীয় সমাজে শারীরিক আঘাতের চেয়ে মর্যাদাহানিকে অনেক বেশি বড় ক্ষত হিসেবে দেখা হয়। এছাড়া আমাদের সমাজে নারীর শরীরকে আজও পরিবারের সামগ্রিক ‘ইজ্জত’ বা সম্মান হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এই কারণে যেকোনো নির্যাতনের অভিযোগ কেবল একটি শিশুর ব্যক্তিগত কষ্ট হিসেবে বিবেচিত হয় না, বরং তা পুরো পরিবারের জন্য একটি চরম অপমান হিসেবে অনুভূত হয়।

এই নানামুখী শোরগোলের মাঝে প্রকৃত ভুক্তভোগী শিশুটির নিজস্ব কণ্ঠস্বর আজ হারিয়ে গেছে। তার মূল অভিযোগ, তার মানসিক ট্রমা এবং ভাইরাল হওয়া ভিডিওর মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত গল্প মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানোর যন্ত্রণা আজকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে সম্পূর্ণ সরে গেছে। সাধারণ পাঠকদের প্রতি বিনম্র অনুরোধ জানানো হচ্ছে যেন ওই ভিডিওটি আর কোনোভাবেই ছড়ানো না হয়। শৈশবের এই ধরনের যৌন নির্যাতন মানুষের মস্তিষ্কের নিজস্ব স্ট্রেস-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ এলোমেলো করে দিতে পারে। এর ফলে পরবর্তী প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে তীব্র উদ্বেগ, বিষণ্নতা, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি এবং বিযুক্তির মতো মারাত্মক ঝুঁকির সম্ভাবনা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। উল্লেখ্য যে, এই ধরনের মারাত্মক বিপদ কেবল মেয়েশিশুদের জন্যই নয়, বরং সবার জন্যই সমান প্রযোজ্য। এর সরাসরি প্রমাণ মেলে চলতি মাসের শুরুতেই কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটে যাওয়া ঘটনায়, যেখানে হিফজ বিভাগের একাধিক ছাত্রকে যৌন নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এক মাদ্রাসাশিক্ষক সাধারণ জনগণের তীব্র রোষানলে পড়েছিলেন।

পরিস্থিতি স্পষ্ট করার স্বার্থে এটি বলা অত্যন্ত জরুরি যে, পুলিশ এই ঘটনায় অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানালেও আদালতে তা এখনো আইনগতভাবে প্রমাণিত হয়নি। বিচারাধীন এই মামলাটির তদন্ত এখনো চলছে এবং অভিযুক্ত শিক্ষক দেশের প্রচলিত আইনের চোখে এখনো পুরোপুরি নির্দোষ হিসেবে গণ্য হবেন। জনমনে রাগ বা ক্ষোভ যতই ন্যায্য হোক না কেন, নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণভাবেই দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা যদি অন্ধভাবে এই তথাকথিত ‘থাপ্পড়ম্যান’ সংস্কৃতিকে উৎসাহিত ও উদ্‌যাপন করতে থাকি, তবে অদূর ভবিষ্যতে সেই একই হাত কোনো নিরপরাধ মানুষের গালেও এসে পড়তে পারে।

মূলত সাম্প্রতিক এই চড় মারার ঘটনাটি কোনো পৃথক বা বিচ্ছিন্ন রোগ নয়, বরং এটি গভীর কোনো সমস্যার একটি উপসর্গ মাত্র। আমাদের দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে বাহ্যিক তদারকির বাইরে থাকা অসংখ্য মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষার জন্য কোনো বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই বললেই চলে। প্রতিষ্ঠানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হলেও একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যায় যে, অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সে সময় আসলে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। ২০১৯ সালে মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের মর্মান্তিক শিকার হওয়া ফেনীর সোনাগাজীর সেই ছাত্রীর মৃত্যুর পরই কেবল ওই নির্দিষ্ট মাদ্রাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল। তবে কি দেশের প্রতিটি ক্যামেরা একটি করে নিষ্পাপ শিশুর অমূল্য জীবনের বিনিময়েই কেবল স্থাপন করা হবে?

সূত্র: আজকের পত্রিকা


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
শিক্ষায় পরিবর্তন এনে বেকারত্ব কমাতে চায় সরকার : শিক্ষামন্ত্র

শিক্ষায় পরিবর্তন এনে বেকারত্ব কমাতে চায় সরকার : শিক্ষামন্ত্র