নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
নড়াইলের লোহাগড়ায় সংঘটিত একটি গুরুতর ঘটনা শুধু নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসালয়ের হিমঘরের নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলছে না, বরং গোটা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোও সামনে নিয়ে এসেছে। গত ৩০ আগস্ট সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, সেখানে এক মৃত গৃহবধূর মরদেহের সঙ্গে অনৈতিক ও ঘৃণ্য আচরণের অপচেষ্টা চালানোর সময় অ্যাম্বুলেন্সচালক সাগর শেখকে হাতেনাতে আটক করা হয়। নিহতের স্বজনদের ভাষ্যমতে, থানায় পাঠানোর উদ্দেশ্যে অ্যাম্বুলেন্সে সংরক্ষিত ওই মরদেহের কাছাকাছি গভীর রাতে এই লঘু অপরাধের চেষ্টা চালকালীন মৃত নারীর মা চালককে স্বচক্ষে দেখতে পান এবং পরবর্তীতে তাকে আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এই ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি নতুন নয়, এর আগে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে ২০২১ সালে এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ২০২৫ সালেও ঠিক একই ধরনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিল।
এহেন ঘৃণ্য অপরাধ দমন ও প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগ এবং এর বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা অত্যন্ত আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের দণ্ডবিধির ২৯৭ ধারার বিধান অনুযায়ী বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে মৃতদেহের অসম্মানজনক আচরণ কিংবা মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানার মতো অপরাধের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ৩৭৭ ধারার আওতায় নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির অপ্রাকৃতিক অপরাধের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নির্ধারিত রয়েছে।
তবে আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃতদেহের সঙ্গে সরাসরি যৌনাচার করার মতো বিষয়গুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট ও আলাদা অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে তার যথাযথ তদন্তপদ্ধতি, প্রমাণ সংগ্রহের উপায় এবং কঠোর শাস্তির বিধান আইনে সংযোজন করা দরকার কি না, তা নিয়ে এখনই বিশদ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মুন্না ভগতের আলোচিত মামলায় ৩৭৭ ধারার অপরাধে দণ্ড প্রদান এবং একই সঙ্গে ২৯৭ ধারা থেকে খালাস পাওয়ার মতো ঘটনাগুলো আমাদের প্রচলিত আইনের ভাষাশৈলী এবং সংঘটিত অপরাধের প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে নতুন করে ভাবার তাগিদ তৈরি করে। বিদ্যমান আইনে কোনো অপরাধের জন্য দায় প্রমাণের সুনির্দিষ্ট সুযোগ থাকলে তা যেমন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, তেমনি আইনের কোনো ধরনের অস্পষ্টতা বা ফাঁকফোকড় থাকলে তা অবিলম্বে দূর করা দরকার।
বিশেষ করে মৃতদেহের অবমাননা, মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচার, এই জাতীয় অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলার বিষয়গুলো ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় আইনের সুনির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় আসবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট রূপরেখা থাকা জরুরি।
এ ছাড়া নারী মৃতদেহের ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়ায় অবশ্যই নারী কর্মী বা ডোম নিয়োগ করার বিষয়টিও বর্তমানে জোরেশোরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই নারী মরদেহের ময়না তদন্তের কাজে নারী ডোম নিয়োগের বাধ্যতামূলক নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছিল।
মৃত নারীর মরদেহের সঠিক মর্যাদা রক্ষা এবং শোকার্ত পরিবারের মানসিক শান্তির খাতিরে ময়না তদন্ত কার্যক্রমে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে কেবল কিছু নারী কর্মী বা ডোম নিয়োগ করলেই যে মর্গে নারী মরদেহের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়।
এই ধরনের সংবেদনশীল স্থানে নিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে হলে যথাযথ কারিগরি প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত অবকাঠামো নির্মাণ, হিমঘরে লোকজনের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি এবং সব পর্যায়ে কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোর একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর