নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ইউরোপের মাটিতে বহু শতাব্দী আগে মামিং ও গাইজিং নামের একটি বিশেষ প্রথার প্রচলন ঘটেছিল, যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এই ঐতিহ্যবাহী প্রথার নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ মানুষ খড় দিয়ে তৈরি নানা ধরনের কস্টিউম বা পোশাক গায়ে জড়িয়ে প্রতিবেশীদের বসতবাড়িতে হাজির হতো। সেখানে তারা গান গাওয়া ও নাটক পরিবেশনের মতো নানা বিনোদনমূলক কাজ সম্পন্ন করত। এর বদলে তারা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে খাবার কিংবা নানা ধরনের উপহার সংগ্রহ করত। পরবর্তী সময়ে স্কটিশ এবং আইরিশ অভিবাসী মানুষেরা এই পুরোনো ঐতিহ্যটিকে উত্তর আমেরিকার ভূখণ্ডে নিয়ে যান। সেখান থেকেই কালক্রমে এবং সময়ের দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের এই আধুনিক ট্রিক-অর-ট্রিট প্রথার জন্ম হয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক সময়ে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে হ্যালোউইনের অন্ধকার রাতে নানান ধরনের দুষ্টুমি এবং ছোটখাটো ভাঙচুরের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সফলভাবে রোধ করতে এবং শিশুদের অত্যন্ত নিরাপদ একটি উপায়ে আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ করে দিতে ১৯৩০ সালের শেষভাগে কমিউনিটি ও স্কুলগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ট্রিক-অর-ট্রিট’ প্রথা চালু করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে চিনির রেশনিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে শেষ হওয়ার পরপরই এই প্রথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো দেশগুলোতে অত্যন্ত ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করতে সক্ষম হয়।
জনপ্রিয় এই ট্রিক-অর-ট্রিট নামের ধারণাটি অত্যন্ত চমৎকার ও মজার। পাড়ার বাড়ি বাড়ি ঘুরে শিশুরা যখন এই কথা উচ্চারণ করে দরজায় কড়া নাড়ে, তখন এর ভেতরের অন্তর্নিহিত অর্থটি দাঁড়ায় এমন যে, হয় তাদের কোনো মিষ্টি কিংবা উপহার দেওয়া হোক, নতুবা তারা কোনো না কোনো দুষ্টুমি করবে। অবশ্য বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটে এর মধ্যে কোনো ধরনের কৌতুক বা বিপদের লেশমাত্র থাকে না। এটি এখন সম্পূর্ণরূপে শিশুদের কেবল মিষ্টি বা চকলেট সংগ্রহের একটি দারুণ আনন্দের খেলায় রূপান্তরিত হয়েছে। রাজকন্যা, পাইরেট কিংবা ভ্যাম্পায়ারের মতো বিভিন্ন চরিত্রে সেজে দরজায় কড়া নেড়ে উপহার চাওয়ার এই রোমাঞ্চকর অনুভূতি সামগ্রिक উৎসবের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
উনিশ ও বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত হ্যালোউইনের পোশাকের বাহ্যিক রূপ মোটামুটি একই রকম থাকলেও এর আসল রমরমা স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নিউইয়র্কের প্রখ্যাত উদ্যোক্তা বেন ও নাট কুপার দুই ভাই এক বিরাট বিপ্লব সাধন করেছিলেন। বেন কুপার ডট ইন নামের তাদের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটি অত্যন্ত কম খরচে নানা ধরনের জনপ্রিয় পপ-সংস্কৃতির চরিত্রভিত্তিক কস্টিউম বা পোশাক তৈরি করা শুরু করে। কমিক বুক কিংবা টেলিভিশনের পর্দার জনপ্রিয় চরিত্রগুলোকে ছোট শিশুদের হাতের নাগালে সহজলভ্য করে তোলার মাধ্যমে তাঁরা হ্যালোউইনের এই কস্টিউমগুলোকে উৎসবের একটি অতি অপরিহার্য অংশে পরিণত করেন।
বর্তমান কালের হ্যালোউইনে হরেক রকমের কস্টিউম পরিধান করার মূল উদ্দেশ্য হলো নির্মল আনন্দ উপভোগ করা এবং নিজের ভেতরের সৃজনশীলতার যথাযথ প্রকাশ ঘটানো। ভূত, জাদুকর, উইচ, স্কেলিটন বা কুমড়োর পাশাপাশি বর্তমান যুগের শিশু ও বয়স্ক মানুষেরা তাদের নিজ নিজ পছন্দের সিনেমা, বই কিংবা ভিডিও গেমের চরিত্র হিসেবে নিজেদের সাজাতে ভীষণ পছন্দ করেন। পাশাপাশি এর মাধ্যমে পাড়ার বা স্থানীয় কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সব মানুষ একসঙ্গে মিলিত হওয়ার সোনালী সুযোগ পান। এই পুরো আয়োজনটি মানুষের পারস্পরিক মেলবন্ধন ও মনের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, হ্যালোউইনের এই জাদুকরি পোশাক পরিধান করার বিষয়টি কেবল কোনো সাধারণ আধুনিক বিনোদন মাত্র নয়। এটি মূলত প্রাচীন সেল্টিকদের বেঁচে থাকার দীর্ঘ লড়াই, ইউরোপীয় লোকসংস্কৃতির ধারা এবং আধুনিক পপ-কালচারের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। আর এই নান্দনিক সংস্কৃতিটিই যুগ যুগ ধরে সেখানকার সাধারণ মানুষকে এক সুতায় শক্ত করে বেঁধে রেখে চলেছে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর