নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মাঠের পারফরম্যান্সের সুবাদে বিশ্বজুড়ে ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির বাঁ পায়ের জাদুকরি দক্ষতা, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর গোল করার পরের পরিচিত উদ্যাপন কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পের চোখের পলকে ছুটে চলা দারুণভাবে মাতিয়ে রাখে কোটি কোটি মানুষকে। বৈশ্বিক জনপ্রিয়তার নিরিখে এই তিন তারকা ফুটবলারের সমকক্ষ হওয়া বেশ দুরূহ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে খেলাধুলার ময়দানের জনপ্রিয়তা আর অর্থনৈতিক বাজারমূল্য বা বাণিজ্যিক আকর্ষণ যে সবসময় একই বিন্দুতে মেলে না, তার প্রমাণ মিলছে ক্রীড়াবিষয়ক পরিচিত মাধ্যম স্পোর্টসপ্রোর ২০২৬ সালের বিশ্বের সবচেয়ে বিপণনযোগ্য ৫০ জন ক্রীড়াবিদের প্রকাশিত তালিকায়। যেখানে ফুটবল কিংবদন্তি মেসি, রোনালদো ও এমবাপ্পের মতো বিশাল তারকাদের পেছনে ফেলে চমক দেখিয়েছেন ভারতের উদীয়মান ক্রিকেটার শুবমান গিল।
বর্তমানে ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেট দলের টেস্ট ও ওয়ানডে সংস্করণের অধিনায়ক গিল এই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় দখল করেছেন ১৩তম অবস্থান। তাঁর ঠিক পরের স্থানটিতে অর্থাৎ ১৪ নম্বরেই রয়েছেন পর্তুগিজ ফুটবল মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নাম। ফরাসি ফরোয়ার্ড এমবাপ্পের অবস্থান নির্ধারিত হয়েছে ১৯ নম্বরে, আর আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরা অধিনায়ক মেসি আরও খানিকটা পিছিয়ে জায়গা পেয়েছেন ২৭তম স্থানে।
এদিকে এই তালিকার একদম শীর্ষস্থানটি অবশ্য ক্রিকেট কিংবা ফুটবলের কোনো তারকার দখলে যায়নি, বরং বিশ্বের সবচেয়ে বিপণনযোগ্য অ্যাথলেট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন বেলারুশীয় টেনিস তারকা আরিনা সাবালেঙ্কা।
বয়স ২৮ বছর হওয়া এই টেনিস খেলোয়াড় ক্যারিয়ারে ইতিমধ্যে চারটি গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা জয় করেছেন এবং ২০২৫ সালটি অতিবাহিত করেছেন নারী টেনিস র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর আসনে টানা দ্বিতীয়বারের মতো অটল থেকে। ওই নির্দিষ্ট বছরে টুর্নামেন্টের প্রাইজমানি তথা কোর্টের আয় এবং বিভিন্ন স্পনসরশিপ মিলিয়ে তাঁর আনুমানিক অর্জিত অর্থের পরিমাণ ছিল তিন কোটি মার্কিন ডলার।
বিশ্বের অন্যতম নামী ব্র্যান্ড যেমন নাইকি, উইলসন, গুচি, এমিরেটস, অডেমার পিগে, হুপ ও স্টেলা আর্তোয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি রয়েছে সাবালেঙ্কার ঝুলিতে। উল্লেখ্য, ২০১০ সাল থেকে চালু হওয়া স্পোর্টসপ্রোর এই বিশেষ তালিকায় চতুর্থ নারী এবং তৃতীয় টেনিস র্যাকেটের মালিক হিসেবে শীর্ষস্থান অর্জনের গৌরব অর্জন করলেন তিনি।
অন্যদিকে বর্তমান তালিকার দ্বিতীয় সেরা হয়েছেন শীতকালীন অলিম্পিকের ফ্রিস্টাইল স্কিইং ডিসিপ্লিনে সোনা জয় করা চীনের ক্রীড়াবিদ আইলিন গু। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন বাস্কেটবল অঙ্গনের পরিচিত মুখ গ্রিসের ইয়ানিস আন্তেতোকুনম্পো এবং চতুর্থ স্থানে জায়গা করে নিয়েছেন ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড। এছাড়া পঞ্চম অবস্থানে রয়েছেন স্পেনের উদীয়মান টেনিস সেনসেশন কার্লোস আলকারাজ।
দেশীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এবারের এই র্যাঙ্কিংয়ে অপেক্ষা করছিল আরও একটি বড় ধরনের চমক, যার কারণ সেরা পঞ্চাশের তালিকায় স্থান হয়নি ভারতের ব্যাটিং সেনসেশন বিরাট কোহলির। দেশটির সাবেক এই অধিনায়কের বর্তমান অবস্থান ৮৫তম। পাশাপাশি অভিজ্ঞ মহেন্দ্র সিং ধোনি ৮৩তম এবং রোহিত শর্মা রয়েছেন ৯০ নম্বর অবস্থানে। সব মিলিয়ে এবারের তালিকার সেরা পঞ্চাশের ভেতর ভারতের মোট পাঁচজন ক্রীড়াবিদ নিজেদের নাম লেখাতে সমর্থ হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ক্রিকেট তারকাদের মাঝে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন শুবমান গিল।
জনসাধারণের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ঠিক কী প্রক্রিয়ায় বা কী নিয়মে প্রস্তুত করা হয়েছে এই তালিকা। ক্রীড়া মাধ্যম স্পোর্টসপ্রোর পাশাপাশি নর্থস্টার সলিউশনস গ্রুপ যৌথ উদ্যোগে সম্পন্ন করেছে তাদের ১৭তম বার্ষিক এই তালিকা প্রকাশের কাজ। অ্যাথলেটদের প্রকৃত বিপণনযোগ্যতা নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করার লক্ষ্যে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে ১০০ নম্বরের একটি সুনির্দিষ্ট বিশেষ স্কোরিং পদ্ধতি।
এই মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড ইকুইটির জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে মোট ৪৫ নম্বর, যেখানে মূলত যাচাই করা হয়েছে একজন ক্রীড়াবিদের ব্র্যান্ড হিসেবে নিজস্ব শক্তি ও গভীর আকর্ষণ কতটা প্রবল। পাশাপাশি মোমেন্টামের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪০ নম্বর, যার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট অ্যাথলেটের বাণিজ্যিক জনপ্রিয়তা ঠিক কত দ্রুত গতিতে উর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
বাকি ১৫ নম্বর বরাদ্দ ছিল কমার্শিয়াল ট্র্যাজেক্টরির জন্য, যেটির মাধ্যমে মূলত বিচার করা হয়েছে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে আরও বেশি বড় ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কতখানি। এই সম্পূর্ণ মূল্যায়নের কাজটিতে নিখুঁতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে মোট ২৭টি ভিন্ন ভিন্ন নির্দিষ্ট সূচক।
প্রতিটি ক্রীড়াবিদের ব্যক্তিগত কয়েক শ ধরনের তথ্যের পাশাপাশি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে বিশ্বের তিন হাজারের বেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে তাঁদের সম্পাদিত বাণিজ্যিক চুক্তির নানা খুঁটিনাটি তথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা অনুসারী ও ভক্ত-দর্শকদের মোট সংখ্যা, ইন্টারনেটে নির্দিষ্ট ওই খেলোয়াড়কে খোঁজার সাধারণ প্রবণতা, গণমাধ্যমে তাঁর সম্পর্কে চলা ইতিবাচক বা নেতিবাচক আলোচনা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক অংশীদারত্বও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
মূলত ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের সংগৃহীত তথ্যাদি আমলে নিয়ে মোট ৭০টি ভিন্ন খেলার ১ হাজার ২০২ জন ক্রীড়াবিদকে প্রারম্ভিক পর্যায়ে বিবেচনার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁদের মধ্য থেকে বাছাইকৃত ২৪৭ জন ক্রীড়াবিদকে নিয়ে আরও বিশদ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়নের মাধ্যমেই কেবল চূড়ান্ত এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর