নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকার একটি আবাসিক ভবনে অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ এবং সেখান থেকে মোট পঁচাশি জনকে আটক করার অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর একটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে বাড়ির মালিক ও পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জহিরকে অবশেষে সাময়িকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
আজ শনিবার সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
প্রকাশিত ওই প্রজ্ঞাপনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পুলিশের একজন অত্যন্ত দায়িত্বশীল অতিরিক্ত ডিআইজির নিজস্ব বাসভবন থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার এবং সেখান থেকে এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে আটকের ওই পুরো ঘটনাটির কারণে সাধারণ মানুষের মাঝে পুলিশের ভাবমূর্তি নিয়ে অত্যন্ত নেতিবাচক ধারণার জন্ম হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে যে, এই ধরনের অনভিপ্রেত কর্মকাণ্ডের ফলে বাংলাদেশ পুলিশের সামগ্রিক ভাবমূর্তি চরমভাবে ও অপূরণীয়ভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তাঁর এ ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডকে দাপ্তরিক শিষ্টাচারবহির্ভূত, একজন আদর্শ সরকারি কর্মকর্তার পদমর্যাদার সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান অকর্মকর্তাসুলভ এবং বিদ্যমান বিভাগীয় নিয়ম-শৃঙ্খলার পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে।
উক্ত কারণগুলোর পরিপ্রেক্ষিতেই সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার যথাযথ বিধান অনুযায়ী অসদাচরণের শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করে তাঁকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্তের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বর্তমান প্রচলিত সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী এই বরখাস্তকৃত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে খুব শীঘ্রই একটি আনুষ্ঠানিক বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হবে।
বিভাগীয় মামলা দায়ের করার পর নিয়ম অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং পরবর্তীতে শুনানির মুখোমুখি হতে হবে অভিযুক্ত এই কর্মকর্তাকে।
তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো যদি তদন্তে ও শুনানিতে সঠিকভাবে প্রমাণিত হয়, তবে তাঁকে স্থায়ীভাবে চাকরি থেকে পুরোপুরি বরখাস্ত করার আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে পুলিশের এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বাড়িতে গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে পরিচালিত ওই অভিযানের ঠিক আগমুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা ডিবির সদস্যরা কেন ভবনের সিসি ক্যামেরাগুলো খুলে ফেলেছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের যৌক্তিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
গত ১৯ অক্টোবর দিবাগত গভীর রাতে রাজধানীর ভাটারা এলাকার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১ নামের আবাসিক এলাকার ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নামক তিনতলা ভবনটিতে এই অভিযান চালিয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ বা ডিবি।
অভিযান চালানো ভবনটির মূল মালিক হলেন অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জহির, যিনি ভবনটি নিজেই নিজের ব্যবহারের পরিবর্তে অন্য কোনো পক্ষের কাছে ভাড়ায় প্রদান করেছিলেন।
পুলিশ কর্মকর্তার মালিকানাধীন এই আবাসিক ভবনটিতে ডিবি পুলিশের আকস্মিক ওই অভিযানে মোট পঁচাশি জন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল এবং ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছিল।
এই ঘটনার ঠিক পরের দিনই অভিযুক্ত অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে তাঁর পূর্বের কর্মস্থল বা মূল দায়িত্ব থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ঘটনার সময় তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড রিপেয়ার শাখায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন এবং তাঁকে সেই দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করার পর তাঁকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছিল এবং আজ শনিবার ছুটির দিনে তাঁকে চূড়ান্তভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।
অন্যদিকে, ভাটারা এলাকার ওই তিনতলা ভবনটিতে চালানো প্রায় তিন দীর্ঘ ঘণ্টার একটানা অভিযানে মাত্র এক বোতল ভরা মদ, একটি সম্পূর্ণ খালি বোতল এবং দুটি আংশিক খালি মদের বোতল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল বলে জানা গেছে।
পুলিশের একজন কর্মকর্তার মালিকানাধীন বাড়ি থেকে এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে আটকের ঘটনায় এবং পরবর্তীতে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়ার পর দেশজুড়ে ‘মোরাল পুলিশিং’ বা নৈতিক পুলিশগিরি নিয়ে নানা মহলে গভীর উদ্বেগ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর