ঢাকা | বঙ্গাব্দ

কেওড়ার ভরা মৌসুমে সুন্দরবনের বানরদের প্রাণবন্ত জীবন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 1, 2026 ইং
কেওড়ার ভরা মৌসুমে সুন্দরবনের বানরদের প্রাণবন্ত জীবন ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

খাবারের প্রাচুর্যে মুখর হয়ে ওঠা বনের গাছপালায় চলছে বানরদের নানা কসরত। কারও মুখের ভেতর গোঁজা কেওড়া, কেউ আবার মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে আছে অধরা ফল। একটি শাখা থেকে অন্য শাখায় লাফালাফি এবং মওজুদ করা খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করাই তাদের প্রধান কাজ। দীপ্তিময় লোম আর সতেজ অবয়ব দেখে মনে হয় পুরো প্রান্তর মেতে উঠেছে আনন্দ উৎসবে। এই সমারোহের মূল কারণ প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো কেওড়া ফলের প্রাচুর্য।

মৌসুমের একেবারে শেষ প্রান্তে এসেও উপকূলীয় এই গহিন অরণ্যে কিছু গাছে ঝুলে আছে অবশিষ্ট ফল। সেই ফলের সন্ধানেই বৃক্ষ থেকে বৃক্ষান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে বানরের ঝাঁক। একটি করে ফল মুখে গুঁজে দ্রুত সরে পড়ছে অন্য শাখায়। খাদ্যের এমন সুপ্রচুর সরবরাহের কারণে তাদের অবয়ব এখন বেশ হৃষ্টপুষ্ট ও বলীয়ান।

গত বৃহস্পতিবার প্রাক্কালে কয়রা নদীর অববাহিকায় এমন প্রাণবন্ত চিত্র চোখে পড়ে। তবে মানবসস্তানের উপস্থিতি টের পাওয়ামাত্রই গাছের শাখা প্রশাখা টপকে গভীর অরণ্যে মিলিয়ে যায় পশুর দল। মাটিতে কেবল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে কেওড়ার অবশিষ্টাংশ, যা কিছুক্ষণ আগের আনন্দময় ভোজের সাক্ষ্য বহন করে।

সে সময় কয়রা প্রবাহে মৎস্য শিকারে ব্যস্ত ছিলেন আসাদুল সরদার নামের এক মৎস্যজীবী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কেওড়ার সময়কাল এখন শেষের দিকে। মূলত শ্রাবণ থেকে আশ্বিন পর্যন্ত বনের ভেতরে এই ফল বেশি মেলে। স্থানীয় মানুষেরা এই ফল দিয়ে ডাল রান্না করে খান। আবার সেদ্ধ করে বড়শির সাথে যুক্ত করেও মাছ শিকার করা হয়। বানরের প্রসঙ্গে এই জেলের মন্তব্য, এই ঋতুতে ওরা কেওড়া খেয়ে স্বাস্থ্যবান হয়ে ওঠে।

একই রকম তথ্য দেন অপর মৎস্যজীবী ইকরামুল গাজী। তাঁর ভাষ্য মতে, কার্তিক মাস চললেও এ সময় পর্যন্ত কেওড়া খেয়ে বানরের দল বেশ সতেজ থাকে। তবে ফল নিঃশেষ হয়ে গেলে ওরা গাছের কচি ডালপালা, লতাগুল্ম এমনকি তটপ্রান্তের কাঁকড়াও আহার করে। তখন তাদের দেহের বাড়তি চর্বি কমে অনেকটা ক্ষীণকায় হয়ে যায়।

এই বন্য অঞ্চলে বানর ও হরিণের পারস্পরিক মিতালি বেশ অদ্ভুত ধরনের। মৎস্যজীবীদের ভাষ্যমতে, বানর বৃক্ষের ওপর থেকে খাদ্য ও পাতা নিচপ্রান্তে ফেলে দেয়। নিচেই অবস্থানরত হরিণ সেগুলো সংগ্রহ করে খায়। বিপদসংকুল মুহূর্তেও তারা একে অপরের উপকারে আসে। বাঘের উপস্থিতি টের পেলে উচ্চ শাখায় বসে চিৎকার করে জানান দেয় বানর। সেই সতর্কবার্তা শুনে নিরাপদ দূরত্বে সরে যায় হরিণকুল।

গত রোববার দুপুরে খোলপেটুয়া নদীর তীরবর্তী কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রেও দেখা মেলে বানরদের এমন উদ্দাম আচরণ। বৃক্ষের ডালে ডালে দলবদ্ধভাবে দৌড়ঝাঁপ, পরস্পরকে ধাওয়া করা এবং চেঁচামেচি করতে থাকে তারা। বিমোহিত নয়নে সেই দৃশ্য অবলোকন করছিলেন ভ্রমণপিপাসুরা।

তবে এই প্রাণীগুলোর আচরণে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতিপূর্বে পর্যটক দেখামাত্রই খাদ্যের আশায় ছুটে আসত তারা, দৃষ্টি থাকত মানুষের হাত ও ব্যাগের দিকে। বর্তমানে কেওড়া খেয়েই তাদের ক্ষুধা নিবারণ হওয়ায় সেই আগ্রহে ভাটা পড়েছে।

ভ্রমণবাহী নৌযানের চালক আনিসুর রহমান জানান, অতীতে কিছু বানর খাবার না পেলে ক্ষিপ্ত হয়ে আক্রমণ চালাত, ব্যাগ বা খাদ্য ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু বর্তমানে কেওড়া খেয়ে দেহ সতেজ হওয়ার কারণে আহারের প্রতি তাদের আকর্ষণ কমেছে। যতবারই এই মৌসুমে এসেছেন, ততবারই ওদের এমন প্রাণবন্ত দেখেছেন।

প্রকৃতির খাদ্যচকল ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কেওড়ার গুরুত্ব তুলে ধরে কলাগাছিয়া কেন্দ্রের বনকর্মী মো. মহিউদ্দিন জানান, বন্য এই প্রাণীদের অন্যতম প্রধান খাদ্য হলো কেওড়া। হরিণ এবং হরেক প্রজাতির বিহঙ্গসহ অরণ্যের নানা জীবজন্তুও এই ফল থেকে খাদ্যের জোগান পায়।

বাংলাদেশ সীমানার ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে সুন্দরবনের সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে খাকি রঙের রেসাস ম্যাকাক বানর। কালাবগী, করমজল, জামতলা, কটকা, কচিখালী, কলাগাছিয়া এবং হাড়বাড়িয়ার মতো অবকাশ কেন্দ্রগুলোতে গেলেই এদের দলবেঁধে বিচরণ চোখে পড়ে।

বনকর্মী ও নৌযান চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দর্শনার্থীরা জলযান রেখে অরণ্যে প্রবেশ করলে সুযোগ বুঝে বানরের দল নৌকায় চড়ে বসে। হাতের কাছে আহার্য বা অন্য কিছু পেলে তা নিয়ে দ্রুত সরে পড়ে। হরিণ মানুষ দেখলেই পালিয়ে যায়, কিন্তু বানর তার বিপরীত আচরণ করে। খাদ্যের প্রত্যাশায় প্রায়ই খুব কাছাকাছি চলে আসে। তবে অতিরিক্ত উত্ত্যক্ত করলে কিংবা দুষ্টুমি করলে ক্ষিপ্ত হয়ে অনেক সময় আঘাতও করে তারা।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন-এর ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বনাঞ্চলে বানরের সংখ্যা ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৪৪। ২০০৪ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৫১ হাজার। গত দুই দশকে বানরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই কর্মকর্তার মতে, কেওড়ার ঋতুতে বানরকে সবচেয়ে বেশি সুস্থ ও প্রাণোচ্ছ্বল দেখায়। দর্শনার্থীদের দৃষ্টিতেও ধরা পড়ে সেই সবল অবয়ব ও বর্ধিত চঞ্চলতা। তাই অনেকেই মন্তব্য করেন, বানরের অবয়ব দেখলেই অনুধাবন করা যায় যে বন্যপ্রান্তরে কেওড়ার মৌসুম চলছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
১৫ লাখ টাকা দিয়ে শ্বশুরকে হত্যা করালেন জামাই

১৫ লাখ টাকা দিয়ে শ্বশুরকে হত্যা করালেন জামাই