নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ইন্টারনেট দুনিয়ায় সম্প্রতি এমন একটি কন আইসক্রিমের ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যা ফুটন্ত গরম পানির প্রবাহের নিচে কিংবা বারবিকিউ চুলার আগুনের ওপর রেখে দেওয়ার পরও গলে যায় না এবং এতে কোনো ধোঁয়াও উৎপন্ন হয় না। এমন অদ্ভুত দৃশ্য দেখার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিত প্রতিটি মানুষ চরম বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং সবার মনে মাত্র একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয় যে, ঠিক কোন বিশেষ উপকরণের উপস্থিতির কারণে এই মিষ্টি খাদ্যটি এত তীব্র তাপমাত্রা অনায়াসে সহ্য করতে সক্ষম হচ্ছে?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে যে, এগুলো কি তবে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করার উদ্দেশ্যে তৈরি কোনো নকল খাবার? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘ফ্লেচ’ নামক নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকে সর্বপ্রথম এই ব্যতিক্রমী ভিডিও ক্লিপটি ইন্টারনেট জগতে আপলোড করা হয়েছিল। সেই ভিডিও ফুটেজে পরিষ্কার দেখা যায় যে, একজন ব্যক্তি ঘরের কল থেকে বেরিয়ে আসা বাষ্পরিন ফুটন্ত গরম পানির ধারার ঠিক নিচে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে একটি কোন আইসক্রিম শক্ত করে ধরে রেখেছেন।
গরম পানির সরাসরি তীব্র তাপ লাগার পরেও মিষ্টি এই খাদ্যটি গলে যাওয়ার পরিবর্তে সম্পূর্ণ কঠিন ও অনমনীয় অবস্থায় টিকে থাকে। পানির কল সংলগ্ন এলাকায় লক্ষ করা যায় যে, আরও বেশ কয়েকজন কৌতূহলী ব্যক্তি খুব কাছ থেকে দাঁড়িয়ে এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটি মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রায় অপরিবর্তিত থাকা এমন দৃশ্য দেখে তারা সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেছেন।
সেখানে উপস্থিত থাকা একজন দর্শক এই পরিস্থিতি দেখে শঙ্কা প্রকাশ করে মন্তব্য করেন যে, আমরা আসলে আমাদের কোমলমতি সন্তানদের হাতে ঠিক কোন ধরনের অদ্ভুত খাবার তুলে দিচ্ছি? এর ভেতরের অংশে আসল উপাদান হিসেবে ঠিক কী কী জিনিস মেশানো রয়েছে? পুরো ঘটনাটি বিবেচনা করলে ব্যাপারটি বেশ ভয়ের বলেই মনে হয়।
ভিডিওতে দৃশ্যমান সেই ব্যক্তি তখন হাস্যরস ও কৌতুক করে একটি প্রশ্ন রাখেন যে, এই বস্তুটির উৎস কি তবে আমাদের পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোনো মহাকাশ থেকে এসেছে? তবে সামগ্রিক ভিডিওর ব্যাপ্তি ও সময় নিখুঁতভাবে হিসাব করে পরবর্তীতে দেখা গেছে যে, এই আইসক্রিমটি সম্পূর্ণভাবে গলে শেষ হতে মূলত প্রায় পুরো এক মিনিট বা ষাট সেকেন্ড সময় নিয়েছিল।
ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিওটি ইতিমধ্যেই প্রায় বারো লাখের বেশি বিভিন্ন বয়সী মানুষ দেখেছেন এবং এটি অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীকে মারাত্মকভাবে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। মূল ভিডিওটি যিনি প্রথম আপলোড করেছিলেন, তিনি জোরালোভাবে দাবি করেন যে, এটি আদতে কোনো সাধারণ বা প্রচলিত আইসক্রিম নয় বরং এর পেছনে অন্য কিছু রয়েছে।
এই ভাইরাল ভিডিওটির কমেন্ট বক্সের ভেতরে এটি ঠিক কী উপাদান দিয়ে তৈরি কিংবা এটি আসলে কোন বস্তু, তা নিয়ে সাধারণ নেটিজেনরা বিভিন্ন ধরনের নিজস্ব মতামত জানাতে শুরু করেন। জনপ্রিয় বিজ্ঞানভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘আইসক্রিম সায়েন্স’-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায় যে, এ ধরনের হিমায়িত ডেজার্টগুলোকে দীর্ঘ সময় শক্ত ও অনমনীয় রাখতে এবং দ্রুত গলে যাওয়ার প্রবণতা রোধ করতে ইমালসিফায়ার ও স্ট্যাবিলাইজারের মতো বেশ কিছু রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সামনে আসার পর সোশ্যাল মিডিয়ার একজন সক্রিয় ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন যে, এই বস্তুটিকে এখন আর দুধ দিয়ে তৈরি কোনো প্রাকৃতিক খাবার হিসেবে গণ্য করা চলে না, এটি মূলত কেবল কিছু কৃত্রিম ইমালসিফায়ারের একত্রিত মিশ্রণমাত্র। অন্য আরেকজন ব্যবহারকারী তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে মন্তব্য করেন যে, এটি কোনো খাঁটি আইসক্রিম নয় এবং এর ভেতরে আসল দুধ বা ক্রিমের অস্তিত্ব না রেখে তার বদলে বিপুল পরিমাণে অস্বাস্থ্যকর তেল ব্যবহার করা হয়েছে।
এমন ভিডিও ক্লিপটি অবলোকন করার পর আরও অজস্র মানুষ প্রায় একই রকম নেতিবাচক ও সমালোচনামূলক মন্তব্য করতে থাকেন এবং খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স প্ল্যাটফর্মে শেয়ার হতে শুরু করে। ফুটন্ত পানির নিচে একটানা দীর্ঘ এক মিনিট ধরে আইসক্রিম গলে যাওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থেকে বিরত থাকার এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে এক্স মাধ্যমের সমস্ত দর্শক দারুণভাবে বিস্মিত হন।
‘ওয়ালস্ট্রিটএইপস’ নামক একটি ভেরিফায়েড অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ভাইরাল হওয়া এই ভিডিওটি পুনরায় শেয়ার করা হয়, যা পরবর্তীতে প্রায় উনিশ লাখ মানুষ অবলোকন করেন। ওই বিশেষ অ্যাকাউন্ট থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রচলিত এই আধুনিক আইসক্রিমগুলোর সহজে না গলার মূল কারণ হলো এগুলো মূলত কোনো আইসক্রিমই নয়।
ভিডিওর বর্ণনায় বা ক্যাপশনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, এ ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলোকে অনেক সময় আসল আইসক্রিমের পরিবর্তে ‘হিমায়িত ডেইরি ডেজার্ট’ বা দুধের উপাদান দিয়ে তৈরি জমাট বাঁধা কৃত্রিম খাদ্য হিসেবে অভিহিত করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে যে, আগামী দিনগুলোতে এই ধরনের বিশেষ নামের ব্যবহার আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।
তাদের এই জোরালো দাবি শতভাগ প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে জনৈক ব্যবহারকারী বেশ কিছু উপকরণের একটি সুদীর্ঘ তালিকা প্রকাশ করেন, যা মূলত এই ধরনের আইসক্রিমকে দীর্ঘক্ষণ শক্ত ও অবিকৃত অবস্থায় বজায় রাখতে সাহায্য করে। এক্স মাধ্যমের সেই নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই আইসক্রিমগুলোর ভেতরে অতিরিক্ত মাত্রায় স্ট্যাবিলাইজার, উদ্ভিজ্জ তেল, ক্ষতিকর চর্বি, বাতাস এবং মাল্টোডেক্সট্রিনের মতো কিছু উপাদান মেশানোর জন্যই এগুলো তাপ পেয়েও সহজে গলে যায় না।
সামাজিক মাধ্যমের বহু মানুষ এই বক্তব্যের সঙ্গে পূর্ণ একমত পোষণ করেছেন এবং তাদের মধ্য থেকে একজন মন্তব্য করেছেন যে, হে ভাই, এটি এখন আর আমাদের চেনা সেই আসল আইসক্রিম নেই, এটি মিষ্টির সুন্দর রূপ ধারণ করা একটি ভয়ংকর রাসায়নিক পদার্থ ছাড়া আর কিছু নয়। এই ধরনের অস্বাস্থ্যকর খাবার কিনে না খেয়ে বরং নিজ বাড়িতে নিজেদের হাতে খাঁটি উপাদানে আইসক্রিম তৈরি করার চমৎকার পরামর্শ দিয়েছেন অন্য অনেক সচেতন মানুষ।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর