নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
দীর্ঘ চব্বিশ বছর ধরে খোঁজাখুঁজি করার পরেও যার নাগাল পাওয়া যায়নি, বাংলাদেশে সেই অত্যন্ত দুর্লভ প্রজাতির পাখিটি অবশেষে ক্যামেরাবন্দি হয়েছে। দেশের ভেতরে এই নির্দিষ্ট পাখিটিকে সচক্ষে দেখার রেকর্ড রয়েছে মোটে দশবারেরও কম। অতীতে কক্সবাজারের ডুলাহাজারা, ইনানী, কাপ্তাই, হাজারিখিল, লাউয়াছড়া, করমজল এবং কুয়াকাটার বিভিন্ন এলাকায় এই পাখির উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছিল। বিগত কয়েক বছরের সমস্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, নির্দিষ্ট এই মৌসুমে কুয়াকাটা অঞ্চলে পাখিটির দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আর এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই ‘বার্ডিংবিডি ট্যুরস’ আয়োজন করে ‘কুয়াকাটা পন্থ-পরিযায়ী পাখি খোঁজা অভিযান’।
আট সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ১৫ অক্টোবর রাতে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। তবে নির্ধারিত বাস ছাড়ার সময় কিছুটা বিলম্বিত হওয়ায় পাখি পর্যবেক্ষণের সবচেয়ে উপযোগী ও মোক্ষম সকালের সোনালী সময়টুকু হাতছাড়া হয়ে যায়। পরবর্তীতে বাস থেকে নেমে একটি হোটেলে সাময়িক বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় প্রাতরাশ সেরে সরাসরি লেম্বুর বনে পৌঁছাতে সকাল সাড়ে দশটা বেজে যায়। দুপুরের আহারের পূর্বে ও পরে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা ধরে নির্ধারিত সম্ভাবনাময় জায়গাগুলোতে তন্নতন্ন করে দুর্লভ পাখিটির সন্ধান চালানো হয়। কিন্তু সব চেষ্টা সত্ত্বেও কপাল মন্দ থাকায় প্রথম দিনে কোনো সাফল্যই মেলেনি, ফলে হতাশ মনেই সকলকে হোটেলে ফিরে আসতে হয়।
পরদিন সকালে একটি অটোভ্যানে চড়ে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরের লেম্বুর বনের পরিচিত দোলনা পয়েন্টে গিয়ে পৌঁছায় দলটি। সেখানে জিরিয়া ও বালুচরাসসহ বেশ কিছু সৈকত পাখির ছবি ক্যামেরাবন্দি করার পর সরাসরি বাদাবনের ঘন অরণ্যের ভেতর প্রবেশ করা হয়। একটানা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বনের আনাচে-কানাচে পাখিটির খোঁজ করা হলেও ফলাফল শূন্যই থেকে যায়। পরিশেষে দলটির সদস্যরা বাদাবনঘেঁষা ঝাউবনের ভেতরে প্রবেশ করেন। এই বনের গাছপালাগুলো বেশ সরু এবং অনেক উঁচুতে বিস্তৃত, যা দেখতে অনেকটা বিদেশি বনের পরিবেশের মতো মনে হয়। বনের ভেতরে পা রাখামাত্রই ঝাঁকে ঝাঁকে অসংখ্য পাখির মধুর কলকাকলিতে মুখরিত এক পরিবেশের সৃষ্টি দেখা যায়।
সেখানে হাঁড়িচাঁচা, বনমালি, হলদে বউ, কাঠঠোকরা ছাড়াও দুই থেকে তিন প্রজাতির মাছরাঙার মতো নানা রঙের পাখির যেন এক বিশাল মেলা বসেছিল। বনের গাছের ডালের পাশ দিয়ে হেঁটে চলা একটি বনমালির ছবি তোলার প্রস্তুতি নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে হঠাৎ একটি ফিঙে এসে সেটিকে তাড়া করায় চমৎকার সেই ফ্রেমটি মিস হয়ে যায়। এরপর চারপাশের বনে হঠাৎ করেই ফিঙে পাখির আনাগোনা বহুগুণ বেড়ে যেতে দেখা যায়, যার অধিকাংশেরই বয়স বেশ কম। ফিঙেদের এই দলের সঙ্গেই অবস্থান করছিল ছোট আকৃতির কিছু ভুজঙ্গ পাখি। প্রতিটি পাখির আলাদা এবং স্পষ্ট ছবি তোলার জন্য সবাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কারণ এই অতি বিরল পাখিটি স্বভাবগতভাবেই ফিঙেদের সঙ্গেই বসবাস করে।
ঝাউবনে বিভিন্ন ফিঙের ছবি তোলার ব্যস্ততার মাঝেই হঠাৎ বড় একটি লতার ওপর বুক ও পেটে সাদা ফোঁটাসমূহ বিশিষ্ট একটি ফিঙেকে এসে বসতে দেখেন পর্যবেক্ষকরা। পাখিটির ঠোঁটজোড়া বেশ খাটো ও শক্তপোক্ত আকৃতির এবং এর মাথা ও লেজের গঠনশৈলীও সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। সেই মুহূর্তে সেখানে কেবল দুই জন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। প্রায় একই সময়ে দুজনে ক্যামেরার শাটারে ক্লিক করেন এবং মাত্র তিনটি ছবি ধারণ করার পরপরই পাখিটি সেখান থেকে উড়ে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে আরও দুটি ফিঙের ছবি ক্যামেরাবন্দি করে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ঝাউবন ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
কুয়াকাটার এই ঝাউবনে অবলোকন করা খাটো ঠোঁটের ফিঙেটির দৈহিক দৈর্ঘ্য সচরাচর ২৭ থেকে ৩২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং এর শরীরের ওজন প্রায় ৪৪ থেকে ৬৮ গ্রামের মতো হয়ে থাকে। পাখিটির গায়ের পালক চকচকে কালো রঙের হলেও এর কাঁধ-ঢাকনির চাকচিক্য কিছুটা কম থাকে। খুব ভালোভাবে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ না করলে সাধারণ ফিঙে থেকে একে আলাদা করা অত্যন্ত দুরূহ একটি ব্যাপার। এই প্রজাতির স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দেখতে সম্পূর্ণ একই রকম হয়ে থাকে। এদের লেজটি তুলনামূলকভাবে বেশ চওড়া এবং এর অগ্রভাগের অংশটি বাইরের দিকে সামান্য ছড়ানো থাকে, যা সাধারণ ফিঙের মতো গভীরভাবে চেরা নয়।
পাখিটির চোখ দেখতে গাঢ় বাদামি রঙের হয়ে থাকে। এর ঠোঁট, পা, পায়ের পাতা, আঙুল ও নখ নিখাদ কালো রঙের হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির শরীরের ওপরের অংশ ফ্যাকাশে ও কালচে বাদামি রঙের হয়ে থাকে, আর গলা ও বুকে সাদা রঙের তিল এবং বগল ছাই ধূসর রঙের দেখা যায়। অন্যদিকে, প্রথম শীতবর্ষীয় বয়সের পাখির বুক ও পেট জুড়ে ধূসরাভ সাদা রঙের ছিটছোপে পরিপূর্ণ থাকে। সচরাচর বড় পাতার মিশ্র চিরসবুজ অরণ্য, পাতাঝরা বন এবং বাদাবনে এদের নিয়মিত বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। গাছের একেবারে নিচের অংশে, ঝোপঝাড় ও লতাগুল্মের আড়ালেই এরা মূলত নিজেদের সময় কাটায়।
প্রকৃতিতে এরা সাধারণত একা কিংবা জোড়ায় জোড়ায় বসবাস করতে পছন্দ করে। আমাদের দেশে এই পাখিটি মূলত ‘তথ্য অপ্রতুল’ বা ডেটা ডেফিসিয়েন্ট প্রজাতির মর্যাদা পেয়ে থাকে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, পন্থ-পরিযায়ী পাখি হিসেবে প্রতিবছর অক্টোবরের দিকে এরা খুব অল্প কিছুদিনের জন্য আমাদের দেশে অতিথি হয়ে আসে। এদের প্রধান খাদ্য তালিকার মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের কীটপতঙ্গ, ছোট ব্যাঙ, সরীসৃপ এবং ছোট আকৃতির অন্যান্য পাখি। মিষ্টি ও সুরেলা কণ্ঠে এরা সাধারণত ‘ফুউইইইট্...ফুউইইইট্...’ সুরে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়। এছাড়া এরা মাঝেমধ্যে ‘কোয়্যারশকোয়্যারশ...সুইফট...’ এর মতো বেশ কর্কশ ও উগ্র কণ্ঠেও ডেকে ওঠে।
প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত সময়টি হলো এই পাখিগুলোর মূল প্রজননকাল। এই নির্দিষ্ট সময়ে এরা হিমালয় পর্বতমালা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি বনের গহিন গভীরে মাটি থেকে প্রায় চার থেকে বারো মিটার উঁচুতে গাছের দোডালায় আশ্রয় নেয়। মাকড়সার জালের সঙ্গে গাছের বাকল ও ঘাস সুনিপুণভাবে জড়িয়ে বাটির মতো দেখতে চ্যাপ্টা আকৃতির একটি বাসা তৈরি করে। বাসাটিতে লালচে বাদামি ও ধূসর রঙের ছিটছোপযুক্ত তিন থেকে চারটি ফিকে গোলাপি রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি মিলেমিশে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বাসাটি নির্মাণ করলেও কেবল স্ত্রী পাখিটি একাই ডিমে তা দিয়ে থাকে।
ডিম থেকে সফলভাবে ছানা ফোটার সুনির্দিষ্ট সময়কাল সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য জানা না থাকলেও অনেকের ধারণা অনুযায়ী তা প্রায় চৌদ্দ থেকে পনেরো দিন হতে পারে। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর ছানাগুলো সাধারণত পনেরো থেকে বাইশ দিনের মধ্যে নিজে নিজে উড়তে শেখার উপযুক্ত হয়ে ওঠে। কুয়াকাটা সৈকতের ঝাউবনে আবিষ্কৃত বুক ও পেটে সাদা ফোঁটাবিশিষ্ট খাটো ঠোঁটের এই ফিঙেটি অন্য কোনো সাধারণ পাখি নয়, এটি এ দেশের অত্যন্ত দুর্লভ এক পন্থ-পরিযায়ী ও ভবঘুরে পাখি, যা ভুজঙ্গ বা কাকঠুঁটো ফিঙে নামে সমাদৃত।
পশ্চিমবঙ্গের অঞ্চলে এই পাখিটিকে কাকচঞ্চু ফিঙে হিসেবে ডাকা হয়ে থাকে এবং এর ইংরেজি নাম হলো ক্রো-বিল্ড ড্রোঙ্গো। এটি মূলত ডাইক্রুরিডি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত একটি পাখি এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম হলো Dicrurus annectens। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই পাখিটির দেখা পাওয়া সম্ভব হয়। বিগত কয়েক দিন ধরে এই প্রজাতির পাখিগুলোকে ঢাকার মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানেও ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে বলে জানান গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখি, বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ আ ন ম আমিনুর রহমান।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর