নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
চার মাস অতিবাহিত হলেও প্রিয়জন হারানোর বুকফাটা আর্তনাদ থামছে না তরুণ জুনায়েদ ইসলাম সিফাতের। গত জুনের শেষ সপ্তাহে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকায় নদীসংলগ্ন একটি ভাড়া বাসায় নৃশংসভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন তাঁর মা এবং তিন বোন। এই ভয়াল ঘটনার পর থেকেই পুরো পরিবারে একমাত্র জীবিত সদস্য হিসেবে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন মাত্র আঠারো বছর বয়সী জুনায়েদ। ঘটনার পরপরই তিনি নিকটস্থ অন্য একটি বাড়িতে বসবাস শুরু করেছেন এবং এলাকার একটি রড-সিমেন্টের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
গত শনিবার কর্মস্থলের পাশেই অবস্থিত একটি কক্ষে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নিজের চরম কষ্টের কথা তুলে ধরেন জুনায়েদ। সারা দিন কাজের মাঝে সময় কাটলেও যখনই তিনি গভীর রাতে ফাঁকা বাসায় ফিরে আসেন, তখনই তাঁর বুক চিরে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। মা ও বোনদের হারানোর তীব্র শোকে তাঁর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে এবং বিছানায় শুয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। ঘরের প্রতিটি কোণায় যেন তাঁদের চেনা স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে, যা তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে।
নিহত গৃহকর্ত্রী শাহিনুর বেগম ছাড়াও যাঁদের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তাঁরা হলেন সাইমা আক্তার, নাফিসা আক্তার ইকরা এবং সর্বকনিষ্ঠ ফাতেমা আক্তার সিফা। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ঘরে প্রবেশ করে ধারালো অস্ত্রের মাধ্যমে এই চার নারীকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার সময় স্থানীয় জনতা পালানোর চেষ্টা করার সময় অভিযুক্ত তরুণ অন্তর মজুমদারকে ধরে ফেলেন এবং তাঁর ওপর চড়াও হন। পরবর্তীতে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই ওই অভিযুক্ত তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
এই জোড়া বা বলা চলে চারজন মানুষের পৈশাচিক মৃত্যুর ঘটনায় রায়পুর থানায় প্রথম মামলাটি দায়ের করেছিলেন স্বয়ং জুনায়েদ ইসলাম। অন্যদিকে অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারের গণপিটুনিতে মৃত্যুর পর পুলিশ প্রশাসন নিজে বাদী হয়ে আরেকটি পৃথক হত্যা মামলা দায়ের করে। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, চার মাস পেরিয়ে গেলেও এই দুটি চাঞ্চল্যকর মামলার একটিরও চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কোনো মোটিভ বা কারণ আবিষ্কার করতে পারেনি।
তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে প্রেমঘটিত জটিলতা, আর্থিক লেনদেন, স্বর্ণালংকার চুরি কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিগত রেষারেষি রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে যাচাই করে দেখছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব অনুমানের সপক্ষে কোনো শক্ত বা নিশ্চিত প্রমাণ তাদের হাতে আসেনি। অপরাধী অন্তর একাই এই বর্বরোচিত ঘটনা ঘটিয়েছে নাকি এর পেছনে আরও কেউ জড়িত ছিল, তা নিয়ে জনমনে ও স্বজনদের মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
ঘটনার পরপরই তল্লাশি চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু নগদ অর্থ এবং স্বর্ণালংকার অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়, যার ফলে এটি কেবল সাধারণ কোনো লুটপাটের উদ্দেশ্যে সংঘটিত অপরাধ কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে নিহতদের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি, যা পরবর্তীতে গণপিটুনির স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। অভিযুক্ত নিজেই ওই ফোন দুটি সঙ্গে নিয়ে বের হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নিহতদের পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে অভিযুক্ত অন্তরের মুঠোফোনে অতীতে কোনো ধরনের যোগাযোগের রেকর্ড ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নিয়মিত বা সন্দেহজনক কোনো যোগাযোগের প্রমাণ মেলেনি বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই মামলা দুটি বর্তমানে তদন্ত করছেন রায়পুর থানার পুলিশ পরিদর্শক আবদুল মান্নান।
তদন্ত কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে আবদুল মান্নান উল্লেখ করেন যে, মামলা দুটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সাক্ষ্যপ্রমাণ, বিভিন্ন আলামত, ফরেনসিক ল্যাবরেটরি থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ কাজে লাগিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়াকে সামনে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া জানান যে, এটি একটি অত্যন্ত আলোচিত ও স্পর্শকাতর ঘটনা। তাই তদন্তের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো না করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য দ্রুত উন্মোচন করতে পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর