নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
দেশের প্রধান জাদুঘরের অন্দরমহলে পা রাখলে প্রাচীন সভ্যতার বহুমুখী নিদর্শন মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। কখনো প্রাচীন আমলের মুদ্রা, কখনো পাথরের খোদাই করা মূর্তি, আবার কখনো প্রাচীন রাজন্যবর্গের ব্যবহৃত নানা সামগ্রী দর্শকদের নজর কাড়ে। এর মধ্যে দর্শকদের মনের ভেতর তীব্র আগ্রহ জাগায় সেকালের সুবিশাল সব পালঙ্ক। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক এসব কাঠের আসবাব অতীতের শৈল্পিক উৎকর্ষ ও আভিজাত্যের অনন্য দলিল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, এই কক্ষগুলোতে সবসময় সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। ছোট থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের মানুষ এই কাঠের নিদর্শনগুলো দেখতে ছুটে আসেন। পালঙ্কের গায়ের নিখুঁত শিল্পকর্ম, এদের বিরাট আয়তন এবং রাজপরিবারের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত নানা গল্প সাধারণ মানুষকে দারুণভাবে মোহিত করে।
গত বুধবারের অন্তিম সময়ে নিজের পরিবারকে নিয়ে জাদুঘর প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন এক ব্যবসায়ী। তার নাম রাকিব হাসান। তিনি তার সন্তানকে সাথে নিয়ে ঐতিহাসিক খাটগুলো ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। ওই অভিভাবক সে সময় সংবাদমাধ্যমকে জানান যে তার ছোট সন্তানেরা আগে কখনো এমন বিছানা দেখেনি, তাই তাদের এগুলো সরাসরি দেখাতে নিয়ে এসেছেন। পরী, জলপরী, সিংহ এবং বাঘের অবয়ব দেখে শিশুরা বেজায় আনন্দিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দর্শকদের প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফরিদপুর ও নড়াইলের লোহাগড়ার দুই অভিজাত ব্যক্তির ব্যবহৃত দুটি পালঙ্ক। এর মধ্যে ফরিদপুরের অভিজাত ব্যক্তির ব্যবহৃত খাটটি ইতিহাসের পাতায় স্থান পেতে ১৯৭৬ সালে সংগ্রহ করা হয়। উনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত এই পালঙ্কের দৈর্ঘ্য ছিল ১২৩ ইঞ্চি আর এর প্রস্থ মাপলে পাওয়া যায় ২৭ ইঞ্চি। এর খুঁটি ও মূল কাঠামোর গায়ে মানুষের অবয়ব, নারীমূর্তি, সিংহ, হরিণ ও হাতির রূপ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে খোদাই করা রয়েছে।
অন্যদিকে, নড়াইলের লোহাগড়া অঞ্চলের ক্ষমতাধর ব্যক্তির ব্যবহৃত অন্য পালঙ্কটি ১৯৭৮ সালে ওই এলাকার ইতনা জনপদ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। এই বিশালাকার আসবাবটির দৈর্ঘ্য ১২৫ ইঞ্চি, প্রস্থ ১০১ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ছিল ১৩৩ ইঞ্চি। যিনি এটি বিক্রি করেছিলেন, তার ভাষ্যমতে এটি লোহাগড়ার সেই বিশিষ্ট ব্যক্তির ব্যবহার্য ছিল। এই পালঙ্কের চার কোণে অত্যন্ত নজরকাড়া প্যাঁচানো নকশার চারটি কাঠের স্তম্ভ রয়েছে। এর নিচের অংশ বা পায়াগুলো পরির অবয়বে গড়া। পেছনের অংশে উদ্ভিজ্জ উপাদান, ফুল ও লতাপাতার কারুকাজ রয়েছে।
বাঙালি জনজীবনের লোকশিল্পের অন্যতম প্রধান শাখা হলো দারুশিল্প বা কাঠের কারুকার্য। অলংকৃত পালঙ্ক এই শিল্পধারার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। এই আসবাবগুলো কেবল ঘুমানোর মাধ্যম ছিল না, এর গায়ের নকশায় ফুটিয়ে তোলা হতো শিল্পীদের নিখুঁত দক্ষতা। সেকালের সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবহাওয়ার পাশাপাশি কারুশিল্পীদের নিজস্ব মনন ও রুচির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠত এসব সৃষ্টিতে।
ঐতিহাসিক শয্যা বা খাটের নানা বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী অতীতে বিভিন্ন নাম চালু ছিল। যেমন যাত্রাসিদ্ধি, সর্বসিদ্ধ, বিজয়া, অষ্টমঙ্গলা, জয়, মঙ্গল, প্রেয়ান, চিত্রকান্ত এবং মঞ্চ। প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ ‘যুক্তি কল্পতরু’ অনুযায়ী খাটগুলোকে দূরদর্শী, দীর্ঘদর্শী, দুর্লঙ্ঘ্য এবং দুরাসদ—এই চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। গ্রন্থে বলা হয়েছে যে এই চার ধরনের শয্যা রাজাদের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় রাজা, জমিদার ও বিত্তশালী পরিবারগুলো এই ধরনের পালঙ্ক ব্যবহার করত। সে যুগে ছেনি, হাতুড়ি ও বাটালি দিয়ে কাঠে খোদাই করে নানা শিল্পকর্ম ফুটিয়ে তোলা হতো।
জাদুঘরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাবেক পরিচালক জিনাত মাহরুখ বানুর রচিত ‘বাংলাদেশের দারুশিল্প’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, খাট বা পালঙ্ক নির্মাণে ধর্মীয় বা শাস্ত্রীয় নিয়ম মানা হলেও এর নকশায় শিল্পীদের নিজস্ব মুন্সিয়ানা প্রকাশ পেত। পরবর্তী সময়ে বিদেশি বণিক ও ভ্রমণকারীদের আগমন এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রভাবে বাংলার আসবাব নির্মাণশৈলীতে পরিবর্তন আসে। উনিশ শতকের কয়েকটি শয্যায় ব্রিটিশ, রোমান, গ্রিক ও আরবি স্থাপত্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তবে এ দেশের কাঠমিস্ত্রিরা এই নকশাগুলোর মধ্যেও নিজেদের স্বতন্ত্র শিল্পরীতি বজায় রেখেছিলেন।
ওই গবেষক বুধবার বিকেলে সংবাদমাধ্যমকে জানান যে একসময় যশোর, খুলনা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ফরিদপুর ও সিলেট অঞ্চলে অত্যন্ত উঁচু মানের অলংকৃত পালঙ্ক তৈরি হতো। সেকালে জমিদার ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বাসভবনে মাসিক চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করতেন স্থানীয় কাঠমিস্ত্রিরা। একটিমাত্র পালঙ্ক সম্পূর্ণ তৈরি করতে কখনো কখনো দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেত। দীর্ঘস্থায়ী ও শৈল্পিক এই আসবাবপত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সঠিক কাঠ নির্বাচন করা ছিল অত্যন্ত জরুরি। সাধারণত সেগুন, কাঁঠাল, গর্জন, জারুল ও মেহগনি কাঠ দিয়ে এগুলো তৈরি করা হতো।
উক্ত গ্রন্থটিতে পালঙ্কের বিভিন্ন অংশের কারুকাজে শিল্পীদের মুন্সিয়ানার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। রাজকীয় পালঙ্কের নিচের পায়াগুলো হিংস্র পশুর থাবার আদলে তৈরি করা হতো, যাকে ‘সিংহপায়া’ বলা হতো। খাটের শিয়র ও পায়ার দিকে কাঠ কেটে ত্রিমাত্রিক ও দ্বিমাত্রিক শিল্পকর্ম ফুটিয়ে তোলা হতো। এসব নান্দনিক নকশায় লতাপাতা, গোলাপ ফুল, কলকা, ময়ূর, জোড়া হংস এবং পরির অবয়ব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠত।
ঐতিহাসিক এই জাদুঘরের কাঠের শিল্পকর্ম প্রদর্শনী কক্ষে খাট ছাড়াও বিভিন্ন কাঠের সিন্দুক, বেড়া, দরজা, পালকি, ঢেঁকি, রাজসিংহাসন, চেয়ার এবং নারীর ভাস্কর্য প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের তথ্যভান্ডারের হিসাব অনুযায়ী, তাদের সংরক্ষণে মোট ২১৪টি কাঠের শিল্পকর্ম রয়েছে। এর মধ্য থেকে মাত্র ৪৬টি ঐতিহাসিক নিদর্শন বর্তমানে দুটি নির্দিষ্ট গ্যালারিতে দর্শনার্থীদের দেখার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
কাঠ দিয়ে তৈরি হওয়ায় আবহাওয়ার আর্দ্রতা পরিবর্তন, ছত্রাক ও নানা ধরনের পোকামাকড়ের আক্রমণের কারণে এই অমূল্য পালঙ্কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘকাল ধরে এই প্রাচীন নিদর্শনগুলোর ঐতিহাসিক ও নান্দনিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখার জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, উপযুক্ত পরিবেশ বজায় রাখা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
এই বিষয়ে জাদুঘরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসমা ফেরদৌসি জানান যে তাদের প্রতিটি নিদর্শন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাদের নিজস্ব ল্যাবরেটরি রয়েছে যেখানে আসবাবগুলোর বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করা হয় এবং সে অনুযায়ী সুরক্ষার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর