নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মাফতুহা জান্নাত জীম সম্প্রতি 'বিষপাখি', 'পেট্রোল' এবং 'আহা একি মায়া' শিরোনামের তিনটি নাটকে কাজ করে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন। জীম নামেই বেশি পরিচিত এই তরুণ অভিনেত্রী মূলত শিশুশিল্পী হিসেবে শোবিজ অঙ্গনে পা রেখেছিলেন, তবে মাঝখানে কিছুকাল বিরতি নিয়েছিলেন। শিক্ষাজীবন শেষ করার পর তিনি আবার অভিনয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেছেন।
শৈশবে চিত্রনায়িকা শাবানা ও শাবনূরের কাজ দেখে অভিনয়ের প্রতি তীব্র ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল এই অভিনেত্রীর। যদিও তাঁর শৈল্পিক যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত নৃত্যচর্চার মাধ্যমে। এরপর শিশুশিল্পী হিসেবে কয়েকটি বিজ্ঞাপনী প্রচারণায় কাজ করার সুযোগ পান তিনি। সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় পরিচালক অনম বিশ্বাসের ‘দেবী’ সিনেমায় অভিনয় করার সৌভাগ্য হয় তাঁর, যেখানে জনপ্রিয় চরিত্র রানুর শৈশবের স্মৃতিচারণমূলক দৃশ্যে তাঁকে পর্দায় দেখা গিয়েছিল।
তবে শিশু বয়সের সেই অভিনয়কে সে সময় পেশা হিসেবে নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি, কারণ তাঁর মূল মনোযোগ ছিল পড়াশোনার দিকে। শিক্ষাজীবন শেষ করে ২০২৩ সালে তিনি অভিনয়ে পুরোদমে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বাবু সিদ্দিকীর নির্দেশনায় ‘সিক্রেট গার্লফ্রেন্ড’ নাটকের মাধ্যমে ছোটপর্দায় আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই নাটকে কীভাবে সুযোগ পেলেন, সে বিষয়ে তিনি জানান যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে নির্মাতা বাবু সিদ্দিকীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয় এবং অভিনয়ের প্রবল আগ্রহের কথা জানার পর পরিচালক তাঁকে কাজ করার সুযোগ দেন, আর এভাবেই তাঁর মিডিয়া ক্যারিয়ারের সূচনা ঘটে।
অভিনয় জগতে পুনরায় ফিরে আসার পর বেশ কিছু কাজ করলেও মাবরুর রশিদ বান্নাহর পরিচালনায় ‘যত্ন’ নাটকটিকে নিজের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে মনে করেন জীম। এই নাটকে তাঁর অভিনীত 'ইরা' চরিত্রটি দর্শকদের মন জয় করেছিল এবং আজও দূরদূরান্ত থেকে মানুষ তাঁকে সেই ইরা নাম ধরে সম্বোধন করে। সহশিল্পী আরশ খানের সঙ্গে তাঁর রসায়ন দর্শক দারুণভাবে গ্রহণ করেছিলেন।
দর্শকদের এই ইতিবাচক সাড়ার কারণে নির্মাতা সকাল আহমেদ তাঁকে ‘দোষটা কার?’ নাটকে কাস্ট করেন এবং সেখানেও দর্শক এই জুটিকে পছন্দ করেন। ওই নাটকে তাঁকে চিরাচরিত ধারার বাইরে গিয়ে একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করতে হয়েছিল, যা একজন অভিনেত্রী হিসেবে তাঁকে নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণের ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করে। কাজটি প্রচার হওয়ার পর সাধারণ দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকে দারুন প্রশংসা লাভ করেন তিনি, যা তাঁর আত্মবিশ্বাস বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয় এবং এর পর থেকেই নির্মাতারা তাঁকে অধিক চ্যালেঞ্জিং ও মূলধারার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের জন্য উপযুক্ত মনে করতে শুরু করেন।
বর্তমান সময়ে তাঁর ব্যাপক আলোচনার মূলে রয়েছে ‘বিষপাখি’, ‘পেট্রোল’ ও ‘আহা একি মায়া’ নামের তিনটি ভিন্ন স্বাদের নাটক। এই তিন নাটকের প্রতিটির কাহিনী ও চরিত্র একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ায় তাঁর কাজের অভিজ্ঞতাও ছিল বৈচিত্র্যময়। ভিকি জাহিদ পরিচালিত ‘বিষপাখি’ নাটকে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে অসাধারণ বলে উল্লেখ করে তিনি জানান যে একটি সাধারণ মেয়ের চরিত্র রূপায়ন করতে গিয়েও তাঁকে আবেগের বহু স্তর অতিক্রম করতে হয়েছে এবং চরিত্রটি তাঁর জন্য যথেষ্ট কঠিন ছিল।
‘পেট্রোল’ নাটকে সহশিল্পী জোনায়েদ বোগদাদীর সঙ্গে তাঁর অনস্ক্রিন কেমিস্ট্রি দর্শকদের ভালো লাগার একটি প্রধান কারণ বলে তাঁর বিশ্বাস। অন্যদিকে ‘আহা একি মায়া’ নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন আরশ খানের বিপরীতভাগে। এই রোমান্টিক ঘরানার নাটকে পারিবারিক আবহের সঙ্গে আবেগের এক চমৎকার সমন্বয় রয়েছে।
এই তিনটি নাটকই দর্শকের এত পছন্দ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জীম উল্লেখ করেন যে দর্শকরা আজকাল একঘেয়ে বা গতানুগতিক গল্প দেখতে পছন্দ করেন না। এই তিন নাটকের মূল ভাবনা একে অপরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ায় রোমান্স থেকে শুরু করে ড্রামা কিংবা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার—নানা ধরনের গল্পের ভিন্নতা উপভোগ করেছেন দর্শকরা। প্রতিটি চরিত্র রূপায়নের সময় তিনি সচেতন ছিলেন যেন কোথাও অতি অভিনয় বা ওভারঅ্যাক্টিং না হয়, যাতে সাধারণ মানুষ নিজেদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে চরিত্রগুলোর মিল খুঁজে পান এবং এই চেনাজানা রূপ ও বাস্তবধর্মিতাই মূলত দর্শকদের মন জয় করেছে।
অভিনয় শিল্পে নিজেদের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে জীমকে। তাঁর পর্যবেক্ষণে, অনেক প্রযোজক ও নির্মাতা নতুন অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে কোনো ধরনের বাড়তি ঝুঁকি নিতে নারাজ, যার ফলে শুরুর দিকে একই ধরনের চরিত্রের অফারই বেশি আসে। অভিনয় প্রতিভা দর্শকের সামনে তুলে ধরার জন্য ভিন্নধর্মী ও শক্তিশালী চরিত্র পাওয়া নতুনদের ক্ষেত্রে একটি বড় পরীক্ষা। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান যে শুরুর দিকে তাঁকেও এই জাতীয় সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, অথচ নতুনদের মধ্যেও পর্যাপ্ত প্রতিভা রয়েছে এবং তাঁদের যথাযথ সুযোগ দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
বর্তমানে নাট্যকলায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন জীম, যা তাঁর অভিনয় দক্ষতাকে আরও শানিত করতে সাহায্য করছে বলে তিনি মনে করেন। প্রাতিষ্ঠানিক এই শিক্ষা কোনো চরিত্রের ভেতরের মানসিক অবস্থা, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং আবেগ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে দারুণভাবে কাজে দেয়। এর পাশাপাশি কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, উচ্চারণের শুদ্ধতা এবং বাচনভঙ্গির ওপরও তিনি বিশেষ প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন।
ক্যামেরার সামনে শরীরী ভাষার সঠিক প্রয়োগ যে কতখানি জরুরি, তা তিনি এই পড়াশোনার মাধ্যমেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তাঁর মতে, অভিনয়ে কেবল মুখে সংলাপ আওড়ালেই চলে না, বরং চোখের ভাষা কিংবা শরীরের ক্ষুদ্রতম অঙ্গভঙ্গির মধ্য দিয়েও মনের ভাব প্রকাশ করা সম্ভব। কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি ছাড়া চরিত্রের ভেতরের আবেগ কীভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, নাট্যকলা তাঁকে সেই কৌশল শিখিয়েছে এবং চিত্রনাট্য পড়ার পর এর মূল থিম বুঝতেও এটি তাঁকে সাহায্য করে, যার ফলে পরিচালকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী নিখুঁত অভিনয় করা সহজ হয়।
ভবিষ্যতে পর্দার সামনে শক্তিশালী কোনো নারীর চরিত্র ফুটিয়ে তোলার প্রবল ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। আগামী দিনগুলোতে তিনি কোন ধরনের চরিত্রে কাজ করতে চান, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিচালকের নাম উল্লেখ না করে তিনি জানান যে যেকোনো ভালো নির্মাতার সঙ্গেই তাঁর কাজ করার প্রবল আগ্রহ রয়েছে। তবে চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি বৈচিত্র্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে চান, বিশেষ করে মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা সম্পন্ন চরিত্রে অভিনয় করার তীব্র বাসনা রয়েছে তাঁর। সাদা ও কালো রঙের সরল বিভাজনের বাইরে গিয়ে তিনি মানুষের মনের ভেতরের জটিল ও বহুরূপী দিকগুলো পর্দায় তুলে ধরতে চান, এবং এর পাশাপাশি বাস্তব জীবনের বাস্তবধর্মী ও শক্তিশালী নারীদের জীবনসংগ্রামের গল্পও অভিনয়ের মাধ্যমেই দর্শকের সামনে উপস্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর