নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
একাধিক করপোরেট কর্মক্ষেত্রের নিরাপদ পরিবেশ ত্যাগ করে একসময়ে কৌতুকশিল্পী হওয়ার সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন দেখেছেন সুমুখী সুরেশ। তবে মুম্বাই মহানগরে পদার্পণ করার পর তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়েছিল যে, রোমাঞ্চকর এই স্বপ্নের তুলনায় বাস্তব জগতের ব্যয়ভার ও নিষ্ঠুর টিকিয়ে রাখার প্রতিযোগিতা অনেক বেশি তীব্র। বর্তমানে জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে নিজের প্রথম স্ট্যান্ডআপ কমেডির বিশেষ উপস্থাপনা ‘হোমোনাল’ নিয়ে তিনি দারুণভাবে আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
চলমান এই আলোচনার মধ্যেই ভারতের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের অতীত জীবনের শুরুর দিনগুলোর কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্যমতে, নিজের লালিত স্বপ্নের পিছু ছুটতে গিয়ে অর্থাভাব, চরম অনিশ্চয়তা এবং টিকে থাকার অন্তহীন লড়াই কীভাবে তাঁর দৈনন্দিন জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে দেখা দিয়েছিল, সে কথাই জানিয়েছেন তিনি।
নাগপুরের একটি অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত ও রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেওয়া সুমুখীর পক্ষে নিরাপদ ও নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবিকার সন্ধান করা এবং কৌতুকশিল্পী হওয়ার পরিকল্পনা কোনোভাবেই সহজ বা স্বাভাবিক ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ করার পর তিনি প্রথাগত কর্মজগতে প্রবেশ করেছিলেন। পুষ্টিবিজ্ঞান, খাদ্যবিদ্যা এবং ডায়েটেটিকস বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি কাজ করেছিলেন খাদ্য পরীক্ষাগার ও খাদ্যমান যাচাইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে, যেখানে করপোরেট চাকুরিতে তাঁর দীর্ঘ জীবনের এক দশকেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছিল।
যদিও পেশাগত দায়িত্বের বাইরে নিজের ভেতরের সৃজনশীল ও মননশীল আগ্রহকে তিনি সব সময়ই এক বিশেষ স্থান দিতে চাইতেন। সেই তাগিদ থেকেই কর্মদিবসের সন্ধ্যাগুলো কাজে লাগিয়ে তিনি তাৎক্ষণিক অভিনয় বা ইমপ্রোভাইজেশনের চর্চা শুরু করেন এবং এর পাশাপাশি স্ট্যান্ডআপ কমেডি ও সংক্ষিপ্ত স্কেচ তৈরির কাজ চালিয়ে যান। একসময় তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, এই ধরনের সৃজনশীল কাজগুলোর প্রতিই তাঁর মনের টান ও আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কাছে সুমুখী তাঁর অতীতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, যখন তিনি মুম্বাইয়ে প্রথম এসেছিলেন, তখন তাঁর নিজের ব্যাংক হিসাবে মোটে ৫০ হাজার রুপি অর্থাৎ প্রায় সাতষট্টি হাজার টাকার মতো জমা ছিল। তাঁর অবাস্তব ধারণার কারণে তিনি ভেবেছিলেন যে এই সামান্য অর্থ দিয়েই হয়তো তাঁর আগামী তিন থেকে চার মাস অনায়াসে চলে যাবে, যা বর্তমানের বিচারে অত্যন্ত হাস্যকর একটি ভাবনা হিসেবে মনে হয় এবং তিনি বুঝতে পেরেছেন মুম্বাইয়ের মতো শহরে এই অর্থ এক সপ্তাহেরও কম সময়ে ফুরিয়ে যেতে পারে।
তাঁর দীর্ঘ আলোচনায় তিনি উল্লেখ করেন যে, সেই সময় তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল অর্থ উপার্জন করা এবং এই অচেনা শহরে নিজ অস্তিত্ব বজায় রেখে টিকে থাকা। করপোরেট জীবনের চেনা গণ্ডি ও নিশ্চয়তা ঝেড়ে ফেলে আসার পর এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে তিনি গভীরভাবে খুব একটা চিন্তাভাবনা করেননি। তবে পরবর্তীতে তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, জীবনের যেকোনো বড় ধরনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সবসময়ই বড় ধরনের ঝুঁকি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকে।
নিজের এই ক্যারিয়ারের সূচনা অবশ্য মুম্বাইয়ের মাটিতে হয়নি, বরং এর শুরুটা হয়েছিল দক্ষিণ ভারতের বেঙ্গালুরু শহরে। প্রায় ২০১৩ সালের দিকে তিনি সেখানকার সক্রিয় স্ট্যান্ডআপ কমেডি জগতের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন। সেই সময় তিনি নিয়মিত চাকরির পাশাপাশি নিজের মতো করে কমেডির চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু ছোট ছোট ভিডিও ও আকর্ষণীয় স্কেচের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নজর কাড়তে শুরু করেন।
তাঁর কর্মজীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া একটি বড় কাজ ছিল ২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘আনু আন্টি (দ্য ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্থেম)’ শিরোনামের একটি প্যারোডি ভিডিও, যেখানে তিনি চমৎকার অভিনয় করে অনলাইনে তুমুল দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। বেঙ্গালুরুভিত্তিক সুপরিচিত কমেডি দল দ্য এনথু কাটলেটসের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা এই ভিডিওটিতে তিনি এমন এক প্রৌঢ়ার চরিত্রে অভিনয় ফুটিয়ে তুলেছিলেন যিনি অন্য মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে অযথা নাক গলাতে দারুণ পছন্দ করেন এবং এই ভিন্নধর্মী চরিত্রটি দর্শকদের মাঝে দারুণ সাড়া ফেলেছিল।
এরপর একে একে তিনি ‘বেহতি নাক’ সহ বিভিন্ন ঘরানার কমেডি স্কেচে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেন এবং সুপরিচিত মকুমেন্টারি সিরিজ ‘বেটার লাইফ ফাউন্ডেশন’-এও নিজের জন্য একটি স্থায়ী জায়গা করে নেন। এভাবে অভিনয়, সৃজনশীল লেখালেখি এবং কমেডি—এই তিনটি ভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি নিজের মেধা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন এবং সামনের দিকে এগিয়ে যান।
তাঁর বর্ণিল ক্যারিয়ারের অন্যতম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হলো বহুল আলোচিত সিরিজ ‘পুষ্পাবল্লী’। অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর এই জনপ্রিয় সিরিজে তিনি কেবল নামভূমিকায় দুর্দান্ত অভিনয়ই করেননি, বরং এর সুনিপুণ নির্মাণ ও রচনার কাজের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। প্রেমের আকর্ষণে বেঙ্গালুরু শহরে পা রাখা এক অদ্ভুত তরুণীর জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই সিরিজটি প্রচলিত গতানুগতিক রোমান্টিক গল্পের ধারা থেকে বেরিয়ে এসে এক অস্বস্তিকর, জটিল ও বহুমাত্রিক নারী চরিত্রকে দর্শকদের সামনে জোরালোভাবে উপস্থাপন করে।
সব মিলিয়ে ২০১৭ সালে এই সিরিজের প্রথম মৌসুম মুক্তি পাওয়ার সুদীর্ঘ সময় পর ২০২০ সালে এর দ্বিতীয় মৌসুম আত্মপ্রকাশ করে। এই ব্যতিক্রমী কাজটি সুমুখীকে একজন বহুমুখী অভিনেত্রী ও দক্ষ নির্মাতা হিসেবে সম্পূর্ণ আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ২০২১ সালের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে তাঁকে ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল বিনোদনজগতের একেবারে শুরুর দিকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কনটেন্ট নির্মাতাদের একজন হিসেবে সসম্মানে উল্লেখ করা হয়েছিল।
অভিনয়শিল্পের পাশাপাশি নিজের চরিত্র নিজেই সৃষ্টি করার এই দীর্ঘ পথচলা কোনো অংশেই সহজ ছিল না। প্রচলিত কাস্টিং বা চরিত্র নির্বাচনের প্রথাগত ধারা নিয়ে তিনি একাধিকবার প্রকাশ্যেই নিজের তীব্র হতাশা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সুনির্দিষ্ট মতে, প্রচলিত ও কৃত্রিম সৌন্দর্যের নির্দিষ্ট মাপকাঠির সঙ্গে যদি কোনো নারী অভিনেত্রীর শারীরিক গঠন না মিলে যায়, তবে তাঁরা প্রায়শই নিজেদের পছন্দসই বা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়ে থাকেন।
ইতিপূর্বে ২০২১ সালে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে সুমুখী স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, তিনি যতই মূল ধারায় অভিনয় করতে আগ্রহী হোন না কেন, তাঁকে প্রায়শই কেবল বোনের মতো কিংবা বান্ধবীর মতো গৌণ বা পার্শ্বচরিত্রের কথা মাথায় রেখে বিচার করা হতো। এই সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে মুক্তি পেতেই তিনি সম্পূর্ণ নিজের মতো করে প্রধান চরিত্র নিজেই তৈরি করার পণ করেছিলেন এবং সেই সুদূরপ্রসারী ভাবনা থেকেই ‘পুষ্পাবল্লী’ নির্মাণের জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল।
একই বছরে তিনি নিজের ব্যক্তিগত প্রযোজনা ও কনটেন্ট নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘মোটরমাউথ’ জাঁকজমকপূর্ণভাবে চালু করেছিলেন। বিভিন্ন সিনেমা, আকর্ষণীয় সিরিজ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডের জন্য মানসম্মত কনটেন্ট তৈরির পাশাপাশি তিনি নাট্যজগতে নারীদের প্রচলিত ও একপেশে উপস্থাপনার ধরন চিরতরে বদলে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর সুচিন্তিত ভাবনা ছিল যে, পর্দার আড়ালে নারীদের কেবল আদর্শ স্ত্রী, আকর্ষণীয় প্রেমিকা কিংবা খলনায়িকা হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হবে না; বরং বাস্তবের মানবজীবনের মতোই তাদের চরিত্রের মাঝেও থাকবে নানা ধরনের বৈপরীত্য, ভুলত্রুটি, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং অদম্য শক্তি।
তাঁর নিজের ভাষায় বলতে গেলে, সমাজে গল্প বলার প্রথাগত ধারাকে যদি সত্যিই পরিবর্তন করতে হয়, তবে শুধু একা একা অভিযোগ করলে কোনো লাভ হবে না, বরং দৃশ্যমান নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী জায়গাগুলোতেও নারীদের সশরীরে সরব উপস্থিতি থাকতে হবে। তাঁর এই সুদৃঢ় অবস্থানের ফলেই আজকের এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছেন তিনি।
সুমুখীর সাম্প্রতিকতম ও অন্যতম উল্লেখযোগ্য সৃজনশীল কাজ হলো তাঁর ‘হোমোনাল’ নামক স্ট্যান্ডআপ বিশেষ অনুষ্ঠানটি। ২০২১ সালের শুরুর দিকেই তিনি মূলত এই ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানটির মূল ধারণা ও লেখার কাজ অত্যন্ত নিপুণভাবে শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ভারতের বিভিন্ন বড় বড় শহরের মিলনায়তনে নানাবিধ শো সফলভাবে সম্পন্ন করার পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বড় মঞ্চেও এই অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিবেশন করেছিলেন।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের মর্যাদাপূর্ণ এডিনবরা ফ্রিঞ্জ উৎসবে সরাসরি অংশগ্রহণ করাটা তাঁর পেশাগত জীবনের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একটি অভিজ্ঞতা ছিল। অবশেষে দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পায় তাঁর এই বহুল প্রতীক্ষিত স্ট্যান্ডআপ বিশেষ সংস্করণটি।
এই অনুষ্ঠানে তিনি নিজের জীবনের তিরিশের দশকের নানা অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, তীব্র একাকিত্ব, শারীরিক গঠনগত পরিবর্তন, হরমোনজনিত নানা জটিল সমস্যা, এবং সমাজ নির্ধারিত বিয়ে ও মাতৃত্বের মতো গুরুতর বিষয়গুলোকে অত্যন্ত চমৎকার হাস্যরসের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অনুষ্ঠানটির এই অনন্য নামকরণটিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘হোমোনাল’ শব্দটি মূলত মানবদেহের হরমোনের আকস্মিক পরিবর্তন এবং নারীর নিজস্ব যৌনতা ও সম্পর্ক সংক্রান্ত সামাজিক রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একধরনের চমৎকার মজা করেই তৈরি করা হয়েছে এবং নামের এই গভীরতার মাঝেই প্রচলিত কুসংস্কারকে সরাসরি প্রশ্ন করার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে।
নেটফ্লিক্স করণিক কর্তৃক প্রকাশিত প্রাতিষ্ঠানিক বিবরণে সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, একজন নারীর জীবনের তিরিশের দশকের অসংখ্য জটিল অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক ও মাতৃত্বের ধারণার বিরুদ্ধে প্রশ্ন এবং সমাজের চাপিয়ে দেওয়া প্রত্যাশাকে তিনি নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নিরিখে অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছেন। অনুষ্ঠানটি প্রকাশের পূর্বে সুমুখীর নিজের মনেও এমন কোনো জোরালো প্রত্যাশা ছিল না যে সাধারণ দর্শকরা এত গভীরভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে এই সৃষ্টির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারবেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর