ঢাকা | বঙ্গাব্দ

কুমিল্লায় জলাশয় থেকে কাশ্মীরি মেডিকেল শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 6, 2026 ইং
কুমিল্লায় জলাশয় থেকে কাশ্মীরি মেডিকেল শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

সহপাঠী বন্ধুরা যখন তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে স্থানীয় একটি জলাশয়ে ভেসে ওঠে ২৬ বছর বয়সী তরুণ আদনান আলতাফের নিথর দেহ। ভারতীয় অঞ্চলের জম্মু ও কাশ্মীরের এই শিক্ষার্থী কুমিল্লার একটি বেসরকারি মেডিকেল প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যয়ন করছিলেন। দীর্ঘকাল ধরে মানসিক অসুস্থতার নানা জটিলতার কারণে শিক্ষাজীবনে বেশ খানিকটা পিছিয়ে পড়েছিলেন এই তরুণ। তাঁর অভিভাবকেরা এই সমস্যার সুদূরপ্রসারী চিকিৎসার ব্যবস্থাও সম্পন্ন করেছিলেন। সন্তানের পরীক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সান্নিধ্যে থাকার জন্য সুদূর ভারত থেকে কুমিল্লার মাটিতে পা রেখেছিলেন তাঁর জননী নিঘাত বেগম। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে আর পরীক্ষাকক্ষে পৌঁছানো হলো না আদনানের।

নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার দুই দিন পর সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি অবস্থিত একটি জলাশয় থেকে ওই শিক্ষার্থীর মৃতদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনার পর বুড়িচং থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে আসার পরই পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ওই বেসরকারি চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় পরিদর্শনে আসেন বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কর্মরত ভারতীয় হাইকমিশনের কনস্যুলার ও শিক্ষা বিষয়ক সেকেন্ড সেক্রেটারি মৃন্ময় কুমার সিং। তিনি মৃত শিক্ষার্থীর জননী এবং সেখানে শিক্ষানরত অন্যান্য ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকবৃন্দ ও পরিচালকদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন। পরবর্তীতে তিনি আদনানের নিয়মিত আবাসিক হোস্টেল, রাতের আহার গ্রহণের খাবার হোটেল এবং যে জলাশয় থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, একে একে সেই সমস্ত স্থান সরেজমিন পরিদর্শন করেন।

স্মরণ করা যেতে পারে যে, এই শিক্ষার্থী চিকিৎসাশাস্ত্রের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৪তম ব্যাচের এই শিক্ষার্থীর সহপাঠীদের অনেকেই ইতিমধ্যে সফলতার সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করছেন। কেউ কেউ আবার নিজেদের ইন্টার্নশিপের মেয়াদও সফলভাবে সম্পন্ন করে ফেলেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা কার্যক্রমে পিছিয়ে থাকায় আদনানের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা সমাপ্ত করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, প্রথম পেশাগত পরীক্ষায় প্রথমবারেই সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এই তরুণ। তবে দ্বিতীয় পেশাগত পরীক্ষায় পাস করতে তাঁকে তিনবার প্রচেষ্টা চালাতে হয়েছিল। পরবর্তীতে তৃতীয় পেশাগত পরীক্ষায় বিগত বছরের মে মাসে অংশ নিয়ে তিনি আশানুরূপ কৃতকার্য হতে পারেননি। এমনকি একই বছরের নভেম্বর মাসের পরীক্ষাতেও তিনি অকৃতকার্য হন।

বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় অনলাইনে নিয়মিত ক্লাস কার্যক্রমে যুক্ত থাকলেও কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষায় অংশ নেননি এই শিক্ষার্থী। এভাবেই তিনি படிப்பলেখার দিক থেকে আরও বেশি পিছিয়ে পড়তে শুরু করেন। পরবর্তীতে মানসিক অসুস্থতা ও আনুষঙ্গিক নানা কারণে তাঁর পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা করান। এতকিছুর পরেও শিক্ষাজীবনে আর স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেননি তিনি।

ওই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ জাকিরুল ইসলামের ব্যক্ত করা মন্তব্য অনুযায়ী, চিকিৎসাবিদ্যার জটিল ও কঠিন পড়াশোনার চাপ কোনোভাবেই সামলাতে পারmছিলেন না এই তরুণ। মূলত এই কঠিন পরিস্থিতির কারণে তিনি মারাত্মকভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন।

সন্তানের মানসিক অস্থিতিশীল অবস্থার কথা বিবেচনা করে নিঘাত বেগম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি নিয়ে শান্তি-সুনীতি ছাত্রীনিবাসের একটি কক্ষে বসবাস করতেন। আর আদনান নিজে অবস্থান করতেন ছেলেদের জন্য নির্ধারিত ছাত্রাবাসে। সন্তানের অসুস্থতার সার্বিক দিক বিবেচনা করে জননী তাঁকে সব সময় নিজের সতর্ক দৃষ্টির মধ্যে রাখতেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনার আগে আদনানের সম্মানিত পিতা আলতাফ হোসাইন রাথারও তাঁর সন্তানের সার্বিক দেখাশোনার জন্য কুমিল্লার মাটিতে অবস্থান করেছিলেন। প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে তিনিও বেশ কয়েক মাস এই এলাকায় অবস্থান করে সন্তানের খোঁজখবর নিয়েছিলেন।

প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, গত সোমবার রাতের অন্ধকারে আদনান শিক্ষাসংলগ্ন বিসমিল্লাহ নামের একটি হোটেলে খাবার গ্রহণের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন। ঠিক সেই সময়ে তিনি তাঁর মুঠোফোনটি ওই খাবার হোটেলেই অসাবধানতাবশত ফেলে আসেন। পরবর্তীতে ছাত্রাবাসে ফিরে মায়ের কাছে গিয়ে মুঠোফোন হারিয়ে যাওয়ার পুরো বিষয়টি জানান। তখন তাঁর জননী তাঁকে দ্রুত সেখানে গিয়ে ফোনটি নিয়ে আসার পরামর্শ দেন। মায়ের নির্দেশ পেয়ে হোটেলের উদ্দেশে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেও আদনান আর নিজের ঠিকানায় ফিরে আসেননি।

সন্তান মানসিকভাবে মারাত্মক অসুস্থ ছিলেন বলে দাবি করে জননী নিঘাত বেগম আকুল কণ্ঠে জানান যে, ছেলে কখনো পরীক্ষায় বসতে চাইত না। তিনি কেবল পরীক্ষার কঠিন সময়ে তাঁর পাশে থাকার জন্যই এখানে ছুটে এসেছিলেন। নিজের সন্তানকে সর্বদা চোখে চোখে আগলে রেখেছিলেন। এখন তিনি দেশে ফিরে আদনানের পিতাকে গিয়ে কী জবাব দেবেন, সেই চিন্তায় তিনি দিশাহারা।

উল্লেখ্য, বর্তমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ প্রায় দুই শতাধিক ভারতীয় শিক্ষার্থী বিভিন্ন বর্ষে অধ্যয়ন করছেন। তাঁদের মধ্যে জম্মু ও কাশ্মীর, মেঘালয়, মহারাষ্ট্র, কেরালা, আসাম, মণিপুর, পশ্চিমবঙ্গ ও গুজরাট রাজ্য থেকে আগ the শিক্ষার্থীরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

গতকালের বিকেলে ভারতীয় কূটনীতিক এই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করে তাঁদের সার্বিক নিরাপত্তা ও বর্তমান পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন। কূটনৈতিক মৃন্ময় কুমার সিং সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান যে, তিনি মূলত ভারতে থেকে আগত অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মনের জোর বাড়াতে এবং এই কঠিন সময়ে ভারতীয় সরকার তাঁদের পাশে রয়েছে—এই বার্তা পৌঁছে দিতে এসেছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন করে দেখেছেন যে কর্তৃপক্ষ ভারতীয় শিক্ষার্থীদের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল। তবে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বা কাম্য হতে পারে না।

উক্ত পরিদর্শনের সময় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ মো. সেলিম, পরিচালক খোরশেদ আলম, অধ্যক্ষ জাকিরুল ইসলাম, উপাধ্যক্ষ পীযূষ কর্মকার এবং বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লুৎফুর রহমানসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে নিহত শিক্ষার্থীর মরদেহ বর্তমানে রাজধানী ঢাকার একটি হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণের জন্য পাঠানো হয়েছে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরের নিজস্ব কার্যকারিতা সচল না থাকায় বাধ্য হয়ে মরদেহ ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। ভারতীয় কূটনৈতিক মিশন সব ধরনের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর মরদেহ সসম্মানে স্বদেশে প্রেরণের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পরবর্তীতে শোকাহত জননী নিঘাত বেগম তাঁর সন্তানের মরদেহ সঙ্গে নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যাবেন।

বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লুৎফুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, শিক্ষার্থীর আকস্মিক মৃত্যুর এই ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। তাঁর এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর আসল কারণ উদ্ঘাটন করতে বর্তমানে পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া কার্যকর করা হবে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জটিলতা দূর করল আপিল বিভাগের রায়

প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জটিলতা দূর করল আপিল বিভাগের রায়