নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রাজধানীর উত্তরা এলাকার বিভিন্ন সড়কে বর্তমানে একদল বিদেশি নাগরিককে নিয়মিত ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে রয়েছে দুটি করে মোবাইল ফোন, যার একটিতে লাইভ ভিডিও সম্প্রচার করা হয় এবং অন্যটিতে কিছু লেখা থাকে। প্রথম দেখায় তাদের সাংবাদিক বা মানচিত্র তৈরির কর্মী মনে হলেও তারা মূলত সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অবিরাম লাইভ ভিডিও ধারণ করে চলেছেন। এমনকি অনেক সময় তারা সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ঘরের ভেতরেও প্রবেশ করে ভিডিও করেন, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর এবং টেকপাড়া এলাকায় এই চীনা নাগরিকদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। ঠিক কতজন বিদেশি নাগরিক এই কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান বা সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় লোকজনের অনুমান অনুযায়ী, প্রায় দেড় শতাধিক চীনা নাগরিক প্রতিদিন এই এলাকার অলিগলিতে ভিডিও ধারণ করে থাকেন। এই ভিডিওগুলো কোথায় সম্প্রচার করা হয় কিংবা লাইভে ঠিক কী ধরনের মন্তব্য করা হয়, সে সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দাদের কোনো ধারণাই নেই। পাশাপাশি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও এই পুরো কার্যক্রমের ওপর কোনো ধরনের নজরদারি চালানো হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠার আগে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগপর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় ধরে লাইভ ভিডিও করার বিষয়টি প্রথমে কৌতূহলের সৃষ্টি করলেও বর্তমানে তা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য তীব্র বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টেকপাড়ার বাসিন্দা আকরাম হোসেনের মতে, ঘটনাটি দুই-এক দিনের হলে মেনে নেওয়া যেত, কিন্তু মাসের পর মাস ধরে এই কর্মকাণ্ড চলছে। উত্তরার এই এলাকাটিতে দর্শনীয় বা আকর্ষণীয় কিছু না থাকা সত্ত্বেও কেন মানুষের স্বাভাবিক দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড এভাবে নিয়মিত ধারণ করা হয়, তা নিয়ে নতুন আসা দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
উত্তরার অন্যান্য উন্নত অংশের তুলনায় ১২ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন খালের পাড়ে অবস্থিত টেকপাড়া তুলনামূলকভাবে অনুন্নত, নিম্ন আয়ের মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ এবং কিছুটা অস্বাস্থ্যকর। আর এই নির্দিষ্ট অঞ্চলটিকেই ভিডিও ধারণের প্রধান স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছেন চীনা নাগরিকেরা। গত ২৭ অক্টোবর এবং ৩ নভেম্বর সংবাদকর্মীরা ওই এলাকায় গিয়ে অন্তত ১৭ জন চীনা নাগরিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। যারা সামান্য আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, তারা কেবল নিজেদের নাম ও দেশের নাম জানিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। অনেকে ইংরেজি ভাষায় দক্ষ না হওয়ায় এবং গুগল ট্রান্সলেটর ব্যবহার করতেও অস্বীকৃতি জানানোর কারণে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
গত ২৭ অক্টোবর বিকেলে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর এলাকায় রিতু আক্তার নামের এক বাংলাদেশি নারীর সন্ধান মেলে, যিনি মূলত এই চীনা নাগরিকদের গাইড বা সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। গত কয়েক মাস ধরে তিনিসহ আরও বেশ কয়েকজন নারী এই বিদেশি নাগরিকদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করে আসছেন। চীনা নাগরিকেরা লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে কোথায় কনটেন্ট প্রকাশ করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে রিতু আক্তার ফ্যাঙইয়ো নামের এক চীনা নাগরিককে ডেকে আনেন। চায়নিজ ভাষায় কথা বলে সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি করানোর পর ফ্যাঙইয়োর মুঠোফোনে গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে কিছু তথ্য জানা যায়।
ফ্যাঙইয়ো জানান যে তারা মূলত বিভিন্ন পণ্যের প্রচার বা প্রমোশনের অংশ হিসেবে উইচ্যাট নামক একটি চীনা প্ল্যাটফর্মে এই লাইভ সম্প্রচার করে থাকেন। তবে কেন তারা উত্তরার এই বিশেষ এলাকাটি বেছে নিয়েছেন এবং কেন একটানা ভিডিও করে যাচ্ছেন, সে বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে চাননি। একপর্যায়ে তিনি গাইড রিতুকেও ধমক দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যান। গাইড রিতু আক্তার জানান, তিনি এই কাজ করার জন্য প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পারিশ্রমিক পান। চীনা নাগরিকেরা উইচ্যাট এবং ডুয়িন বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে এসব ভিডিও আপলোড করে অর্থ উপার্জন করেন এবং বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে তাদের বিশেষ আগ্রহ থাকায় তারা এই এলাকাটি বেছে নিয়েছেন।
ভিডিও ধারণের সময় চীনা নাগরিকেরা নিজেদের ভাষায় নানা ধরনের বর্ণনা দিতে থাকেন, যা স্থানীয়রা বুঝতে না পারলেও তাদের ভঙ্গি দেখে বোঝা যায় তারা চারপাশের দৃশ্যের বিবরণ দিচ্ছেন। পরবর্তীতে চীনা ভাষা জানেন এমন চারজন বাংলাদেশির সহায়তায় এবং গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে অনুবাদ করে তাদের কথার সত্যতা যাচাই করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তারা উত্তরায় অবস্থান করলেও লাইভে দাবি করছেন যে তারা ভারতের নয়াদিল্লির কোনো স্থানে যুক্ত রয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা এমন মন্তব্য করছেন যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অত্যন্ত দরিদ্র, নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসবাস করে। এ ছাড়া বাংলাদেশি পুরুষদের হাতে সামান্য টাকা এলেই তার অপব্যবহার করা হয় বলেও তারা লাইভে প্রচার করছেন। যেসব নারী এই লাইভ পরিচালনা করেন, তাদের বলতে শোনা গেছে যে ভারতে বিবাহিত হওয়ার সুবাদে তারা বর্তমানে স্বামী-সংসার নিয়ে এই অঞ্চলে বসবাস করছেন।
গত ১ নভেম্বর উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের খালপাড়ে দাঁড়িয়ে মিয়ানমিয়ান নামের এক চীনা নারী টেকপাড়ার বিভিন্ন দৃশ্য ক্যামেরায় দেখাচ্ছিলেন। চীনের সিচুয়ান প্রদেশের এই নারী লাইভ সম্প্রচারে দাবি করেন যে এটি ভারতের নয়াদিল্লি এবং এখানকার বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর, যেখানে টিনের ঘরে একটি ফ্যান পর্যন্ত নেই। অত্যন্ত অনগ্রসর ও পরিচ্ছন্নতাহীন এই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা বলার পাশাপাশি তিনি ভারতীয় নারীরা কীভাবে শৌচাগার ব্যবহার করেন, তার একটি মনগড়া বর্ণনাও দিতে থাকেন।
টেকপাড়ার একটি ছোট সেতুর দুইপাশে অবস্থিত চায়ের দোকানগুলোতে ওয়াং ওয়েই নামের আরেক চীনা নাগরিককে ভিডিও করতে দেখা যায়। তিনি লাইভ চলাকালীন চা পানরত গ্রাহকদের দেখিয়ে বলেন যে তারা গোমূত্রের চা পান করছেন। আরেকটি দোকানে গিয়ে তিনি দাবি করেন যে এখানকার চা তৈরির জন্য নদীর নোংরা পানি ব্যবহার করা হয় এবং স্থানীয়দের জীবনযাত্রা অত্যন্ত নোংরা প্রকৃতির। তবে সবার মন্তব্য নেতিবাচক ছিল না; লি ইয়াং নামের অপর এক চীনা নাগরিক স্থানীয় ভবনের এসিগুলো দেখিয়ে মন্তব্য করেন যে এখানকার বাসিন্দারাও এসি ব্যবহার করেন এবং অধিকাংশই চীনা ব্র্যান্ডের। তিনি কম দামে পাওয়া এসব চীনা পণ্য সম্পর্কে লাইভে দর্শকদের প্রশ্ন করে সঠিক উত্তরদাতাকে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেন।
উত্তরার প্রতিটি অলিগলিতে দীর্ঘ সময় ধরে এই চিত্র দেখা যাচ্ছে, যেখানে একই দিনে একই এলাকায় বারবার ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে। কেবল রাস্তাঘাট বা দোকানপাট নয়, আবাসিক ভবনের ভেতর এবং মানুষের ব্যক্তিগত ঘরের মধ্যেও এই বিদেশি নাগরিকেরা ঢুকে পড়ছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর