নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আসন্ন ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উদ্দেশ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উচ্চ পদটি ছেড়ে দেওয়ার தீவிர প্রস্তুতি নিচ্ছেন মার্কো রুবিও। সম্প্রতি কংগ্রেসের দুই কক্ষের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দল বড় ধরনের পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ার পর থেকেই হোয়াইট হাউসের শীর্ষ এই কূটনীতিকের পদত্যাগের গুঞ্জন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন ও ব্রিটিশ সরকারের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের বর্তমান প্রশাসনের নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেই তিনি এই পদক্ষেপ নেওয়ার কথা গভীরভাবে চিন্তা করছেন। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ এবং প্রশাসনের অন্যান্য নীতিগত ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে সম্ভাব্য রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও বেশি সুসংহত করতে চান তিনি।
মধ্যবর্তী এই নির্বাচনে টেক্সাস ও কানসাসের মতো ঐতিহ্যবাহী শক্তিশালী রক্ষণশীল নির্বাচনী এলাকাগুলোও ডেমোক্র্যাটদের দখলে চলে গেছে, যা বর্তমান প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে এক কঠিন সতর্কবার্তা দিয়েছে। এই বিপর্যয়ের পর থেকেই ট্রাম্পের বর্তমান মন্ত্রীসভার চার থেকে পাঁচজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার কথা বিবেচনা করছেন বলে জানা যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে গুঞ্জন রয়েছে যে, প্রশাসনের বর্তমান নীতিগুলোর সম্পূর্ণ দায় নিজের ওপর না নিয়ে বরং সেগুলোর দূরত্ব বজায় রাখা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এমনকি রুবিওর নিজস্ব ঘনিষ্ট সহযোগীরাও মনে করছেন যে, বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য একটি অত্যন্ত যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হবে।
রিপাবলিকান পার্টির ভেতরের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে বর্তমানে অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের তুলনায় বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে রয়েছেন এই শীর্ষ কূটনীতিক। এমনকি দলটির আরেক শক্তিশালী নেতা ও বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের তুলনায় তিনি জনপ্রিয়তার দিক থেকে অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। তবে চলমান মন্ত্রিত্বের পদে বহাল থাকা অবস্থায় সরাসরি কোনো জাতীয় নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে অতিমাত্রায় জড়িয়ে থাকাটা তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সাফল্যের পথে বড় ধরনের বাধার সৃষ্টি করতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই চরম শোচনীয় ফলের পর থেকেই ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে এই সংঘাতের সমস্ত দায় ইরান যুদ্ধের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ব্রিটিশ সরকার ও রিপাবলিকান দলের ভেতরের একটি প্রভাবশালী অংশ মনে করছেন যে, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রধান দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও রুবিও এতদিন মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের বিষয়ে বেশ নীরব ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে গেছেন। ইতিমধ্যে তিনি তিনজন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করেছেন এবং তাদের সবার ওপরই নিজের কর্মদক্ষতার গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। যুক্তরাজ্যের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র দ্য ইনডিপেনডেন্টকে নিশ্চিত করেছে যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই হারের ধাক্কায় তিনি আর বর্তমান পদে টিকে থাকবেন না বলেই তারা ধারণা করছে। তারা আশা প্রকাশ করেছে যে, তিনি খুব শীঘ্রই হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব ছেড়ে একজন শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে সরাসরি নির্বাচনী ময়দানে অবতীর্ণ হবেন।
সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে বর্তমান প্রশাসনের নীতিগুলো নিয়ে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে এবং অনেকে মানচিত্রে নির্দিষ্ট করে ইরানের অবস্থানও বলতে পারেন না। আকাশচুম্বী জ্বালানি তেলের দাম সাধারণ মানুষকে ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে এবং তারা এই অপ্রয়োজনীয় সামরিক সংঘাত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। ডেমোক্র্যাটরা আইনসভার উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিলে ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন করার মতো বড় ধরনের উদ্যোগ শুরু হতে পারে। এই কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্বেচ্ছায় টিকে থাকার মতো ঝুঁকি কেউ নিতে চাইছে না বলেই সূত্রগুলো দাবি করছে।
ফ্লোরিডার একটি নিরাপদ সিনেট আসনের মাধ্যমে আমেরিকার শীর্ষ কূটনীতিক হিসেবে আবির্ভূত হওয়া মার্কো রুবিও একসময় বর্তমান প্রেসিডেন্টের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বৃত্তে নিজের শক্তিশালী স্থান করে নিয়েছেন। অথচ আজ থেকে প্রায় এক দশক আগের প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়ের সময় এই একই নেতার সঙ্গে তাঁর চরম তিক্ত রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছিল। একসময়ে যাঁকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত অবজ্ঞার সুরে উপহাস করেছিলেন, তিনিই পরবর্তীতে হোয়াইট হাউসের অন্দরমহলে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রয়াত হেনরি কিঞ্জারের পর তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি যুগপৎভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার বিশাল দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করে আসছেন।
দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনের একদম শুরুর দিকে মার্কিন এই কূটনীতিককে ভারপ্রাপ্ত আর্কাইভিস্ট এবং ইউএসএআইডির প্রধানের মতো অতিরিক্ত কিছু গুরুদায়িত্বও প্রদান করা হয়েছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ তিন মাস অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারপ্রাপ্ত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদেও বসানো হয়। তবে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাঁর ব্যাপক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও পররাষ্ট্রনীতির অনেক মৌলিক বিষয় থেকেই তাঁকে বর্তমানে অনেকটা দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক নীতি কিংবা পূর্ব ইউরোপের সংঘাত নিরসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোতে তাঁকে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে।
শান্তি মিশনের বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভেন উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের আপন জামাতা জ্যারেড কুশারের মতো অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের হাতেই এই জটিল কূটনৈতিক বিষয়গুলোর মূল দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও হোয়াইট হাউসের ক্ষমতার শীর্ষ কেন্দ্রবিন্দুতে তাঁর সরব উপস্থিতি তাঁকে উত্তরসূরি হিসেবে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার দারুণ সুযোগ করে দিয়েছে। এখন তিনি যদি আগামী মেয়াদের লড়াইয়ে নামার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তবে এই সুবিশাল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁকে অনেকটাই এগিয়ে রাখবে। তবে প্রচারণায় নামলে ল্যাটিন আমেরিকা অঞ্চলের বেশ কিছু বিতর্কিত নীতি নিয়ে তাঁকে তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে।
ক্যারিবীয় অঞ্চলের জলসীমায় মাদকবাহী সন্দেহে ছোট ছোট নৌযানের ওপর চালানো বিমান হামলাগুলোকে সমালোচকেরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করে আসছে। এছাড়া বিগত জানুয়ারি মাসে সামরিক বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার শীর্ষ নেতা নিকোলা মাদুরোকে জোরপূর্বক তুলে এনে নিউইয়র্কে বন্দি করার ঘটনাটি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। হোয়াইট হাউসের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের যে গোপন ও ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তার সার্বিক তত্ত্বাবধানেও তিনি অত্যন্ত মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর