নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কঠোর নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক এই খাদ্য উপাদান গ্রহণের মাত্রা পাঁচ গ্রামের নিচে থাকা উচিত, যা মূলত এক চা-চামচেরও কম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই ভোগের গড় পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছে। বিগত দিনে পরিচালিত বিশেষ প্রস্রাব পরীক্ষার জরিপের তথ্য বলছে, এ দেশের সাধারণ মানুষ গড়ে প্রতিদিন প্রায় নয় দশমিক সাত গ্রাম করে সোডিয়ামযুক্ত এই উপাদানটি গ্রহণ করছেন।
ভাতের থালা সামনে আসামাত্রই অনেকে অভ্যাসবশত খাবারে অতিরিক্ত লবণ ছড়িয়ে নেন। এমনকি রান্নায় পরিমিত ব্যবহারের পরও এই প্রবণতা দেখা যায়। প্রতিদিনের এমন ছোটখাটো অভ্যাসগুলোই পরবর্তীতে ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য প্রকাশ অনুযায়ী, খাবারে উচ্চমাত্রার এই উপাদানের উপস্থিতির কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় চব্বিশ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। বর্তমান সময়ে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অসংক্রামক রোগগুলো শীর্ষে অবস্থান করছে। এর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদযন্ত্রের জটিলতা এবং কিডনির রোগ অন্যতম প্রধান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
খাবারে এই উপাদানের ব্যবহার হ্রাস করাকে কোনো বিশেষ খাদ্যাভ্যাস বা কেবল ওজন নিয়ন্ত্রণের উপায় হিসেবে ভাবলে চলবে না। বরং সুস্থ জীবনযাপন নিশ্চিত করার স্বার্থে এটি অত্যন্ত সহজ ও কার্যকর একটি প্রতিরোধমূলক কৌশল। এই পরিবর্তনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে আনা প্রয়োজন। বিস্কুট, চিপস, চানাচুর, নিমকি, সসেজ, নাগেটস, টিনজাত খাদ্য, ইনস্ট্যান্ট নুডলসের মসলা, স্যুপ মিক্স, লোনা ইলিশ, আচার, চাটনি এবং নানা ধরনের সসে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম থাকতে পারে। ফাস্টফুড জাতীয় খাবারের তালিকায়ও প্রচুর বাড়তি এই উপাদান পাওয়া যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ জাতীয় খাবারে লবণের উপস্থিতি সচরাচর খালি চোখে দেখা যায় না। বাজারের প্যাকেটজাত পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নমুনায় এই উপাদানের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত। এছাড়া বেশ কিছু পণ্যের গায়ে মোড়কে যে হিসাব লেখা থাকে, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি পরিমাণ পাওয়া যায়। তাই মোড়কের লেবেলের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে তাজা এবং ঘরের তৈরি খাবার বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মুড়ি, চিড়া, খই, সেদ্ধ ছোলা, তাজা মাছ-মাংস ও ফলমূল হতে পারে এর চমৎকার বিকল্প। বিকেলের নাস্তায় বিস্কুটের পরিবর্তে মুড়ি কিংবা ঘরে তৈরি পিঠা খাওয়া যেতে পারে।
অনেকের মাঝেই একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, এই উপাদান ছাড়া রান্নায় কোনো স্বাদ থাকে না। খাবারের স্বাদ নষ্ট হয়ে গেলে পুষ্টিকর ঘরের খাবারের প্রতি অনীহা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এর ফলে মানুষ বাইরের মুখরোচক ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ঝুঁকতে পারে। তবে হঠাৎ করে একেবারে বন্ধ না করে ধীরে ধীরে এর ব্যবহার কমানো উচিত। এর ফলে জিবের স্বাদ কোরকগুলো নতুন মাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম হবে। স্বাদ বাড়াতে প্রাকৃতিক উপাদান যেমন পেঁয়াজ, রসুন, ধনেপাতা, পুদিনাপাতা এবং লেবুর রস ব্যবহার করা যেতে পারে। সয়া সস বা টেস্টিং সল্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।
খাবারের এই উপাদানটি নিয়ে সমাজে বেশ কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে যা অভ্যাস বদলাতে বাধা সৃষ্টি করে। অনেকেই মনে করেন কাঁচা অবস্থায় এটি ক্ষতিকর হলেও রান্না করা বা ভাজলে তার ক্ষতিকর প্রভাব থাকে না। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল, কারণ যেকোনোভাবেই খাওয়া হোক না কেন, এর ভেতরের সোডিয়ামের মাত্রা একই থাকে। একইভাবে গোলাপি লবণ বা রক সল্টকে অনেকে সাধারণ লবণের চেয়ে স্বাস্থ্যকর মনে করলেও এতেও সোডিয়ামের উপস্থিতি রয়েছে। আয়োডিনযুক্ত সাধারণ লবণের পরিবর্তে এসব ব্যবহার করলে সোডিয়ামের পরিমাণ কমে না, বরং শরীরে আয়োডিনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
যাঁরা ইতোমধ্যেই ডায়াবেটিস, কিডনির জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা হৃদরোগে ভুগছেন, তাঁদের জন্য এই উপাদানের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া গর্ভাবস্থায় এবং অতিরিক্ত স্থূলতার ক্ষেত্রেও এটি নিয়ে সচেতন হওয়া আবশ্যক। অনেকে মনে করেন তরুণ বয়সে কোনো রোগ না থাকলে বাড়তি এই উপাদান গ্রহণে কোনো সমস্যা নেই। অথচ রোগ হওয়ার পর তা নিয়ন্ত্রণের চেয়ে শুরু থেকেই সচেতন থাকা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। দৈনন্দিন খাবারের সামান্য পরিবর্তন এবং বাড়তি এই উপাদান খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগের মাধ্যমেই সুস্থ জীবনের সূচনা হতে পারে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর