নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বাংলা সাহিত্যের জাপানি অনুবাদক কিওকো নিওয়া ২০০৬ সালের ৩ নভেম্বর প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে ‘আমার দেখা শামসুর রাহমান’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেছিলেন, যা পরবর্তীতে অনলাইনের পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ১৯৯৩ সালে কলকাতায় অবস্থানকালে তিনি প্রথমবারের মতো শামসুর রাহমানের কবিতার বই পাঠ করেন। সে সময় বিভিন্ন কাগজপত্রে রিভিউ পড়ে তিনি দ্রুত দোকানে গিয়ে বইটি সংগ্রহ করেছিলেন।
বইটির নাম ছিল ‘হরিণের হাড়’। সেই কাব্যগ্রন্থকে কবির অজস্র রচনার মধ্যে সেরা বলা যায় কি না, তা নিয়ে তাঁর জানা না থাকলেও এবং কবির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা যে রয়েছে তা জানলেও, এই বইটি তাঁর কাছে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কারণ এই বইয়ের মাধ্যমেই তাঁর কাছে বাংলাদেশের কবিতার জগৎ উন্মুক্ত হয়েছিল এবং কবিতাগুলো তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
কলকাতা থেকে মুগ্ধ হয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করার পর থেকেই কিওকো নিওয়া একজন গবেষক হিসেবে জাপানে বাংলা সাহিত্যের বিস্তার ও পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং এ পর্যন্ত তাঁর কয়েকটি বই প্রকাশের সুযোগও হয়েছে। তবে একবার নিজের বিশ্বাসের ওপর কিছু অনুবাদ করার পরও যখন কোনো ব্যগ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছিল না, তখন হতাশা ও নিঃসঙ্গতা তাঁকে ঘিরে ধরেছিল।
সেই দুঃসময়ে তাঁর মনে পড়ে যায় শামসুর রাহমানের ‘শ্রোতা’ নামক কবিতাটির কথা, যেখানে একজন মানুষ কাউকে নিজের মনের কথা শোনানোর সুযোগ না পেয়ে বনের ভেতরে চলে যায় এবং গাছ, পাখি, নির্জনতা ও ‘বাংলা লিরিকের মত চাঁদ’ তাঁর শ্রোতা হয়ে ওঠে। তখন তাঁর মনে হয়েছিল তাঁর নিজের জন্যও এরাই শ্রোতা হতে পারে এবং সেই থেকে ‘বাংলা লিরিকের মত চাঁদ’-এর ওপর তাঁর বিশ্বাস কখনো হারায়নি।
ঠিক এই কারণেই যখন শামসুর রাহমানের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলো, তখন তিনি অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। গত বছর অর্থাৎ ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাপান ফাউন্ডেশনের কাজে ঢাকা ভ্রমণের সময় তাঁর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের কয়েকজন লেখকের সাক্ষাৎকার নেওয়া এবং তাঁর বিশেষ ইচ্ছা ছিল প্রখ্যাত কবির সঙ্গে দেখা করার।
বিখ্যাত প্রকাশক মফিদুল হক তাঁকে কবির বাড়িতে নিয়ে যান এবং সেটাই ছিল তাঁর সঙ্গে কিওকো নিওয়ার প্রথম এবং শেষ সাক্ষাৎকার। কবির বয়স হয়ে যাওয়ায় এবং তাঁকে নিজের বাবার মতো বয়স্ক মনে হওয়ায় কল্পনার চেয়েও বয়স্ক রূপ দেখে তাঁর মনে কিছু কষ্ট হয়েছিল, এমনকি নিজের বইয়ে স্বাক্ষর করার সময় কবির হাতও কাঁপছিল।
বিদেশির অপরিপক্ব বাংলা ভাষা শুনতে শুরুতে কবির হয়তো কিছুটা অসুবিধা হয়েছিল, তবে কথা বলা শুরু করার পর তাঁর অসাধারণ শক্তি পুনরায় ফিরে আসতে দেখা গিয়েছিল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই কবির বয়স হওয়ার কথা সবাই ভুলে গিয়েছিলেন। কবি তাঁকে প্রথম কবিতা ছাপার কাহিনীর কথা শুনিয়েছিলেন, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে উনিশশো উনপঞ্চচল্লিশ সালে লেখা ‘১৯৪৯’ নামের একটু দীর্ঘ কবিতাটি নিয়ে তিনি ভয়ে ভয়ে পত্রিকার অফিসে গিয়েছিলেন।
কাঁচা-পাকা বড় চুল এবং খদ্দরের হাতকাটা জামা পরিহিত সুদর্শন এক ভদ্রলোক সেখানে বসে ছিলেন এবং নিচে ছিল প্রেস। ভয়ে ভয়ে কবিতাটি তাঁর হাতে দিলে তিনি প্রথমে খুব একটা গ্রাহ্য না করে টেবিলের ওপর রেখে দিয়েছিলেন এবং বসতে না বললেও তরুণ শামসুর রাহমান দাঁড়িয়ে ছিলেন।
थोড়া সময় পর লেখাটির দিকে দৃষ্টি দিয়ে ভদ্রলোক পড়া শুরু করেন এবং না তাকিয়েই ইশারা করে তাঁকে বসতে বলেন, এরপর কবিতাটি পড়ে তিনি জানান যে সামনের সপ্তাহেই এটি ছাপা হবে এবং এভাবেই তাঁর কবিজীবনের শুরু হয়েছিল। কবিতা রচনার প্রেরণা ও উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে কবি এক শব্দে উত্তর দিয়েছিলেন ‘জীবন’, এবং এর সঙ্গে যোগ করেছিলেন ‘মরণ, ভালোবাসা, কখনোবা ঘৃণা’।
সেই মুহূর্তগুলোতে কবির চেহারা উজ্জ্বল হয়ে কিশোরের মতো দেখাচ্ছিল এবং তিনি বলেছিলেন যে প্রথম লেখার সময় মন যা চেয়েছে তা-ই লিখেছেন এবং আর্টিস্টিকভাবে যা অনুভব করেছেন, সেটাই ফুটিয়ে তুলেছেন। এমন একসময়ে তাঁর অফিসের প্রবেশে ভয় পাওয়া এবং অচেনা থাকার বিষয়টি আজ বিশ্বাস করা কঠিন মনে হলেও, সবাইকে যে লেখা দিয়েই শুরু করতে হয় তা বলাই বাহুল্য।
বাংলাদেশের তরুণ কবিদের সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে অনেক নতুন কবি আসলেও সবাই লেখালেখিতে টিকে থাকেন না এবং অনেকে না বুঝে চমক সৃষ্টির মনোভাব নিয়ে লিখে ব্যাখ্যা চাইতে এলে আবোলতাবোল কথা বলেন, তবে তাদের মধ্যে কয়েকজন বেশ ভালো লিখে কবিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তরুণ, যুবক ও বৃদ্ধ সবার পছন্দের প্রতিফলন হিসেবে পুরস্কার পাওয়ার ঘটনায় কবির সরল উল্লাস প্রকাশ দেখে অনুবাদক আনন্দিত হয়েছিলেন এবং কবি যে একজন অকপট মানুষ ছিলেন তাও তিনি উল্লেখ করেন।
সবশেষে কিওকো নিওয়া তাঁর কবিতার অনুবাদ করার অনুমতি চাইলে কবি তাঁকে সানন্দে সেই অনুমতি প্রদান করেন এবং এর কয়েক মাস পরেই জাপানে বাংলাদেশের একটি কবিতা সংকলন প্রকাশের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়, যেখানে শামসুর রাহমান প্রধান কবি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। আগামী বছর বইটি প্রকাশিত হলে কবির কাছে পুনরায় যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও সেই সুযোগ আর না থাকায় তিনি এখন গভীর দুঃখ অনুভব করছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর