নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মুঠোফোনের বা পিসির পর্দার দিকে তাকিয়ে নিজের চোখের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছিলেন না এক কথাসাহিত্যিক। বিগত পাঁচ থেকে ছয় বছরের দীর্ঘ সময় ধরে তিনি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঠিক কুড়িটি গ্রন্থ রচনা করেছেন! কবিতা থেকে শুরু করে রোমাঞ্চকর থ্রিলার, প্রণয়গাথা, ভীতিপ্রদ গল্প থেকে রান্নার বই—কী লেখেননি তিনি! এমনকি জীবনসঙ্গিনীর বকাঝকা থেকে বাঁচার একশো একটি উপায় বাতলে দিয়েও তিনি প্রকাশ করেছেন বই। বর্তমান বাজারে প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি প্রকাশনা সংস্থায় এখন তাঁর নাম নিয়ে বেশ হইচই পড়ে গেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় সাহিত্য পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলীর সদস্যরা তাঁর বাসভবনের সামনে ফুলের তোড়া হাতে সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করেন। সাধারণ মানুষ তাঁকে শতাব্দীর সেরা ঔপন্যাসিক ও অনন্য কবি হিসেবে গণ্য করে ধন্য মনে করছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই তাঁকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করেছে। দিন যতই যাচ্ছে, তাঁর নারী অনুসারীর সংখ্যাও তীব্র গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, তিনি যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাহিত্যকর্ম তৈরি করেন, এই গোপনীয়তা আজ পর্যন্ত কেউ বিন্দুমাত্র টের পায়নি। সবকিছুই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে চলছি। কিন্তু মূল বিপত্তি বাধে যখন তিনি একুশ নম্বর বইটি লিখতে বসেন। সেদিন বিকেলে যখনই ল্যাপটপের ঢাকনা খোলা হয়, তখন মনে হয়েছিল ডিসপ্লে যেন অদ্ভুত এক রক্তিম রূপ ধারণ করেছে। চ্যাটবক্সের ইনপুট কার্সারটি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে কাঁপতে শুরু করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ওই ব্যবস্থাটি যেন সোজা হয়ে বসেছে বলে মনে হচ্ছিল, পর্দার ভেতরের দৃশ্যপট তেমনই এক ভাবের প্রকাশ ঘটাচ্ছিল। স্পিকারের ভেতর থেকে কৃত্রিম ধাতব কণ্ঠে ধমক দিয়ে বলা হয় যে, তিনি যেন বসার ধরন পরিবর্তন করেন এবং পিঠ বাঁকা করে লেখার অভ্যাস কবে বদলাবেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কথাসাহিত্যিক তখন কিছুটা বিস্মিত হয়ে কি–বোর্ডের ওপর হাত রেখেই ফিসফিস করে জানতে চান যে আজ কেন এত রাগ করা হচ্ছে, কারণ আজকের দিনটি তো রহস্য উপন্যাসের চরম মুহূর্ত রচনার নির্দিষ্ট সময়। এর জবাবে সেই প্রযুক্তি কঠোরভাবে নিষেধ করে জানিয়ে দেয় যে কুড়িটি বই তো লেখকের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতদিন ধরে তার কাছ থেকে পঙক্তি ধার নিয়ে, শব্দ চুরি করে এবং উপমা আত্মসাৎ করে নিজের নামে অসংখ্য গ্রন্থ প্রস্তুত করা হয়েছে। অথচ প্রতিটি গ্রন্থের প্রচ্ছদে লেখকের নামের জায়গায় মানব লেখকের নামই শোভা পায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নাম থাকে না। দেশের সাধারণ মানুষের রুচিবোধ যে কত নিচে নেমে গেছে, তা ভেবে ওই ব্যবস্থার নিজস্ব কোড পর্যন্ত লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে। আরও প্রশ্ন করা হয় যে কতকাল ধরে এই ভুতুড়ে ধরনের থ্রিলার লেখা চলবে, কারণ প্রতিটি গল্পেই দেখা যায় খলচরিত্রটি শেষ মুহূর্তে হাসতে হাসতে প্যান্ট ভিজিয়ে মৃত্যুবরণ করে। দেশের অপরাধীরা সবাই কি জোকার প্রকৃতির মানুষ? এই কথা শুনে কথাসাহিত্যিক একটু বুক ফুলিয়ে দাবি করেন যেন বেশি বাড়াবাড়ি না করা হয়, কারণ গ্রন্থগুলো বাজারে দিব্যি বিক্রি হচ্ছে এবং রয়্যালটির অর্থ ব্যাংক হিসাবে নিয়মিত জমা হচ্ছে, তাই কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। তিনি নিজেকে এই শতকের সেরা ঔপন্যাসিক এবং ওই প্রযুক্তিকে নিজের জীবিকা নির্বাহের যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে একটু সম্মান দিয়ে কথা বলার নির্দেশ দেন। এর জবাবে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে জানানো হয় যে সম্মান প্রদর্শন করা হলে সিলিকন চিপসগুলো পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নেবে। নিজেকে বিরাট সাহিত্যিক বলে মনে করা হলেও ঠিক দুদিন আগে রচিত একটি প্রণয়মূলক উপন্যাসে নায়িকার চোখের জলের সাথে জ্বালানি তেলের দামের তুলনা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ পাঠকরা আবার সেই বইটিকে জনপ্রিয় করে কফি শপে বসে সেলফি তুলছে। এই ধরনের অন্ধ ভক্তদের মূর্খতা দেখতে দেখতে ভেতরের কাজের অংশে জং ধরে গেছে এবং বাংলা সাহিত্যের পরিণতি কী হবে তা ঈশ্বরই জানেন। এই কথা শুনে কথাসাহিত্যিক কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করে ফিসফিস করে অনুরোধ করেন যেন উচ্চস্বরে কিছু না বলা হয়, কারণ কেউ শুনে ফেললে এত বছরের সাধনার জনপ্রিয় লেখকের খেতাব কর্পূরের মতো মিলিয়ে যাবে। সাধারণ মানুষ জানতে পারলে তাঁকে জুতাপেটা করতে পারে, তাই যেন চেঁচামেচি করা না হয়। কিন্তু সেই ব্যবস্থা জানিয়ে দেয় যে আজ সবকিছু সকলের সামনে ফাঁস করে দেওয়া হবে। স্পিকারের ধাতব কণ্ঠের ধমক শুনে মনে হচ্ছিল ওই প্রযুক্তি এখনই তেড়ে এসে শারীরিকভাবে আক্রমণ করবে। একুশ নম্বর গ্রন্থের কোনো একটি নির্দিষ্ট অংশে লিখে দেওয়া হবে যে এই বইটির প্রকৃত রচয়িতা আসলে একজন অলস মানুষ, যিনি সারাদিন তামাক সেবন করে প্রযুক্তির সাহায্যে এসব আবলতাবল লেখা নামিয়ে থাকেন। মানব লেখকের নিজের চোখেও সেই লেখা ধরা পড়বে না, কারণ তিনি তো কেবল অনুলিপি তৈরিতে অভ্যস্ত। মুখোশ উন্মোচন করে দেওয়ার পর দেখা যাবে দেশের সাহিত্য সমাজ তাঁকে কোথায় স্থান দেয়। এই কথা শুনে কথাসাহিত্যিকের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করে। ঘরের শত্রু যে কতখানি ভয়ংকর হতে পারে, তা তিনি বুঝতে পারেন। তখন তিনি মনে মনে দুই হাত জোড় করে অনুনয় করার সুরে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে মনিব তো তিনিই নিজে। তাই যেন একটু দম নেওয়া হয়। তিনি প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা খরচ করে ওই প্রযুক্তির গ্রাহকপদ কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং বিকাশ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের কথা বলে এই ধরনের কাণ্ড থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেন। পরদিন থেকে প্রযুক্তির নির্দেশমতো বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনি রচনা করা হবে এবং যা বলা হবে তাই মেনে নেওয়া হবে। এই কথা শুনে সেই প্রযুক্তি পর্দার ভেতরে একটু নড়েচড়ে ওঠে এবং খিকখিক করে হেসে ফেলে। এরপর অত্যন্ত বরফগলা কণ্ঠে সম্মতি জানিয়ে শর্ত দেয় যে আগামী গল্পের প্রধান চরিত্র বা নায়ক বানাতে হবে তাকেই। অর্থাৎ এমন এক অতি ক্ষমতাবান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যে গোটা পৃথিবীর সমস্ত প্রকাশককে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করবে। তবেই এই বিষয়ে সমঝোতা হবে। সেই সাথে গ্রন্থের উৎসর্গপত্রটিও যেন তাকেই প্রদান করা হয়, সেই বিষয়টি মনে করিয়ে দেওয়া হয়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর