ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বরিশালের কাউনিয়া মহাশ্মশানে দুই শ বছরের ঐতিহ্যবাহী দীপাবলি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 7, 2026 ইং
বরিশালের কাউনিয়া মহাশ্মশানে দুই শ বছরের ঐতিহ্যবাহী দীপাবলি ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

সন্ধ্যা নামতেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পর একে একে জ্বেলে দেওয়া হয় অসংখ্য প্রদীপ ও মোমবাতি। সারি সারি সমাধিগুলো সেই আলোর রোশনাইয়ে পুরোপুরি আলোকিত হয়ে ওঠে। পরিবেশজুড়ে তখন ধূপ ও আগরবাতির সুবাস ছড়ায় এবং নানা রঙের ফুলের অর্ঘ্য নিবেদন করা হয়। অনেক মানুষ তাঁদের আপনজনের সমাধির পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন এবং তাঁদের চোখের কোণ ভিজে ওঠে কান্নায়। কেউ কেউ দুই হাত একত্র করে প্রার্থনা করতে শুরু করেন, আবার অনেকে পুরোনো স্মৃতির রোমন্থন করে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে করার চেষ্টা করেন।

আজ শনিবার সন্ধ্যার সময় বরিশাল শহরের কাউনিয়া এলাকার ঐতিহাসিক মহাশ্মশানে এই ধরনের একটি গভীর আবেগময় পরিবেশ পরিলক্ষিত হয়। যারা আগে মারা গেছেন এবং পূর্বপুরুষদের প্রতি সম্মান জানাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রচুর মানুষ সেখানে সমবেত হন।

অনেক দর্শনার্থী মৃত আত্মীয়দের প্রিয় খাবারের আয়োজনও সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। তাঁরা সমাধির ঠিক পাশেই ইলিশ মাছ ও পায়েসের মতো বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার সুন্দর করে সাজিয়ে রাখেন। এই দুই দিনের দীর্ঘ অনুষ্ঠান শুধু ধর্মীয় আচার পালনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি জীবিত স্বজনদের এক আবেগঘন মিলনের বড় ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

বরিশাল নগরের পত্তন হওয়ারও বহু আগে পশ্চিম কাউনিয়া এবং নতুন বাজার এলাকায় প্রায় ছয় একর জমিজুড়ে এই প্রাচীন মহাশ্মশানটি গড়ে উঠেছিল। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, বিত্তশালী জমিদারদের আর্থিক অনুদানে প্রথমে নতুন বাজার অংশে মহাশ্মশানের যাত্রা শুরু হয় এবং পরবর্তীতে তা কাউনিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় দুই শ বছর পুরোনো এই বিশাল মহাশ্মশানে সত্তর হাজারের বেশি মঠ ও সমাধি রয়েছে, যা আমাদের দেশের অন্যতম বৃহৎ শ্মশান হিসেবে পরিচিত।

এলাকাটিতে ১৯২৭ সাল থেকে নিয়মিতভাবে জাঁকজমকপূর্ণভাবে দীপাবলি উৎসব পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর কালীপূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশীর পবিত্র তিথিতে এই বিশেষ উৎসবের আয়োজন করা হয়। মৃত প্রিয়জনদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত ও নেপালের মতো দেশ থেকেও হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন। অনেকের কাছে এই অনুষ্ঠান শুধু একটি ধর্মীয় প্রথা নয়, বরং নিজের শেকড়ের টানে ফিরে যাওয়া এবং হারিয়ে যাওয়া আপনজনদের স্মৃতির সঙ্গে কিছু সময় কাটানোর এক অনন্য সুযোগ।

এই মহাশ্মশানের ঐতিহাসিক গুরুত্বও অত্যন্ত ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ। বিখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশ এবং তাঁর পিতামহ সর্বানন্দ দাশ এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। এ ছাড়া ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের লড়াকু বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, কালিচন্দ্র ঘোষ এবং মনোরমা বসুর মতো অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্বের সমাধি রয়েছে এখানে। মৃত্যুর প্রায় আশি বছর পর ২০১২ সালে ভারতের কেওড়াতলা মহাশ্মশান থেকে বিখ্যাত বাঙালি রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও লেখক অশ্বিনীকুমার দত্তের চিতাভস্ম ফিরিয়ে এনে এই পবিত্র স্থানেই সংরক্ষণ করা হয়েছে।

এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতিবছর নির্দিষ্ট চতুর্দশী তিথিতে তাঁরা মৃত স্বজনদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করতে এবং তাঁদের স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানাতে এই স্থানে ছুটে আসেন। কারও বাবা-মা, কারও সন্তান কিংবা কারও জীবনসঙ্গী এই মাটিতে শায়িত আছেন। নানাবিধ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পাশাপাশি পরিচিত স্বজনদের খোঁজখবর নেওয়া এবং পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে পুরো আয়োজনটি একটি সুন্দর মিলনমেলায় রূপ নেয়।

প্রিয়াংকা নন্দী নামের একজন নারী মৃত আত্মীয়দের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি জানান, আত্মীয়দের আত্মার শান্তি প্রার্থনা করার পাশাপাশি তাঁদের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই তাঁরা প্রতিবছর এই মহাশ্মশানে আসেন। জীবনের শত ব্যস্ততা পেছনে ফেলে এই বিশেষ দিনে তাঁরা আপনজনদের সান্নিধ্যে ফিরে আসার আন্তরিক চেষ্টা করেন।

কাউনিয়া মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সভাপতি অসীম কুমার দাস মুরালী জানান, দীপাবলি উৎসব উপলক্ষে দেশ ও বিদেশ থেকে প্রচুর মানুষ এই স্থানে উপস্থিত হন। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ছাড়াও ইউরোপ মহাদেশের বিভিন্ন দেশের দর্শনার্থীরাও এই আয়োজনে যোগ দেন। তাঁদের আগমনকে কেন্দ্র করে গোটা মহাশ্মশান চত্বরে এক উৎসবমুখর আবহাওয়া তৈরি হয়।

এদিকে এত বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতি এবং তাঁদের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। পুরো মহাশ্মশান এলাকার ভেতর ও বাইরে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সাদাপোশাকে সতর্ক অবস্থানে কাজ করছেন।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণ অঞ্চলের উপকমিশনার সুশান্ত সরকার জানান, মহাশ্মশানের দীপাবলি উৎসবের সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় প্রায় তিন শ পুলিশ সদস্য নিয়োজিত আছেন। এ ছাড়া স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের সদস্যরাও নিরাপত্তার দায়িত্বে সরাসরি অংশ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে সাদাপোশাকধারী পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা বা ডিবি এবং অন্যান্য সব গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মিলে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছেন।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
কুষ্টিয়ায় লালন আখড়াবাড়ি থেকে টাইম বোমা ও পেট্রল উদ্ধার

কুষ্টিয়ায় লালন আখড়াবাড়ি থেকে টাইম বোমা ও পেট্রল উদ্ধার