নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির (এনএপিডি) মহাপরিচালক খায়রুল কবীর মেননের বিরুদ্ধে দুই মাসের একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ ১০টি ক্লাসের সীমা লঙ্ঘন করার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্সে তিনি নির্ধারিত সীমার তিন গুণ বেশি ক্লাস পরিচালনা করেছেন। পাশাপাশি, স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দুটি আলাদা কোর্সেও তাঁর ক্লাস নেওয়ার পরিমাণ নির্ধারিত সীমার প্রায় দ্বিগুণ ছিল।
প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সূত্র ও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সাধারণত বাইরের রিসোর্স পারসনদের মাধ্যমে বেশি ক্লাস নেওয়ার দীর্ঘদিনের রীতি চালু রয়েছে। কিন্তু মহাপরিচালক নিজে অধিকাংশ ক্লাস করায় বাইরের যোগ্য রিসোর্স পারসনরা ক্লাস নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একাডেমির সর্বোচ্চ পদে আসীন থাকায় কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা প্রকাশ্যে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আপত্তি বা প্রতিবাদ জানাতে সাহস পাচ্ছেন না। তাদের মতে, এই বিষয়টি কেবল আর্থিক সুবিধা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি স্পষ্টতই প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম ও নৈতিকতার বড় লঙ্ঘন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সরাসরি অধীন পরিচালিত জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি মূলত বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। ১৯৮০ সালে একটি বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে এটি রাজধানী ঢাকার নীলক্ষেতে নিজস্ব স্থায়ী ভবনে স্থানান্তরিত হয়। এর পরের বছরই এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউট হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং তখন থেকেই বিভিন্ন সংস্থার কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের কাজটি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে।
কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের নিয়ম অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত এই একাডেমির বোর্ড অব গভর্নরসের পঞ্চম সভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একাডেমির কোনো সদস্য অন্য কোনো বহিরাগত প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে পরিচালিত কোনো প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সর্বোচ্চ ১০টির বেশি ক্লাস পরিচালনা করতে পারবেন না। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম থেকে অর্জিত সম্মানী বা আয়ের ২০ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে হিসাব শাখায় জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এই জমাকৃত অর্থ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তা দিয়ে পরবর্তীতে একাডেমির কর্মীদের পেনশন তহবিল পরিচালিত হয়। উল্লেখ্য, এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
এদিকে গত ৯ জুলাই এনএপিডির ফ্যাকাল্টিদের পদমর্যাদা অনুযায়ী সেশনসংখ্যা নির্ধারণের লক্ষ্যে একটি পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠিত হয় এবং তাদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সুনির্দিষ্ট সুপারিশে বলা হয়েছিল যে, সচিব পদমর্যাদার বা প্রথম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা কোনো প্রশিক্ষণেই সর্বোচ্চ ১০টির বেশি সেশন পরিচালনা করতে পারবেন না। সভার কার্যবিবরণীতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, সেশন বণ্টনের ক্ষেত্রে সব সময় স্বচ্ছতা, পারস্পরিক ভারসাম্য এবং যথাযথ পদমর্যাদাভিত্তিক যৌক্তিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া নিজস্ব ফ্যাকাল্টি এবং বাইরের আমন্ত্রিত রিসোর্স পারসনদের মধ্যে সেশন বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি সঠিক সামঞ্জস্য রাখার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল।
বোর্ড অব গভর্নরসের পূর্বের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এবং একাডেমির অভ্যন্তরীণ কমিটির সাম্প্রতিক সুপারিশ—উভয় ক্ষেত্রেই সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার জন্য সর্বোচ্চ ১০টি ক্লাস নেওয়ার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান মহাপরিচালক নিজেই এসব নিয়মনীতি বা নির্দেশনার তোয়াক্কা করছেন না বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে এনএপিডির মহাপরিচালক খায়রুল কবীর মেনন প্রথম আলোকে জানান যে, মহাপরিচালক সর্বোচ্চ ১০টি ক্লাস পরিচালনা করবেন—এমন কোনো নিয়ম মেনে চলা তাঁর জন্য বাধ্যতামূলক নয়। বিগত বছরগুলোতেও এই ধরনের নিয়ম নিয়মিত অনুসরণ করা হয়নি এবং তাঁর আগের অন্য মহাপরিচালকেরা এর চেয়ে অনেক বেশি ক্লাস নিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
ক্লাস থেকে অর্জিত আয়ের ২০ শতাংশ অর্থ প্রতিষ্ঠানের হিসাব শাখায় জমা দেওয়ার প্রচলিত নিয়ম কেন মানা হচ্ছে না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, তাঁরা মূলত প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে এনপিডিতে প্রেষণে কর্মরত আছেন এবং এই প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী জনবল নন। নির্ধারিত বদলির আদেশ পেলে তাঁরা এখান থেকে চলে যাবেন এবং এই পেনশনের ফান্ড থেকে তাঁরা কোনো ধরনের আর্থিক সুফলও ভোগ করবেন না। এমন পরিস্থিতিতে কেন তারা অর্জিত সম্মানী বা আয়ের ২০ শতাংশ টাকা সেখানে জমা দেবেন, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, একটি ক্লাস সফলভাবে নেওয়ার আগে তাঁকে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়, গভীর প্রস্তুতি নিতে হয় এবং অনেক পরিশ্রম করতে হয়, ফলে সেখান থেকে সম্মানী গ্রহণ করায় কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। তবে বোর্ড অব গভর্ন্যান্সের আগামীতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বৈঠকে এই নিয়মগুলো সংশোধনের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তুলবেন বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে, এনএপিডির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে যে, অতীতে যাঁরা এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা কেউই কখনো এত অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়ার প্রবণতা দেখাননি। বরং পূর্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ নিয়মিত ক্লাসই নিতেন না এবং তাঁরা সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতেন প্রতিষ্ঠানের সার্বিক নীতি ও কৌশলগত উন্নয়নের ওপর। এ ছাড়া তারা সবসময় প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নের বিষয়টিতে সর্বোচ্চ জোর দিতেন।
গত ১৭ জুন খায়রুল কবীর মেনন আনুষ্ঠানিকভাবে এনএপিডির মহাপরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাঁর যোগদানের অব্যবহিত পরেই গত ১২ জুলাই নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের ৩৫তম বিশেষ বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স শুরু হয়েছিল, যা ৯ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত হয়। প্রায় দুই মাস ব্যাপ্তির এই কোর্সে তিনি একা মোট ৩০টি ক্লাস নেন এবং প্রতিটি ক্লাসের বিপরীতে তাঁর নির্ধারিত সম্মানীর পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬০০ টাকা।
শুধু নিয়মিত ক্লাসের বাইরেও ওই নির্দিষ্ট কোর্সে দুটি এক্সটেনশন লেকচার বা সম্প্রসারণ বক্তৃতার জন্য তিনি প্রতিটিতে ৫ হাজার টাকা করে এবং দুটি পৃথক সাক্ষাৎকারের জন্য প্রতিটিতে ৬ হাজার টাকা করে সম্মানী গ্রহণ করেন।
এর বাইরেও ঢাকার বাইরে আয়োজিত বিভিন্ন শিক্ষাসফরে সরাসরি অংশগ্রহণ, বই পর্যালোচনা সভা, এবং বিভিন্ন কর্মসূচির উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেও তিনি নিয়মিত সম্মানী গ্রহণ করেছেন। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ কোর্স থেকে তাঁর মোট অর্জিত আয়ের সঠিক ও সুনির্দিষ্ট পরিমাণ কত, তা একেবারে নির্দিষ্ট করে বলা অত্যন্ত কঠিন।
৩৫তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সে সরাসরি অংশগ্রহণকারী একজন সরকারি কর্মকর্তা প্রথম আলোকে নিজের মতামত জানিয়ে বলেন যে, মহাপরিচালক যেভাবে একের পর এক লাগাতার ক্লাস নিয়ে যাচ্ছিলেন, তা নিয়ে তিনি অসন্তোষ ও আপত্তি প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর ভাষ্যমতে, দুই মাসের দীর্ঘ একটি কোর্সে যদি বেশির ভাগ ক্লাস একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিই নিয়ে থাকেন, তবে তা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ঠেকে। এ ছাড়া সেখানে কেবল একজন ব্যক্তির একপাক্ষিক মতামতই শোনা যায়, যার ফলে প্রশিক্ষণার্থীদের নিজেদের জ্ঞান সমৃদ্ধ করার সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
একাডেমি সূত্রে আরও জানা যায় যে, ঠিক একই সময়ে স্বাস্থ্য ক্যাডারের নবীন কর্মকর্তাদের ১৩৮তম এবং ১৩৯তম বিশেষ বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স একযোগে পরিচালিত হচ্ছিল। গত ১৬ আগস্ট শুরু হয়ে কোর্স দুটি শেষ হয় ১৪ অক্টোবর এবং প্রতিটি কোর্সে মহাপরিচালক নিজে ১৬টি করে ক্লাস নেন।
এ ছাড়া ওই দুটি কোর্সের প্রতিটিতেই বই পর্যালোচনা সভা, বিভিন্ন প্রতিবেদন উপস্থাপন, সম্প্রসারণ বক্তৃতা, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, শিক্ষাসফরে অংশগ্রহণ, উপদেষ্টা হিসেবে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন এবং কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় তিনি স্বয়ং সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। শিক্ষাসফরে অংশগ্রহণ এবং সফর শেষ হওয়ার পর তা নিয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপনের বেলাতেও তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি ছিল। এই সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের প্রতিটির জন্যই আলাদা সম্মানীর সুব্যবস্থা রয়েছে। ফলে তাঁর চার মাসের সংক্ষিপ্ত দায়িত্বকালে মোট তিনটি প্রশিক্ষণ কোর্সের ক্লাস ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম থেকে তিনি ঠিক কত টাকা সম্মানী তুলেছেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি।
নির্ধারিত নীতিমালা ও নিয়ম অনুযায়ী, মোট তিনটি প্রশিক্ষণ কোর্সে মহাপরিচালকের সর্বোচ্চ ৩০টি ক্লাস নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তিনি সেখানে মোট ৬২টি ক্লাস পরিচালনা করেছেন। এর বাইরেও অন্যান্য বিভিন্ন সেশন ও অতিরিক্ত কার্যক্রম মিলিয়ে তাঁর মোট ক্লাস এবং কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সংখ্যা অন্তত ৭৫টিতে দাঁড়ায়। এমনকি ওই একই সময়ে অনুষ্ঠিত সান্ধ্যকালীন বিভিন্ন ছোট কোর্সের কার্যক্রমেও তিনি সীমিত পরিসরে ক্লাস পরিচালনা করেছেন।
স্বাস্থ্য ক্যাডারের এই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া চারজন নবীন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান যে, মহাপরিচালক অন্যান্যদের তুলনায় অনেক বেশি ক্লাস নিতেন। তবে ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাঁরা আগে থেকে পুরোপুরি অবগত ছিলেন না।
পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরিষ্কার দেখা যায় যে, মহাপরিচালক তাঁর এই দীর্ঘ কর্মপরিকল্পনায় দুর্নীতি প্রতিরোধ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য শিষ্টাচার ও আদব-কায়দা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নেতৃত্ব গঠন, তথ্য অধিকার আইন এবং সামগ্রিক সরকারি কর্মচারী আইনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক ও ধারা নিয়ে বেশ কিছু ক্লাস পরিচালনা করেছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর