নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
প্রখ্যাত স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো এককালে মন্তব্য করেছিলেন যে, তাঁর জীবন থেকে বিদায় নিলে ফ্রাঁসোয়া জিলোর সামনে পড়ে থাকবে জনমানবহীন এক বিশাল মরুভূমি। তবে এই দূরদর্শিতা শেষ পর্যন্ত সত্যি প্রমাণিত হয়নি। স্বকীয় প্রতিভার অধিকারী এই শিল্পী ১০১ বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। পিকাসোর সঙ্গে তাঁর প্রায় এক দশকের সম্পর্কের ইতি ঘটার পরেও তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনে যুক্ত হয়েছিল আরও বহু নতুন অধ্যায়, যার মধ্যে ছিল নিজস্ব শিল্পকর্ম সৃষ্টি, তিন সন্তানের লালনপালন, দুটি বিয়ে, একটি দীর্ঘস্থায়ী দাম্পত্য জীবন এবং নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ে টিকে থাকার তীব্র লড়াই।
১৯৫১ সালে অঙ্কিত 'ওম্যান ড্রয়িং' নামক একটি প্রতিকৃতিতে দেখা যায়, একজন পুরুষ শিল্পী কোনো এক নারীকে ফুটিয়ে তুলছেন এবং সেই নারী নিজের কর্মমগ্নতায় নিমগ্ন। এই ছবিটিতে জিলো কেবল পিকাসোর একজন সাধারণ প্রিয়ার আসনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তিনি সেখানে সম্পূর্ণ একজন স্বাধীন শিল্পী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ছবিটি পুনরায় অবলোকন করতে গিয়ে জিলোর নজরে আসে ক্যানভাসে আঁকা একটি পেনসিলের সঙ্গে বাঁধা সুতোর খুঁটটি। জিলোর স্পষ্ট বক্তব্য ছিল যে, তিনি কখনোই বাস্তবে ওইভাবে পেনসিল ব্যবহার করতেন না, যার অর্থ দাঁড়ায় পিকাসো কেবল সামনে যা দেখেছেন তা হুবহু তুলে ধরেননি, বরং নিজের মনের কল্পনা থেকেও কিছু উপাদান এতে সংযুক্ত করেছিলেন।
পিকাসো তাঁর তুলির আঁচড়ে জিলোকে নানা রূপে ও ভঙ্গিমায় ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। কখনো তাঁকে ফুল, কখনো বা ফল কিংবা বর্ম পরিহিত কোনো যোদ্ধা হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এমনকি পিকাসো একবার তাঁকে একটি গলদা চিংড়ির সঙ্গেও তুলনা করেছিলেন এই যুক্তিতে যে, জিলোর শরীরের কঙ্কাল যেন বহিরাবরণে থেকে তাঁকে সুরক্ষা দেয়। এই সমস্ত পুরোনো স্মৃতির রোমন্থন করতে গিয়ে জিলো সবসময় মৃদু হাসতেন। অন্যের শিল্পকর্মের ভেতরে নিজের অবয়ব দেখার অদ্ভুত ক্ষমতা তাঁর ছিল, কিন্তু সেই ছবির গণ্ডির ভেতর নিজের আসল পরিচয়কে আজীবন আটকে রাখার কোনো মানসিক ইচ্ছাই তাঁর মধ্যে কাজ করেনি।
সারা দুনিয়ায় তাঁর নামের পাশে সবচেয়ে পরিচিত এবং জোরালো তকমাটি হলো তিনি পাবলো পিকাসোর প্রেমিকা ছিলেন। অথচ এর বাইরেও ফ্রাঁসোয়া জিলো নিজের স্বতন্ত্র শিল্পীসত্তায় পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত একজন মানুষ হিসেবে বেঁচে ছিলেন। পিকাসোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকভাবে ছেদ ঘটেছিল ১৯৫৩ সালে। এরপর তাঁর জীবনের ক্যানভাসে অতিবাহিত হয়েছে আরও দীর্ঘ সাতটি দশক। এই সুবিশাল সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে এসেছে নতুন সম্পর্ক, ভিন্ন দেশ, মৌলিক শিল্পকর্মের সৃষ্টি, সন্তানদের বেড়ে ওঠার দৃশ্যপট এবং সর্বোপরি তাঁর নিজের কাজের আলাদা স্বতন্ত্র স্বীকৃতি।
ঘটনাটি ছিল ১৯৪৩ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত প্যারিস শহরের, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দখলদারিতে তখন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। সেই সময়ের একদিন ২১ বছরের তরুণী ফ্রাঁসোয়া জিলো তাঁর স্কুলজীবনের সহপাঠী তথা শিল্পী জেনেভিয়েভ আলিকো এবং অভিনেতা আলাঁ কুনিকে সঙ্গে নিয়ে একটি রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্নভোজন করতে গিয়েছিলেন। একই স্থানে কাকতালীয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন ৬১ বছর বয়সি খ্যাতনামা পাবলো পিকাসো, যাঁর সঙ্গে তখন ছিলেন তাঁর তৎকালীন সঙ্গী দোরা মার। পিকাসো নিজে উদ্যোগী হয়ে তাঁদের টেবিলে এক বাটি সুস্বাদু চেরি ফল নিয়ে উপস্থিত হন এবং সেই মাধ্যমেই তাঁদের মধ্যে প্রথম পরিচয় ও আলাপচারিতা শুরু হয়।
তাঁদের দুজনের বয়সের ব্যবধান ছিল দীর্ঘ চল্লিশ বছরের। একদিকে তখন আধুনিক শিল্পজগতের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং আলোচিত নামগুলোর একজন ছিলেন পিকাসো, আর অন্যদিকে ছিলেন এক তরুণী যিনি কেবল শিল্পী হওয়ার তীব্র স্বপ্ন বুকে নিয়ে সামনে এগিয়ে চলেছেন। জিলোর নিজের শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল প্যারিসের এক ধনাঢ্য ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে। তাঁর শ্রদ্ধেয় বাবা ছিলেন একজন পেশাদার কৃষিবিজ্ঞানী এবং মা ছিলেন দক্ষ মৃৎশিল্পী। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই তিনি মনেপ্রাণে স্থির করে ফেলেছিলেন যে তিনি ভবিষ্যতে একজন পুরোদস্তুর শিল্পী হবেন। যদিও তাঁর বাবার একান্ত ইচ্ছে ছিল মেয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা করুক, কিন্তু যুদ্ধের সেই ভয়াবহ সময়ে প্যারিসে নাৎসিদের দখলদারত্ব পাকাপোক্ত হলে তিনি আইন পড়া চিরতরে বন্ধ করে দেন এবং চিত্রকর্ম আঁকাই তাঁর জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায়।
পিকাসোর প্রতি তাঁর আকর্ষণের পেছনে যেমন ব্যক্তিগত ভালোলাগা কাজ করেছিল, তেমনই সেই যুদ্ধকালীন কঠিন সময়েরও একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। জিলোর নিজস্ব বয়ান অনুযায়ী, যদি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তাঁদের এই পরিচয় হতো, তবে সম্ভবত তাঁদের এই সম্পর্কটি কখনোই গড়ে উঠত না। সেই সংকটময় সময়ে তাঁর সমবয়সি বহু পুরুষই বাধ্য হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে চলে গিয়েছিলেন। পিকাসো সমস্ত দখলদারত্ব এবং প্রতিকূলতার মাঝেও ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার যে সাহসিকতা দেখান, সেটাই জিলোকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তবে পিকাসোর নারীদের সঙ্গে সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর বিন্দুমাত্র অজ্ঞতা ছিল না, এবং তাঁকে কেন্দ্র করে তাঁর মনে কোনো ধরনের ভীতি বা অতিরিক্ত আচ্ছন্নতা কাজ করেনি।
পরবর্তী সময়ে ১৯৪৬ সালের দিকে তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে একসঙ্গে বসবাস শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের ঔরসে ও সংসারে ১৯৪৭ ও ১৯৪৯ সালে যথাক্রমে ক্লদ ও পালোমা নামের দুটি সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু একই ছাদের নিচে বসবাস করা মানেই যে দুজনের জীবনধারা সম্পূর্ণ এক হয়ে যাওয়া তা ছিল না। পিকাসোর জীবন ছিল বিপুল খ্যাতি, চারপাশের পরিচিতি এবং গোটা শিল্পজগতের ওপর তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যে ভরপুর। পক্ষান্তরে জিলো তখন সবেমাত্র নিজের শিল্পীজীবন গড়ে তোলার প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলেন। তিনি পিকাসোর সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত শিল্পকলা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করতেন, তাঁর কাজের সমালোচনা বা তর্কে লিপ্ত হতেন এবং তার পাশাপাশি নিজের ছবিও নিয়মিত এঁকে যেতেন।
পিকাসোর সান্নিধ্যে থাকার কারণে শিল্পজগতের বহু নামী ও গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তিনি নিজের শিল্পসৃষ্টির জন্য সবসময় একটি আলাদা ও স্বতন্ত্র জায়গা দাবি করতেন। পিকাসোর নিজস্ব শিল্পভাষার প্রতি তাঁর যেমন গভীর শ্রদ্ধা ছিল, ঠিক তেমনি নিজের রুচিশীলতা ও পছন্দের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টবাদী। নিজের কিশোরী বয়সে প্যারিসের এক আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে তিনি পিকাসোর বিখ্যাত 'গের্নিকা' দেখেছিলেন। একই সময়ে তাঁর চোখে পড়েছিল হেনরি মাতিসের অসাধারণ কাজগুলো। জিলো পরবর্তী সময়ে নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি সেদিন পিকাসোর শিল্পের চেয়ে বরং মাতিসের শিল্পেরই গভীরভাবে প্রেমে পড়েছিলেন।
হেনরি মাতিস ছিলেন তাঁর নিজের শিল্পচর্চার অন্যতম এক সুমহান প্রেরণা। রঙের বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করতে জিলো ভীষণ ভালোবাসতেন। নিজের সৃষ্টিশীল শিল্পকে তিনি তুলনা করতেন সুর বা সংগীতের সঙ্গে, যেখানে সবকিছু একেবারে সরাসরি মুখে বলে দিতে হয় না, বরং অনেক না-বলা কথা রঙের খেলা ও বিন্যাসের মাধ্যমে সহজেই ইঙ্গিত করা যায়। এছাড়া জর্জ ব্রাকের কাজও তাঁকে দারুণভাবে আকর্ষণ করত। ফলস্বরূপ, পিকাসোর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও জিলোর নিজস্ব শিল্পীসত্তার উৎস ও পরিধি ছিল অনেক বেশি বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়।
পিকাসো তাঁকে নানা সময়ে বিভিন্ন চিত্রে অমর করে রেখেছেন। যেমন ১৯৪৬ সালের দিকে আঁকা 'ফেম-ফ্লুর' বা নারী-ফুল ঘরানার একটি বিশেষ চিত্রে জিলোকে নীল ও সবুজ রঙের চমৎকার সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র অবয়বে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু জিলো নিজেকে কেবল পিকাসোর একজন মডেল বা অনুপ্রেরণা হিসেবে কখনো ভাবতেন না। তাঁর অগাধ বিশ্বাস ছিল যে শিল্প কখনো কোনো ছোঁয়াচে রোগের মতো নয় যা একজন থেকে অন্যজনের মাঝে এমনিতেই ছড়িয়ে পড়বে। কারো মধ্যে যদি প্রকৃত শিল্পীসত্তা থাকে, তবে তাকে নিজের মতো করেই তা বিকশিত করে তুলতে হয়।
অবশেষে ১৯৫৩ সালে নিজের দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে জিলো পিকাসোর সেই জাঁকজমকপূর্ণ সংসার চিরতরে ছেড়ে চলে যান। এতে পিকাসো স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। জিলোর বর্ণনা অনুযায়ী, পিকাসো তাঁকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে তাঁকে ছেড়ে চলে গেলে সামনে কেবল এক শূন্য মরুভূমি অপেক্ষা করছে। মানুষ ভবিষ্যতে কেবল এই কারণেই তাঁর প্রতি কৌতূহলী হবে যে তাঁর জীবন একসময় পিকাসোর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল, অন্য কোনো স্বাধীন পরিচয়ে তাঁকে কেউ কখনো ন্যূনতম গুরুত্ব দেবে না।
পিকাসোর এই ধরনের ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে লুকিয়ে ছিল তাঁর নিজস্ব খ্যাতির প্রতি এক ধরনের অন্ধ আত্মবিশ্বাস এবং সেই সঙ্গে জিলোর সমগ্র ভবিষ্যৎকে কেবল নিজের সঙ্গে সম্পর্কের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ করে দেখার মানসিকতা। কিন্তু জিলো সমস্ত অনিশ্চয়তা উপেক্ষা করে নিজের জীবন ও কাজের পূর্ণ অধিকার রক্ষার স্বার্থেই সেই সম্পর্কত্যাগের কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর প্রবল আশঙ্কা ছিল যে পিকাসোর ছায়ায় থেকে গেলে তিনি নিজের মূল সত্তা হারিয়ে ফেলবেন। বহু বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন যে পিকাসোর সঙ্গ যদি তিনি সেদিন না ছাড়তেন, তবে হয়তো তিনি ওই প্রার্থীর ব্যক্তিত্বের ভেতরেই চিরতরে বিলীন হয়ে যেতেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর