ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ইউরোপজুড়ে আবাসন সংকট ও ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে তীব্র বিক্ষোভ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 18, 2026 ইং
ইউরোপজুড়ে আবাসন সংকট ও ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে তীব্র বিক্ষোভ ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার লাগামছাড়া খরচ নিয়ে স্পেন ও ফ্রান্সের চলমান আন্দোলন এবার ইতালি ও পর্তুগালেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইতালির মিলানে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ। গত শনিবার মিলানের প্রধান এলাকায় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে একটি শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। কিন্তু কিছু সময় পর মুখোশধারীরা দাঙ্গা পুলিশের উদ্দেশে ইটপাটকেল ও রাস্তার ব্লক ছুড়তে শুরু করেন। এ সময় খাবারের দোকানের টেবিল দিয়ে বানানো প্রতিবন্ধকতাতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ বাহিনী। পরবর্তীতে ধারণ করা ছবিতে দেখা যায়, কারাবিনিয়েরি সামরিক পুলিশ বাহিনীর একটি গাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। লাপ্রেস বার্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘর্ষে কমপক্ষে দুজন পুলিশ সদস্য জখম হয়েছেন এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিসহ প্রায় ৫০ জনকে আটক করা হয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন যে প্রতিবাদ করার অধিকার সবার আছে, তবে জনপদে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া কোনো বৈধ অধিকার হতে পারে না। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি অভিযোগ করেন যে কিছু বিশৃঙ্খল মানুষ আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে, নিরাপত্তাকর্মীদের ওপর হামলা করেছে এবং গোটা জনপদকে জিম্মি করে রেখেছে।

মিলানের মধ্য-পন্থী মেয়র জিউসেপ্পে সালা জানিয়েছেন, আন্দোলনের পেছনের কারণগুলো স্পষ্ট হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা এবং শহরের সম্পত্তির ক্ষতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পর্তুগালের রাজধানী লিসবতেও আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন জোরালো রূপ নিয়েছে। শনিবার সেখানে আন্দোলনকারীরা তাঁবু গেড়ে অবস্থান নেন, ঠিক যেমনটি তিন সপ্তাহ আগে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে দেখা গিয়েছিল। পর্তুগালের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ শনিবারের বিশাল মিছিলে অংশ নেন। পরবর্তীতে রাতের দিকে লিসবনের পর্যটনবহুল রোসিও চত্বরে কয়েক শ মানুষ জড়ো হন।

চত্বরের মাঝখানে রাজা চতুর্থ পেদ্রোর মূর্তি ঘিরে বসে রাতভর গান গেয়ে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা। এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ৪৬ বছর বয়সী সমাজকর্মী এলেনা কস্তা জানান, দেশের যে সামাজিক অংশ কর প্রদান করে এবং যাদের মাধ্যমে রাষ্ট্র সচল থাকে, তারাই আজ আক্রমণের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে আবাসনের অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এলেনা আরও বলেন, এই পরিস্থিতির কারণেই সবাই একত্র হয়েছেন এবং তাদের মনে হচ্ছে তাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে।

লিসবনের আরেক অংশগ্রহণকারী আন্তোনিও মারগাদো বর্তমান মধ্য-ডানপন্থী সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। ৫২ বছর বয়সী এই প্রকৌশলী জানান, প্রশাসন বাড়িভাড়ার ওপর থেকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়েছে এবং বাড়ির মালিকদের সুরক্ষা দিন দিন বাড়ানো হচ্ছে। অথচ যেসব সাধারণ মানুষের আশ্রয়ের প্রয়োজন, তাদের সুরক্ষা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে আবাসনের খরচ বেড়েছে ১২৪ শতাংশ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ।

এই ব্যয়বৃদ্ধির মারাত্মক চাপ পড়ছে তরুণ সমাজ ও লিসবনের নাগরিকদের ওপর। দেশটির মোট ১ কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশই বৃহত্তর লিসবন মহানগর এলাকায় বসবাস করেন। লিসবনের এই কর্মসূচির আগে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় শহর পোর্তোয় আবাসনসংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যেখানে আগে থেকেই অনেকে তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। এর আগে প্রধান শ্রমিক সংগঠন সিজিটিপির আহ্বানে লিসবনে আরেকটি সমাবেশ হয়, যেখানে উন্নত সরকারি সুবিধা, পেনশন, মজুরি ও আবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের দাবি জানানো হয়। পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনেগ্রো জানিয়েছেন, সরকারি নীতির ত্রুটি নিয়ে মানুষ যে ক্ষোভ প্রকাশ করছে, তা সরকার উপলব্ধি করতে পারছে।

তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সতর্ক করে মন্টেনেগ্রো বলেন, সমাজের অননুমোদিত কোনো অস্থিতিশীলতা ও বিক্ষোভের সংস্কৃতি অন্য রাষ্ট্র থেকে এখানে আমদানির চেষ্টা করা উচিত নয়, যা সম্ভবত ফ্রান্সের সহিংসতার প্রতি ইঙ্গিত করে। একই সপ্তাহে আলবেনিয়াতেও বড় ধরনের সহিংস বিক্ষোভ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং চড়া টিউশন ফির প্রতিবাদে দেশটির প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবি তুলছেন আন্দোলনকারীরা। শনিবারের বিক্ষোভে পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর, পেট্রলবোমা, ধাতব বস্তু ও আতশবাজি নিক্ষেপ করা হয়।

যানবাহন ও ময়লার পাত্রে আগুন ধরিয়ে সেই জ্বলন্ত বস্তুগুলো দিয়ে পুলিশের গতি রোধ করার চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা। সহিংসতা চরম আকার ধারণ করায় প্রথমবারের মতো পুলিশ রাবার বুলেট ব্যবহার করে, যা সত্ত্বেও গভীর রাত পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত ছিল। এ সময় আদালত, ব্যাংক ও পোস্ট অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং বেশ কিছু ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আলবেনিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে, যার সূত্রপাত হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বিতর্কিত পর্যটন রিসোর্ট নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে।

অন্যদিকে স্পেনে বাড়িভাড়ার লাগামছাড়া বৃদ্ধি এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ গত মাসে চরম আকার ধারণ করে। এর পেছনে মূল অনুঘটক ছিল ৮৭ বছর বয়সী মারিয়া দেল কারমেন আবাসকাল নামের এক বৃদ্ধাকে তাঁর আবাস থেকে উচ্ছেদের ঘটনা, যিনি সম্প্রতি মারা গেছেন। একটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ওই বৃদ্ধার ফ্ল্যাট কিনে নেওয়ার পর ভাড়ার পরিমাণ ২৩০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানায়। নির্ধারিত সেই অতিরিক্ত ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়।

ওই নারীর মর্মান্তিক পরিণতি এবং এর মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হওয়া বিশাল আবাসনসংকট গোটা স্পেনজুড়ে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বেলে দেয়। মাদ্রিদের মূল এলাকায় তাঁবু খাটিয়ে শুরু হয় রাজপথের আন্দোলন। এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্বাধীন সরকার আবাসন প্রাপ্তি সহজতর ও মানুষের আবাসন অধিকার রক্ষার জন্য জরুরি কিছু প্রস্তাব পেশ করে। কিন্তু পার্লামেন্টের কংগ্রেসে ডান ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর বিরোধিতায় সেই প্রস্তাবগুলো বাতিল হয়ে যায়। এই পরিস্থিতির পর প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আগামী নভেম্বরের শেষ দিকে আগাম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। এদিকে ফ্রান্সে শনিবারের বিক্ষোভে ১২০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
নাটোরের লালপুরে নিখোঁজ হওয়ার ১৬ দিন পেরিয়ে গেলেও সন্ধান মেল

নাটোরের লালপুরে নিখোঁজ হওয়ার ১৬ দিন পেরিয়ে গেলেও সন্ধান মেল