ঢাকা | বঙ্গাব্দ

সংসদকে পাশ কাটিয়ে ১৫ বছরের জন্য দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে চট্টগ্রাম বন্দর টার্মিনাল হস্তান্তর

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 21, 2026 ইং
সংসদকে পাশ কাটিয়ে ১৫ বছরের জন্য দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে চট্টগ্রাম বন্দর টার্মিনাল হস্তান্তর ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার পরও অর্থনীতি যখন কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থ হয় এবং মন্দা ও দুর্নীতির মুখোমুখি পড়ে, তখন তাকে অর্থনৈতিক পরিভাষায় সম্পদের অভিশাপ বা প্রাচুর্যের প্যারাডক্স বলা হয়ে থাকে। এই কাঠامোর আলোকে প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ কি তবে চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনা নিয়ে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে? একটি জলপথের গভীরতা যেমন তার নাব্যতার ওপর নির্ভর করে, তেমনই একটি দেশের প্রকৃত গভীরতা প্রকাশ পায় নীতি নির্ধারণের স্বচ্ছতার মাধ্যমে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণের বিষয়টিকে শুধু মুনাফা বা বিনিয়োগের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জনসাধারণের মৌলিক অধিকার এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির বিষয়টি।

সম্প্রতি দুবাইয়ের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি পরিচালনার ব্যাপারে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। অথচ এতবড় একটি জাতীয় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরও কেন জাতীয় সংসদে তা নিয়ে কোনো আলোচনা হলো না, সেই প্রশ্নটি সামনে এসেছে। দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের টার্মিনাল পরিচালনার শর্তাবলি, আর্থিক লাভ ও ক্ষতির পরিমাণ, কর্মরত শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে কেন সংসদীয় পর্যায়ে কোনো অর্থবহ বিতর্ক হলো না, তার সদুত্তর মেলেনি। এই প্রশ্ন তোলার অর্থ বিদেশি মূলধন বা বিনিয়োগের বিরোধিতা করা নয়, বরং কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলোতে জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের মতামত নিশ্চিত করার জোরালো দাবি।

আইনগত দিক থেকে চুক্তিটি বৈধ হতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রতিটি ধারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জনস্বার্থের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। বিশেষ করে বর্তমান প্রশাসনের মেয়াদ পেরিয়ে আগামী দেড় দশক পর্যন্ত যে চুক্তির প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে, সেখানে সংসদীয় আলোচনা কেবল একটি নিয়মরক্ষার ব্যাপার হতে পারে না; এটি সরকারের একটি সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি কারণ দীর্ঘসূত্রতা ও যোগাযোগগত সীমাবদ্ধতা আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা এসব জটিলতা নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারে এবং বিদেশি বিনিয়োগ মানেই দেশের স্বার্থের পরিপন্থী—এমন সংকীর্ণ ধারণার কোনো অবকাশ নেই। তবে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি প্রশ্নাতীত হতে পারে না।

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, এনসিটির আধুনিকায়ন ও পরিচালনার জন্য ওই বিদেশি প্রতিষ্ঠানটির ১৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রারম্ভিক এককালীন অর্থ হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষ পাঁচ কোটি ডলার পাওয়ার কথা রয়েছে এবং এই চুক্তির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ বছর। এছাড়া রাজস্ব ভাগের ক্ষেত্রে কনটেইনারপ্রতি আয়ের ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়ার কথা বলা হয়েছে, যার সঙ্গে যুক্ত থাকবে বার্ষিক নির্দিষ্ট ফি। তবে এই প্রাথমিক পরিসংখ্যানগুলো পুরো চুক্তিটি সঠিকভাবে মূল্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত নয়। এর পাশাপাশি জানতে হবে টার্মিনালটির বর্তমান আয় ও ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র, নতুন ব্যবস্থায় নিট আয়ের হিসাব, পরিচালন ব্যয় বহনের দায়িত্ব কার ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং মেয়াদ শেষে সম্পদ রাষ্ট্রের কাছে কোন অবস্থায় ফেরত আসবে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এনসিটি এমন একটি সচল টার্মিনাল যেখানে পূর্ব থেকেই সরকারের দুই হাজার ৭১২ কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। গত অর্থবছরজুড়ে এখানে প্রায় চৌদ্দ লাখ কনটেইনার ওঠানামার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে বর্তমান এই পরিকাঠামোর সঠিক আর্থিক মূল্যায়ন কীভাবে করা হলো, তা যাচাই করা আবশ্যক। দেশীয় ব্যবস্থাপনায় টার্মিনালটি সচল রাখার বিকল্প পদ্ধতিটি কি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল? রাষ্ট্রকে সম্ভাব্য আয়ের হিসাব দেখলেই চলবে না, বরং বিকল্প উপায়ে কী পরিমাণ আয় হতে পারত তারও সঠিক তুলনামূলক হিসাব থাকতে হবে।

এই পুরো বিষয়টি নিছক একটি বাণিজ্যিক চুক্তির সীমানা পেরিয়ে শাসনব্যবস্থার গণতান্ত্রিক রূপের প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রের বাজেট, নীতি ও নির্বাহী বিভাগের কাজের তদারকি করার মূল কেন্দ্র হলো জাতীয় সংসদ। প্রতিটি বাণিজ্যিক চুক্তি বাধ্যতামূলকভাবে সংসদে পাস করাতে হবে—এমন দাবি অযৌক্তিক হলেও দেশের বৃহত্তম টার্মিনালের মতো কৌশলগত সম্পদ নিয়ে সেখানে আলোচনা হওয়া উচিত কি না, তার উত্তর ইতিবাচক। সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদে বিদেশি চুক্তির ক্ষেত্রে সংসদে উপস্থাপনের বিধান থাকলেও রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা এবং আইনগত বাধ্যবাধকতা সম্পূর্ণ এক বিষয় নয়। বন্দরটির কৌশলগত গুরুত্ব সংসদীয় তদারকির দাবি জোরালো করলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না।

যদি বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনা হতো, তবে সরকারকে বেশ কিছু মৌলিক ও কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো। কেন উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এড়িয়ে সরাসরি নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই চুক্তিতে পৌঁছানো হলো, সেই উত্তর মেলেনি। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাব কেন বাতিল করা হলো এবং বিকল্প প্রস্তাবগুলোর বিস্তারিত মূল্যায়ন হয়েছিল কি না, তাও স্পষ্ট নয়। চুক্তির কোন গোপনীয় বিষয়গুলো প্রকাশ করা যাবে না এবং কেন—এসব প্রশ্ন সরকারের বিরোধিতার জন্য নয়, বরং জনস্বার্থ রক্ষার তাগিদেই প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন আবশ্যক এবং এতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে জবাবদিহি বিসর্জন দিতে হবে। উন্নয়ন যদি প্রকৃতপক্ষেই জনকল্যাণমুখী হয়, তবে তার পেছনের যুক্তি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সামনে উপস্থাপন করতে কোনো বাধা থাকার কথা নয়। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সংসদকে কেবল তথ্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করে, বরং নির্বাহী বিভাগের কর্মকাণ্ড যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া উচিত। বাণিজ্যিক গোপনীয়তার প্রয়োজন থাকতেই পারে, তবে তা যেন জবাবদিহি থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রধান ঢাল হয়ে না দাঁড়ায়।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
টানা তৃতীয় সপ্তাহে বিশ্ববাজারে কমলো স্বর্ণের দাম

টানা তৃতীয় সপ্তাহে বিশ্ববাজারে কমলো স্বর্ণের দাম