ঢাকা | বঙ্গাব্দ

এমবাপ্পের বিদ্রূপ মন্তব্য: বেইজিংয়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ক্লাবের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 29, 2026 ইং
এমবাপ্পের বিদ্রূপ মন্তব্য: বেইজিংয়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ক্লাবের ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

ফুটবল আঙিনায় কিলিয়ান এমবাপ্পের অসাধারণ নৈপুণ্যে চীনের অগণিত মানুষ মুগ্ধ হলেও, বর্তমানে এই ফরাসি ফরোয়ার্ড দেশটির চরম বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন। একসময়ে যাঁর হাসিমুখ ও ছবি কোমল পানীয়র বোতল কিংবা বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডে নিয়মিত দেখা যেত, সেখান থেকে এখন সেসব প্রচারসামগ্রী দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি স্প্যানিশ লা লিগার সম্প্রচার কার্যক্রমও সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে একটি বিশেষ রসিকতা ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য।

চীনের অত্যন্ত প্রভাবশালী সাবেক নেতা মাও সে তুংয়ের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে কৌতুক করে বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঢেউ ওঠার পর এমবাপ্পে নিজে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও সেই বিতর্ক থামেনি। ফলস্বরূপ, শেষ পর্যন্ত আজ বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের সাধারণ জনগণের কাছে ক্ষমা প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে তাঁর ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ।

ফ্রান্সের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য ব্রিজ’-এ অংশ নিয়ে একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় এই পুরো ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল। সেই অনুষ্ঠানে ২৭ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি নির্দিষ্ট মিম নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। যে মিমটিতে তাঁর নিজস্ব মুখাবয়ব এমন একজনের ছবির ওপর বসানো হয়েছিল, যাঁকে এমবাপ্পে সাক্ষাৎকারে ‘সম্ভবত চীনের কোনো স্বৈরশাসক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং তাঁর এই বক্তব্যের স্পষ্ট অভিমুখ ছিল মাও সে তুংয়ের দিকেই। ওই ছবি দেখে নিজের হাসি পাওয়ার কথা তিনি জানান, যদিও পরবর্তীতে সাক্ষাৎকারের সেই অংশটি অপসারণ করা হয়েছিল, তবে ততক্ষণে সামাজিক মাধ্যমে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেছে।

চীনের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মাও সে তুংকে নিয়ে যেকোনো ধরনের ব্যঙ্গ করা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং স্পর্শকাতর একটি বিষয়। বিভিন্ন ইতিহাসবিদের মতে, তাঁর শাসন আমলের বিভিন্ন নীতির কারণে অতীতে লাখ লাখ মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছিল। তবে বর্তমান চীনে তাঁকে নিয়ে জনসমক্ষে কৌতুক করা বা বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করা প্রায় নিষিদ্ধ একটি আচরণ। এমবাপ্পের এমন অবমাননাকর মন্তব্যে দারুণ ক্ষুব্ধ হয়ে দেশটির ফুটবলপ্রেমীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবল প্রতিবাদ শুরু করেন। এরপর মঙ্গলবার ফরাসি, চীনা এবং ইংরেজি এই তিনটি ভিন্ন ভাষায় ক্ষমা চেয়ে এমবাপ্পে জানান যে তাঁর মন্তব্যটি ছিল সম্পূর্ণ অবিবেচনাপ্রসূত এবং তিনি এখন বুঝতে পারছেন এতে চীনের নাগরিকসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসকারী চীনা সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ গভীরভাবে কষ্ট পেয়েছেন।

এই ঘটনার পর আজ বিবৃতি প্রকাশ করেছে ১৫ বারের মর্যাদাপূর্ণ ইউরোপ-সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ। তাদের সেই বিবৃতিতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয় যে, তাদের দলের খেলোয়াড় কিলিয়ান এমবাপ্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে যদি চীনের জনগণ কোনোভাবে আহত হয়ে থাকেন, তবে রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাব আন্তরিকভাবে তাঁদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছে।

ক্লাবের দেওয়া ওই বিবৃতিতে আরও জানানো হয় যে, কিলিয়ান এমবাপ্পে প্রকাশ্যে যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাব সম্পূর্ণভাবে তার সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করছে। খেলোয়াড় নিজে তাঁর এই ভুলের জন্য গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন এবং চীনের মহান জনগণের প্রতি তাঁর অন্তিম শ্রদ্ধাবোধের বিষয়টি পুনরায় স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন।

বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে মুখ খুলেছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও। আজ অনুষ্ঠিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র গুও জিয়াকুন গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে ক্ষমা চেয়েছেন, বেইজিং সরকার সেটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

তবে এমবাপ্পে বা তাঁর ক্লাব ক্ষমা প্রার্থনা করলেই যে সব পরিস্থিতি রাতারাতি আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা নেই। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির মূল তত্ত্বাবধানকারী প্রতিষ্ঠান সিএমজি ইতোমধ্যে স্প্যানিশ লা লিগার ম্যাচগুলোর সম্প্রচার কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের পরপরই বিশ্বজুড়ে আর্থিক দিক থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ধনী এই ফুটবল লিগের জন্য এটি একটি বিরাট বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এদিকে লা লিগা কর্তৃপক্ষও মঙ্গলবার একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে, এমবাপ্পের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যে চীনের সমর্থকেরা যে মানসিক কষ্ট পেয়েছেন, তাতে তারাও গভীরভাবে ব্যথিত।

বাণিজ্যিক জগতেও এমবাপ্পের এই বিতর্কের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এবারের বিশ্বকাপের বিশেষ সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমবাপ্পের ছবি দিয়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিল চীনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পানীয় প্রস্তুতকারক কোম্পানি ডংপেং। কিন্তু মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানটি এক ঘোষণায় ফরাসি এই তারকার সঙ্গে তাদের সমস্ত বাণিজ্যিক চুক্তি বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঠিক একই রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে দেশের নামী দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মেংনিউ এবং মিল্কগ্রাউন্ড। চীনের প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস তাদের একটি বিশেষ সম্পাদকীয়তে কড়া ভাষায় লিখেছে যে, এ ধরনের অপেশাদার আচরণের প্রতি ক্লাবটির দীর্ঘদিনের সহনশীল মনোভাবই যে এমবাপ্পের সাম্প্রতিক এই আপত্তিকর মন্তব্য প্রকাশের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, তা বুঝতে কারও বেশি সময় লাগার কথা নয়।

অনলাইন দুনিয়াতেও এমবাপ্পের জন্য সব ধরনের ডিজিটাল পথ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে। চীনের অত্যন্ত জনপ্রিয় অ্যাপ শিয়াওহংশুতে তাঁর মূল অ্যাকাউন্টটি সম্পূর্ণ স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে, যেখানে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ছিল ১০ লাখেরও বেশি। ঠিক একই রকম কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে চীনের অপর জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ওয়েইবোতেও। সেখানে তাঁর অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টে নোটিশ দিয়ে জানানো হয়েছে যে, দেশের প্রচলিত আইন অথবা ওয়েইবোর নিজস্ব কমিউনিটি নীতিমালা লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট কারণে ব্যবহারকারীদের তাঁকে নতুন করে অনুসরণ করার সুযোগ আর নেই। ওয়েইবোর একজন সাধারণ ব্যবহারকারী এই বিষয়ে মন্তব্য করে লিখেছেন যে, তাঁর এই মন্তব্য সরাসরি চীন রাষ্ট্র ও দেশের জনগণকে চরমভাবে আঘাত করেছে।

চলতি সপ্তাহের বুধবারেও এমবাপ্পেকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা ও ক্ষোভের জোয়ার অব্যাহত রয়েছে, যার মধ্যে কিছু কিছু মন্তব্য বর্ণবাদী রূপও ধারণ করেছিল। তবে মাও সে তুংকে নিয়ে করা এমবাপ্পের মূল রসিকতার সেই ভিডিওটি চীনের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভিডিওটি হয় নতুন করে কোথাও পোস্ট করা হয়নি অথবা আগে থেকেই তা স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। চীনের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে যে, বিশ্বখ্যাত বিলাসবহুল ব্র্যান্ড দিওর এবং হুবলো তাদের নিজ নিজ ওয়েইবো অ্যাকাউন্ট থেকে এমবাপ্পেকে নিয়ে তৈরি সমস্ত প্রচারমূলক পোস্ট সরিয়ে নিয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিনিধিরা খোঁজ নিয়ে এই দুই ব্র্যান্ডের ওয়েইবো অ্যাকাউন্টে এমবাপ্পের অফিশিয়াল চীনা নাম দিয়ে অনুসন্ধান করেও কোনো ফলাফল পাননি।

এই বিতর্কের উত্তাপ সরাসরি গিয়ে আছড়ে পড়েছে সাধারণ বিপণিবিতান ও দোকানপাটেও। বেইজিং শহরের বিখ্যাত সানলিতুন বিপণিবিতানে অবস্থিত অ্যাডিডাসের প্রধান বিপণীকেন্দ্রে গিয়ে এএফপির সংবাদকর্মীরা সরেজমিন দেখেছেন যে, রিয়াল মাদ্রিদের অন্যান্য ফুটবল জার্সি বিক্রি হলেও সেখানে এমবাপ্পের নাম খোদাই করা কোনো জার্সি আর প্রদর্শনীতে রাখা হয়নি। অথচ এর কিছুদিন আগেও চীনে এই ফরাসি ফরোয়ার্ডের জনপ্রিয়তা ছিল একদম আকাশচোঁয়া। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাঁকে অতীতে ‘ফুটবলের বিস্ময়’ ও অত্যন্ত ‘প্রতিভাবান’ খেলোয়াড় হিসেবে বাড়িয়ে বাড়িয়ে প্রশংসা করেছিল। বিজ্ঞাপনের বড় বড় বিলবোর্ড, কোমল পানীয়র কাঁচের বোতল থেকে শুরু করে ভার্চুয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব জায়গাতেই ছিল তাঁর একচ্ছত্র সরব উপস্থিতি।

চীনে ফুটবলপ্রেমীরা অত্যন্ত আদরের সঙ্গে এমবাপ্পেকে ভালোবেসে ‘গুইগুই’ বলে ডাকতেন। চীনা ভাষার এই শব্দটির বাংলা অর্থ হলো ‘কচ্ছপ’। বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় কার্টুন চলচ্চিত্র ‘টিনএজ মিউট্যান্ট নিনজা টার্টলস’-এর একটি বিশেষ চরিত্রের মুখের গড়নের সঙ্গে তাঁর চেহারার চমৎকার মিল থাকায় ভক্তরা তাঁকে এই নামে ডাকতে শুরু করেছিলেন।

কিন্তু সেই একসময়ের অত্যন্ত প্রিয় ‘গুইগুই’ চরিত্রটি এখন চীনের সাধারণ মানুষের কাছে চরম অপ্রিয় ও অবাঞ্ছিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। একটি ছোট্ট দায়িত্বজ্ঞানহীন রসিকতার পরিণাম যে এত বেশি মারাত্মক ও চড়া মূল্যের হতে পারে, কিলিয়ান এমবাপ্পে হয়তো তা দুঃস্বপ্নেও কোনো দিন কল্পনা করতে পারেননি।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
মেরুদণ্ড প্রতিস্থাপনে নতুন কৌশল ও স্নায়ু সংযোগ

মেরুদণ্ড প্রতিস্থাপনে নতুন কৌশল ও স্নায়ু সংযোগ