ঢাকা | বঙ্গাব্দ

দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও ব্লাইন্ড ক্রিকেটের জাতীয় দলে আরাফাতুল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 4, 2026 ইং
দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও ব্লাইন্ড ক্রিকেটের জাতীয় দলে আরাফাতুল ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

ক্রিকেট খেলার মাঠে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে জীবনের একটি পর্যায়ে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারিয়ে ফেলেছিলেন পঁচিশ বছর বয়সী তরুণ আরাফাতুল ইসলাম। তখন তিনি মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়তেন। এত বড় বিপর্যয় সত্ত্বেও তিনি নিজের ব্যাট-বল হাতে নেওয়ার প্যাশন বিসর্জন দেননি, বরং মনের জোরে খেলাধুলা চালিয়ে গেছেন এবং আজ তিনি দেশের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্লাইন্ড ক্রিকেটের জাতীয় স্কোয়াডে একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে খেলছেন।

বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের একজন নিয়মিত শিক্ষার্থী। আসছে চৌদ্দ থেকে কুড়ি নভেম্বর রাজধানী ঢাকার বসুন্ধরা স্পোর্টস গ্রাউন্ডে বসতে চলেছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের মর্যাদাপূর্ণ এশিয়া কাপের আসর। এই আসন্ন প্রতিযোগিতায় দেশের লাল-সবুজ দলের অলরাউন্ডার হিসেবে মাঠে নেমে খেলার কথা রয়েছে তাঁর এবং তিনি ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে দলে জায়গা পেয়েছেন।

তবে এই তরুণের আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানোর দীর্ঘ পথচলা এত সহজ ছিল না। ২০১১ সালের দিকে তিনি ফটিকছড়ির জাফতনগর লতিফ রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। ওই বছর বাইশে মে স্কুল মাঠে খেলা চলাকালে হঠাৎ চোখে বলের আঘাত পান তিনি, যাতে তাঁর দুই চোখের রেটিনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্রমান্বয়ে চোখের আলো নিভে যায়।

চট্টগ্রাম ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে তাঁকে পাড়ি জমাতে হয়েছিল ভারতের চেন্নাই শহরে। প্রায় বারো মাস সময়কালে মোট ছয়টি ধাপে অস্ত্রোপচার করা হলেও তাঁর দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে আসেনি।

এর পরদিন ২০১২ সালে তিনি চট্টগ্রাম সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে পুনরায় ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং সেখানে ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ালেখা রপ্ত করেন। পরবর্তীতে নবম শ্রেণী থেকে শুরু করে নগরীর রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে সাধারণ ধারায় পড়ালেখা অব্যাহত রাখেন, যেখানে সহপাঠী বন্ধুদের সহায়তা ও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে তিনি শিক্ষণীয় বিষয়গুলো শুনে শুনে আত্মস্থ করতেন।

নিজের চোখ হারানোর বেদনাদায়ক স্মৃতির কথা স্মরণ করে এই অলরাউন্ডার জানান যে, খেলার মাঠে বাম চোখের উপরের অংশে আঘাত পাওয়ার ফলেই রেটিনা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এক বছর ধরে চলা ছয়টি সার্জারিসহ নানা চিকিৎসায় নামমাত্র আলো ফিরলেও পড়ার মতো দৃষ্টিশক্তি আর অবশিষ্ট ছিল না এবং মাধ্যমিক পরীক্ষার পর তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারান।

চরম অন্ধত্বও তাঁর শিক্ষাজীবন থমকে দিতে পারেনি, বরং প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক স্তর পেরিয়ে সম্প্রতি তিনি স্নাতকোত্তরের পরীক্ষাও সম্পন্ন করেছেন। গ্র্যাজুয়েশনে তাঁর অর্জিত সিজিপিএ ছিল তিন এবং স্নাতকোত্তর পরীক্ষার ফলাফল এখনো প্রকাশ পায়নি।

দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর ঐ বিশেষায়িত স্কুলের বন্ধুদের সাথে পুনরায় ক্রিকেট চর্চা শুরু করেন তিনি এবং খেলতে খেলতেই ব্লাইন্ড ক্রিকেটের নানাবিধ কৌশল আয়ত্ত করে ফেলেন। ২০১২ সালে একটি স্থানীয় ক্রিকেট ক্লাবের অনুশীলনে নৈপুণ্য দেখিয়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পান এবং ২০১৪ সালের দিকে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার কালেই জাতীয় লিগে অংশ নেন।

২০১৭ সালে জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার সুযোগ এলেও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার কারণে তিনি অনুশীলনের ক্যাম্পে উপস্থিত হতে পারেননি। একইভাবে ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার ব্যস্ততার কারণে আরও একটি চমৎকার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়।

অবশেষে ২০২১ সালের চব্বিশ ডিসেম্বর ভারতের ভোপালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বনাম ভারত দ্বিপক্ষীয় সিরিজে জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর অভিষেক ঘটে। এর পরপরই ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ক্রিকেট বিশ্বকাপের মূল স্কোয়াডে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি, যেখানে রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল দল।

পরবর্তীতে ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম শহরে আয়োজিত আইবিএসএ ওয়ার্ল্ড গেমসেও দেশের দলের প্রতিনিধিত্ব করেন এই তরুণ, যে টুর্নামেন্টে ব্রোঞ্জপদক জিতেছিল দল। এ ছাড়াও শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মতো ক্রিকেট পরাশক্তির বিপক্ষেও তাঁর রয়েছে জয়ের দারুণ অভিজ্ঞতা।

দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ের মোট চারটি আলাদা লিগের মধ্যে তাঁর নিজের দল তিনটিতেই চ্যাম্পিয়ন এবং একটিতে রানার্সআপ হওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছে। আসন্ন এশিয়া কাপের জন্য গঠিত সতেরো সদস্যের বাংলাদেশ স্কোয়াডেও নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি এবং অলরাউন্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রশাসন বিষয়ক পরিচালক মোহাম্মদ তাইজ উদ্দিন সংবাদ মাধ্যমকে জানান যে, দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম থেকে তাদের হয়ে খেলছেন এই তরুণ এবং মাঝে কিছু বিরতি থাকলেও এবারের দুই ধাপের কঠোর ট্রায়াল ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মেধার জোরেই দলে সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের দৃষ্টিশক্তির মাত্রা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট শ্রেণিবিভাগ রয়েছে এবং আরাফাতুল মূলত বি-ওয়ান ক্যাটাগরির একজন খেলোয়াড়। এই শ্রেণীর প্রতিযোগীরা চোখের দৃষ্টি একদমই পান না এবং তাঁদের খেলার জন্য বিশেষ বলের ভেতর শব্দ তৈরির প্রযুক্তি থাকে, যার আওয়াজ শুনে ব্যাটারদের বলের অবস্থান আন্দাজ করতে হয়।

খেলাধুলার এই ভিন্নতা ব্যাখ্যা করে আরাফাতুল জানান যে, তাদের খেলায় মূল ভিন্নতা লুকিয়ে থাকে বলের শব্দের ভেতরে, যেখানে বল চলার সময় বিশেষ উপায়ে তৈরি হওয়া আওয়াজ শুনেই ব্যাটার বলের সঠিক দিক ও অবস্থান বুঝে শট খেলার চেষ্টা করেন।

বর্তমান সময়ে এই উদীয়মান ক্রিকেটার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজঅ্যাবল স্টুডেন্ট সোসাইটির সভাপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চট্টগ্রামের ডিজেবল স্পোর্টিং ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদও সামলাচ্ছেন। নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন যে, সমাজে এখনো সচেতনতার বড় অভাব রয়েছে এবং অনেকে মনে করেন না যে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা করতে সক্ষম।

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করে তারা সমাজের নানা প্রান্তে বহুমুখী কাজ করার যোগ্যতা রাখলেও প্রয়োজনীয় সুযোগ বা প্রমাণ করার ক্ষেত্র অনেক সময় তাদের দেওয়া হয় না বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।

আসন্ন এশিয়া কাপের মঞ্চে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পাশাপাশি দলগতভাবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন যে, তাঁদের মূল লক্ষ্য শিরোপা জয় করা এবং বাকিটা সৃষ্টিকর্তার ওপর নির্ভরশীল। নিজের চেষ্টার কোনো ঘাটতি থাকবে না জানিয়ে তিনি দেশের আপামর জনসাধারণকে মাঠে উপস্থিত হয়ে খেলা উপভোগ করার বিনীত অনুরোধ জানান, যা খেলোয়াড়দের মনে বাড়তি প্রেরণা জোগাবে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
মেঘ শিকারের স্বর্গরাজ্য ভিয়েতনামের দুর্গম তা শুয়া

মেঘ শিকারের স্বর্গরাজ্য ভিয়েতনামের দুর্গম তা শুয়া