নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
প্যারিস থেকে বার্লিন এবং ওয়ারশ—ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজপথ এক রাতে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি এবং তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ ও উপেক্ষার প্রতিবাদ জানাতে ইউরোপজুড়ে জেন-জি প্রজন্মের তরুণেরা আবারও ফুঁসে উঠেছেন।
হ্যালোইন উদ্যাপনের উৎসবমুখর পরিবেশের মাঝেই গত শনিবার রাতে এই ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা দেয়। ফ্রান্সে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের তীব্র সংঘর্ষ, জার্মানিতে নজিরবিহীন লুটপাট ও পেট্রলবোমা হামলার ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে পোল্যান্ডে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধানকে বরখাস্ত করার জেরে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। ইউরোপের আরেক দেশ ইতালিতেও এ সময় বিক্ষোভ সংঘটিত হয়েছে।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির নানা শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত মিছিলের পর সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সময় গতকাল সন্ধ্যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে এই সংঘাত বাধে। এই ঘটনায় সারা দেশ থেকে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে ফরাসি পুলিশ।
ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ইতোমধ্যে জিডিপির প্রায় ১২০ শতাংশের কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছে। এর পাশাপাশি ঋণ গ্রহণের ব্যয়ও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন একটি নাজুক পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকারকে ব্যয় সংকোচনের কঠোর চাপের মুখে পড়তে হয়েছে, যার ফলে সংকট উত্তরণে সরকারের বিকল্পও ফুরিয়ে আসছে।
গতকাল বিকালের দিকে বিক্ষোভ মিছিলগুলোর বড় অংশই শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছিল। তবে প্যারিসে মিছিলের অন্তিম লগ্নে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। একই সঙ্গে লিওঁ ও তুলুজ শহরেও পুলিশ বাহিনী কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। মার্সেই শহরেও সন্ধ্যার দিকে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, তবে রাতের গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।
গত ১৭ অক্টোবর সংঘটিত দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনার পর এটি ছিল তৃতীয় সপ্তাহের ধারাবাহিক বিক্ষোভ। ওই দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে দোকানপাট, সরকারি স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছিল। তবে আগের দুটি শনিবারে উপস্থিতির তুলনায় গতকালের বিক্ষোভে লোকসমাগম কিছুটা কম ছিল। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এ দিন সারা দেশে মোট ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ অংশ নেন।
গতকালের বিক্ষোভের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, যারা গতকাল রাতে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে চেয়েছিল, তাদের কঠোরভাবে মোকাবিলার প্রস্তুতি ছিল সরকারের। তিনি আরও জানান, বিভিন্ন শহরে চলা বিক্ষোভ থেকে মোট ৫৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সংঘাতে চারজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
দিনের আলোয় সবকিছু শান্ত থাকলেও সন্ধ্যার পরপরই পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। তরুণেরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অনড় অবস্থানে থাকায় সহিংসতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বার্লিন, কোলন ও হামবুর্গের মতো বড় শহরগুলোয় তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এমন এক সময়ে দেশজুড়ে এই অস্থিরতা দেখা দিল, যা মাখোঁ সরকারের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ‘ফিচ’ ফ্রান্সের ঋণের ভবিষ্যৎ অবস্থান অপ্রত্যাশিতভাবে ‘নেতিবাচক’ হিসেবে ঘোষণা করে। এতে দেশের ভঙ্গুর আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।
জার্মানির কয়েকটি শহরেও ব্যাপক বিক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। ফ্রাঙ্কফুর্টের রাজপথে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন দোকানে প্রবেশ করে অবাধে লুটপাট চালান। দেশটিতে তরুণদের নেতৃত্বে আয়োজিত বিশাল এই বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত সহিংস রূপ নেয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেট্রলবোমা নিক্ষেপকারী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। এই ধারাবাহিক সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
জার্মানির বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত এই বিক্ষোভে ১০ হাজারের অধিক তরুণ অংশ নেন। ‘জেনজি রেগেল্ট!’ নামের একটি সংগঠন এই বিক্ষোভের কর্মসূচি সফলভাবে আয়োজন করে। বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি ছিল, দেশের রাজনৈতিক নেতাদের অবশ্যই তরুণ সমাজের উদ্বেগ ও মৌলিক দাবিগুলোর প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।
প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সেনেগালের উদ্দেশে রাষ্ট্রীয় সফরে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় মাঝপথেই তাঁর উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি অবনতির দিকে যায়। সেখানে আন্দোলনকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইট-পাথর, আতশবাজি এবং পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করতে শুরু করেন। এর জবাবে পুলিশ বাধ্য হয়ে জলকামান ও পিপার স্প্রে প্রয়োগ করে, যেখানে একজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
পুলিশের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয় যে সেখানে প্রচণ্ড ‘সহিংস দাঙ্গা’ সংঘটিত হয়েছে। বিভিন্ন বিপণিবিতানের কাচ ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং জরুরি সেবামূলক কাজে নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করেও পেট্রলবোমা ছোড়া হয়েছে, পাশাপাশি চালানো হয়েছে লুটপাট।
ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রধান বিপণিবিতান সংলগ্ন সড়কের একটি বিশাল অংশ নিরাপত্তার স্বার্থে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এএফপির একজন সাংবাদিক জানান, ওই সময় পুলিশের সাঁজোয়া ভ্যান ও নিরাপত্তা কর্মীরা কাউকেই সড়কটিতে প্রবেশ করতে দেননি। এমনকি আকাশে পুলিশের একটি হেলিকপ্টার চক্কর দিতে দেখা যায় এবং সড়কে থেমে থেমে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জানান যে, ফ্রাঙ্কফুর্টের এই বিক্ষোভে প্রায় এক শ জন চিহ্নিত ‘বামপন্থী উগ্রবাদী’ অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করেছিল। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ফ্রাঙ্কফুর্টে আজকের এই আয়োজন যেভাবে সমাপ্ত হলো, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক।
হামবুর্গ ও কোলন শহরেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে জলকামান ব্যবহার করতে দেখা যায়। বার্লিনের পুলিশ জানায়, তাদের লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা ডিম ও কাচের বোতল নিক্ষেপ করেছেন। বনে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় একজন পুলিশ সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন।
হ্যালোইন উৎসবের সঙ্গে বিক্ষোভের দিনটি কাকতালীয়ভাবে মিলে যাওয়ায় বহু মানুষ বিচিত্র সব পোশাকে রাজপথে আসেন। কেউ ডাইনোসর আবার কেউ ব্যাটম্যানের সাজে অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘প্রতিরোধের সময় এখন’ এবং ‘মের্ৎসকে বিদায় নিতে হবে’ লেখা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শিত হয়। উল্লেখ্য, জার্মানির বর্তমান রক্ষণশীল চ্যান্সেলর হলেন ফ্রিডরিখ মের্ৎস।
বার্লিনের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী সংবাদমাধ্যম এএফপিকে নিজের মতামত জানিয়ে বলেন, ফ্রান্সসহ ইউরোপের অন্যান্য রাষ্ট্রে বর্তমানে যে আন্দোলন চলছে, তার সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়।
জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ভার, জরাজীর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা এবং সরকারি ব্যয় হ্রাসের নীতির প্রতিবাদে তরুণেরা আজ রাজপথে নেমে এসেছেন। একই সঙ্গে রাজনীতিবিদেরা তরুণদের স্বার্থ ও মূল সংকটগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে মনগড়া সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলেও কঠোর অভিযোগ তুলেছেন বিক্ষোভকারীরা।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর