নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর জীবনের প্রথম বেকারত্ব অনুভবের সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও স্পষ্ট। সে বছর আমাদের গ্রাম থেকে মোট বারোজন একসঙ্গে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। স্কুল বন্ধ, পড়াশোনা নেই, কত দিন আর শুধু ক্রিকেট আর ফুটবল খেলা নিয়ে অলস সময় কাটানো যায়! তাই অলসতা দূর করতে আমরা যেকোনো কাজের মাধ্যমেই সময় কাটিয়ে দিতাম।
ঠিক সেই সময়েই আমাদের গ্রামে এক নতুন উৎপাত শুরু হলো। গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে আকস্মিকভাবে হাঁস ও মুরগি চুরি যাওয়ার ঘটনা ঘটতে থাকল। সাধারণত রাতের বেলাতেই এসব চুরি সংঘটিত হতো এবং পরদিন সকালে কখনো পুকুরপাড় আবার কখনো বাঁশঝাড়ের মধ্যে সেই হাঁস ও মুরগির পালক পড়ে থাকতে দেখা যেত।
ধীরে ধীরে এই চুরির সমস্যা শুধু আমাদের গ্রামেই সীমাবদ্ধ রইল না, বরং আশপাশের গ্রামগুলোতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। সব গ্রামের মানুষ মিলে এলাকার চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ জানালেও তিনি বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো গুরুত্ব দিলেন না। তবে চেয়ারম্যান মহাশয় নড়েচড়ে বসলেন সেদিন, যেদিন তাঁর বাবার ফাতিহার আয়োজনের জন্য প্রস্তুত করা প্রায় বিশ কেজি ওজনের একটি খাসির চামড়া তাঁর নিজের দখল করা জমির ঠিক মাঝখানে উদ্ধার হলো।
সেদিন সন্ধ্যায় চেয়ারম্যানের বাড়িতে বসল এক বিরাট বৈঠক। সারা রাত ধরে হুক্কাহুয়া শব্দে পুরো গ্রাম মাতিয়ে রাখা শেয়ালগুলোকেই এই চুরির প্রধান আসামি হিসেবে সাব্যস্ত করা হলো। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে, সুদূর দিনাজপুর থেকে শেয়াল ধরার জন্য একজন বিশেষ এক্সপার্ট বা দক্ষ শিকারি উড়িয়ে আনা হবে।
নির্ধারিত সময়ে সেই এক্সপার্ট এলেন এবং নগদ পাঁচ হাজার টাকা দাবি করলেন। গ্রামের মানুষেরাও তাঁর এই দাবিতে রাজি হয়ে গেল এবং অবিলম্বে প্রয়োজনীয় উপকরণের একটি দীর্ঘ ফর্দ তৈরি করা হলো। ফর্দে ছিল শক্ত বাঁশ, শক্ত কাঠের তক্তা, নাইলনের দড়ি, দুই ইঞ্চি মাপের পেরেক এবং টোপ হিসেবে দেওয়ার জন্য মোট দশটি মোরগ। সেই এক্সপার্ট তাঁর কাজের সহায়তার জন্য কিছু সহকারী চেয়ে বসলেন এবং আমরা বারোজন মাধ্যমিক পাস করতে না পারা তরুণ সেই আনপেইড ইন্টার্নশিপে নিয়োগ পেলাম।
অবিরত দুই দিন ও এক রাতের পরিশ্রমে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হলো দশটি শক্তপোক্ত ফাঁদ। সন্ধ্যার অন্ধকার নামতেই ফাঁদগুলো বিভিন্ন গ্রামের কৌশলগত স্থানে পেতে দেওয়া হলো। এক চরম টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে আমাদের সেই পুরো রাতটি কাটল।
পরের দিন সকালেই দেখা গেল যে, পেতে রাখা দশটি ফাঁদের মধ্যে ঠিক পাঁচটি ফাঁদেই শেয়াল ধরা পড়েছে। গ্রামের মানুষ এতে প্রচণ্ড খুশি হলো এবং তারা মনে করল যে এই উপদ্রব থেকে অবশেষে নিস্তার পাওয়া গেল।
কিন্তু শেয়ালরাও যে চুপ করে বসে না থেকে পাল্টা আক্রমণ চালাতে পারে, তা গ্রামবাসীরা সেবার টের পেল। হাঁস-মুরগি চুরির পাশাপাশি এবার গ্রামের খেতের তরমুজ ও বাঙ্গির ওপর আক্রমণ শুরু হলো। বেশ কিছু কৃষিজমির তরমুজ ও বাঙ্গি শেয়ালের এই আক্রমণের শিকার হলো।
এভাবেই গ্রামবাসী বনাম শেয়ালের এই অদ্ভুত ও টানটান উত্তেজনার লড়াই বেশ কিছুদিন ধরে চলতে লাগল। গ্রামবাসী বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে একের পর এক এক্সপার্ট আনতে থাকল, আর শেয়ালদের পক্ষ থেকেও পাল্টা হামলা আরও জোরালো করা হলো। এসবের মাঝেই একদিন আমাদের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলো।
ধর্ম বইয়ের কোনো এক নির্দিষ্ট অধ্যায়ে পড়েছিলাম যে, ভালো বা মন্দ যাই করা হোক না কেন, তার ফল এই পৃথিবীতেই ভোগ করতে হয়। আমাদের বারোজন বন্ধুর মধ্যে কেবল আমিই সব বিষয়ে পাস করলাম, আর সেই ফলাফল এমন এক অদ্ভুত নম্বর নিয়ে এল যা আমার বাবা-মাকে মিষ্টি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারেও ভীষণ দ্বিধায় ফেলে দিয়েছিল।
এই সমস্ত কষ্টের মাঝেই গ্রামবাসীর জন্য একটি স্বস্তির খবর এল। সেদিন থেকেই হঠাৎ করে শেয়ালদের সমস্ত আক্রমণও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। কে জানে, হয়তো সেদিন শেয়ালদেরও মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশিত হয়েছিল!
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর