নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কোনো নির্দিষ্ট জনপদ বা রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের তথ্য শুনতে শুনতে মানুষ একসময় সেগুলোকে ধ্রুব সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রাচ্যকে রহস্যময় হিসেবে গণ্য করা, মুসলিম সমাজের আধুনিকতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যর্থতার কথা বলা, আরবদের গণতন্ত্রের অনুপযুক্ত মনে করা কিংবা কোনো বিশেষ দেশের ওপর বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ জরুরি বলে ভাবার মতো ধারণাগুলো বেশ প্রচলিত। তবে এ ধরনের জনশ্রুতি কি সংশ্লিষ্ট জনপদের প্রকৃত অবস্থাকে তুলে ধরে, নাকি যুগ যুগ ধরে চলে আসা বিশেষ বয়ানই আমাদের দেখার ভঙ্গি নির্ধারণ করে দেয়—সেই প্রশ্ন এসেই যায়।
এই ধাঁধার সমাধান খুঁজতে গেলে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আমেরিকান চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড সাঈদের শরণাপন্ন হতে হয়। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ওরিয়েন্টালিজম' বা প্রাচ্যবাদে তিনি তুলে ধরেছেন যে, কোনো ভিনদেশি সমাজ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন কেবল তাদের অনুধাবন করার মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ক্ষেত্রবিশেষে তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের রাস্তা প্রশস্ত করে। সাঈদের মূল অবদান নিহিত রয়েছে এখানেই; তিনি কেবল পশ্চিমা বিশ্ব প্রাচ্যকে কীভাবে ফুটিয়ে তোলে সেটাই খতিয়ে দেখেননি, বরং এর পাশাপাশি এই বিবরণগুলো সৃষ্টির নেপথ্য কারণ, নির্দিষ্ট কিছু ধারণার পুনরাবৃত্তি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে এগুলোর সংযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
জনপ্রিয় ডিজনির অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র 'আলাদিন'-এর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে, যার কাল্পনিক আরব নগরী আগ্রাবাহ মরুভূমি, প্রাসাদ, পণ্যের বাজার, উট, ওড়ার গালিচা ও নানা রহস্যঘেরা চরিত্রে ভরপুর একটি অবাস্তব ভূখণ্ড হিসেবে চিত্রায়িত হয়েছে। কাহিনীর খাতিরে এই উপাদানগুলো চিত্তবিনোদনের উপকরণ হতে পারে, কিন্তু জটিলতা তৈরি হয় তখনই, যখন একটি বিশাল অঞ্চল ও এর বহুত্ববাদী মানুষকে ক্রমাগত নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের মোড়কে উপস্থাপন করা হয়। ফলে দর্শকদের মনে প্রাচ্যের একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা অঙ্কিত হয়, যেখানে এই জগতটিকে ভয়ংকর, নিষ্ঠুর, রহস্যে ঘেরা এবং আধুনিক সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন বলে প্রতীয়মান হয়।
ওই সিনেমার একটি দৃশ্যে দেখা যায়, রাজকুমারী জেসমিন একটি ক্ষুধার্ত শিশুকে বাঁচাতে দোকান থেকে আপেল নিয়ে তাকে দেয় এবং দাম না দেওয়ায় দোকানদার তাকে চোর সাব্যস্ত করে হাত কেটে ফেলার হুমকি দেয়। একটি মাত্র খণ্ডচিত্র দিয়ে কোনো শিল্পকর্ম বা সংস্কৃতির সামগ্রিক মূল্যায়ন করা চলে না, কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রশ্ন জাগে যে, আরব জনপদকে ফুটিয়ে তুলতে কেন নিষ্ঠুরতা, কঠোর শাস্তি কিংবা অদ্ভুত প্রথার মতো নেতিবাচক বিষয়গুলো এত সহজে পরিচিত সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়। এডওয়ার্ড সাঈদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আমাদের ঠিক এই জায়গাটিতেই প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরি করে দেয়।
সাঈদের প্রতিপাদ্য এমন ছিল না যে প্রতিটি পশ্চিমা চলচ্চিত্র, গ্রন্থ বা সংবাদ পরিবেশন জেনেশুনে প্রাচ্যকে ছোট করে দেখায়; বরং তিনি বুঝিয়েছেন যে, বিভিন্ন সময়ে রচিত সাহিত্য, গবেষণা, সংস্কৃতির নানা রূপায়ন কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যে নির্দিষ্ট কিছু চিন্তার পুনরুত্থান যখন ঘটতে থাকে, তখন তা একটি বৃহৎ জ্ঞানকাঠামোর রূপ নেয়। এর ফলে মানসিক কল্পনায় তৈরি হওয়া কোনো অবয়বই পরবর্তীতে বাস্তব মানুষকে বিচারের মাপকাঠিতে রূপান্তর লাভ করে। সহজকথায়, প্রাচ্যবাদ বলতে বোঝায় এমন এক ঐতিহাসিক জ্ঞানকাঠামো যার মাধ্যমে প্রাচ্যের মানুষ ও সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করা হয় এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মাঝে একটি কৃত্রিম বিভাজনরেখা টেনে দেওয়া হয়।
এই বিভাজনের মধ্য দিয়ে প্রায়শই পশ্চিমকে যুক্তিপরায়ণ, আধুনিক ও প্রগতিশীল হিসেবে এবং প্রাচ্যকে স্থবির, আবেগসর্বস্ব, অনুন্নত কিংবা রহস্যময় হিসেবে তুলে ধরা হয়। এখানে 'প্রাচ্য' বলতে কেবল ভৌগোলিক পূর্ব দিককে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরং সাঈদের গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল মধ্যপ্রাচ্য, আরব বিশ্ব ও ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে পশ্চিমা সাহিত্য ও রাজনৈতিক চিন্তার ভেতর গড়ে ওঠা ধ্যানধারণা। যদিও তাঁর এই পর্যালোচনার পরিধি থেকে এশিয়া কিংবা আফ্রিকার বাকি অংশের উপস্থাপনা নিয়েও বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উত্থাপন করা সম্ভবপর হয়।
প্রাচ্যবাদকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে তিনটি প্রধান বিষয়ের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হয়। প্রথমত, প্রাচ্যকে পরিবর্তনহীন কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা, যেখানে যেকোনো সমাজের ভেতরে চলা ইতিহাস, সংস্কার কিংবা রাজনৈতিক আন্দোলন থাকা সত্ত্বেও তাদের সংস্কৃতিকে শত শত বছর ধরে একই রকম বলে ফুটিয়ে তোলা হয়। দ্বিতীয়ত, সমাজগুলোর মধ্যকার স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্যকে বেমালুম এড়িয়ে যাওয়া, যেমন—মিসর, সৌদি আরব, ইরান ও বাংলাদেশের ইতিহাস কিংবা রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাদের অভিন্ন পরিচয়ে মাপা। তৃতীয়ত, যেকোনো রাজনৈতিক সংকটের পেছনে অভ্যন্তরীণ ইতিহাস বা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব না খুঁজে সেগুলোকে ওই সমাজের সংস্কৃতি বা ধর্মের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেগে দেওয়া।
এভাবে একটি বহুমাত্রিক সমাজকে গুটিকয়েক গতানুগতিক বৈশিষ্ট্যের চশমায় দেখার কারণে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনসংগ্রাম, রাজনৈতিক চাওয়া-পাওয়া এবং নিজস্ব সমাজকে বদলে দেওয়ার সামর্থ্য সম্পূর্ণ আড়ালে চলে যায়। তবে এটিও স্মরণে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, প্রাচ্য বিষয়ক যাবতীয় সাংস্কৃতিক নির্মাণ বা গবেষণা হুবহু প্রাচ্যবাদী ঘরানার নয়, বরং সাঈদের মূল সমালোচনা ছিল সেই নির্দিষ্ট জ্ঞানচর্চার বিরুদ্ধে যেখানে আগে থেকে ঠিক করে রাখা ধারণা এবং অসাম্যপূর্ণ ক্ষমতার সম্পর্ক অন্য সমাজকে চেনার প্রক্রিয়াকে কলুষিত করে।
সাঈদের তাত্ত্বিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান দিক হলো জ্ঞান এবং ক্ষমতার পারস্পরিক সংযোগ, যা আমাদের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। সাধারণত আমাদের ধারণা থাকে যে কোনো রাষ্ট্র সম্পর্কে অধিক তথ্য সংগ্রহ মানেই তাকে ভালোভাবে উপলব্ধি করা, কিন্তু বাস্তবে তথ্যের পাশাপাশি কোন তথ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, কার অভিজ্ঞতা বাদ পড়ছে এবং কার ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে—তা জানা অত্যন্ত জরুরি। কোনো প্রভাবশালী রাষ্ট্র যদি ঘোষণা করে যে একটি দুর্বল দেশের অধিবাসীরা নিজেদের শাসন করতে অক্ষম এবং তাদের জন্য বাইরের সাহায্য দরকার, তবে সেই দাবি সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে ভিনদেশি হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া সহজ হয়। ঔপনিবেশিক যুগে এর বহু নজির রয়েছে যেখানে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিজেদের শাসনকে সভ্যতা ও উন্নয়নের বার্তা হিসেবে জাহির করলেও তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল সম্পদ লুট ও কর্তৃত্ব কায়েম করা।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর