ঢাকা | বঙ্গাব্দ

সোনা ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে খুন হন যুবদল নেতা শাকের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 4, 2026 ইং
সোনা ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে খুন হন যুবদল নেতা শাকের ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

মাগুরার স্থানীয় রাজনীতি ও অপরাধজগতের এক চাঞ্চল্যকর অধ্যায়ের রহস্য উন্মোচন করেছে জেলা পুলিশ। পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে জানান যে, লুট করা সোনার বার নিজেদের মধ্যে সঠিকভাবে বণ্টন না করার জের ধরেই যুবদল নেতা শাকের হোসেনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই পৈশাচিক হত্যাকাটি সম্পন্ন করার জন্য আক্ষরিক অর্থেই বিশ লাখ টাকার বিনিময়ে একদল পেশাদার ভাড়াটে খুনিকে চুক্তিভিত্তিক কাজে লাগানো হয়েছিল।

গত একুশ অক্টোবর প্রত্যুষে মাগুরা পৌরসভার মূল বাস টার্মিনাল চত্বরে অবস্থিত রয়েল পরিবহনের টিকিট কাউন্টারে বসা অবস্থায় দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে প্রাণ হারান যুবদল নেতা শাকের। তিনি ওই নির্দিষ্ট পরিবহনের কাউন্টার মাস্টারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মাগুরা পৌর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহবায়কের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদে আসীন ছিলেন। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর নিহত ব্যক্তির স্ত্রী থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে অস্ত্র ও হত্যা আইনে একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেন।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত ছয় অক্টোবর দুপুর নাগাদ, যখন মানিকগঞ্জের এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী মজিবর রহমান ঢাকা থেকে সোনার কিছু দণ্ড নিয়ে বাসে চড়ে ঝিনাইদহের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে মাগুরা সদরের রামনগর এলাকায় পৌঁছানোর পর মাগুরা পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের তৎকালীন আহবায়ক মারুফ হোসেনের নেতৃত্বে বারো থেকে পনেরো জনের একটি সশস্ত্র দল পুলিশ পরিচয়ে জোরপূর্বক তাকে বাস থেকে নিচে নামায়। পরবর্তীতে ওই ব্যবসায়ীকে হুলিনগর এলাকার নির্জন মেহগনিবাগানে নিয়ে বেদম মারধর করা হয় এবং তার নিকট থেকে প্রায় দেড় শ ভরি ওজনের চোদ্দটি তেজাবি সোনার দণ্ড ও নগদ ষাট হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

সোনার বার ছিনতাইয়ের দীর্ঘ বাইশ দিন পর ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মজিবর রহমান নিজে বাদী হয়ে ছাব্বিশ অক্টোবর মাগুরা সদর থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা করেন। আর এই ডাকাতির ঘটনার ঠিক পনেরো দিন পর খুন হন শাকের হোসেন, যা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিশ্চিত হয়েছে যে সোনা লুটের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের গভীর ও প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে। মূলত লুট করা সোনার সঠিক ভাগাভাগি নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলশ্রুতিতেই শাকেরকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এই পৃথিবী থেকে বিদায় করা হয়েছে।

পুলিশের ভাষ্যমতে, সোনা ছিনতাইয়ের পর থেকেই ওই অপরাধ চক্রের সদস্যদের মাঝে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ষড়যন্ত্রের বিস্তার ঘটেছিল। মূল হোতা মারুফ হোসেন তার সহযোগীদের কাছে মিথ্যা দাবি করেন যে ডাকাতির সময় মাত্র ছয়টি সোনার বার পাওয়া গেছে, যার মধ্য থেকে তথ্য সরবরাহকারী পক্ষকে তিনটি দেওয়ার পর মাত্র তিনটি বার অবশিষ্ট আছে। এভাবে বাকি আটটি সোনার দণ্ড অত্যন্ত সুকৌশলে নিজের কাছে লুকিয়ে রেখে তিনি নিজের দলীয় সাঙ্গপাঙ্গদের সঙ্গেই চরম প্রতারণা করেছিলেন।

চক্রের এই গোপন চক্রান্ত বুঝতে পেরে যান শাকের হোসেন, যিনি নিজে এই দলের অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি নিজের প্রাপ্য সোনা ও আর্থিক হিস্যা বুঝে নেওয়ার জন্য মারুফকে ক্রমাগত প্রচণ্ড চাপে রাখতে শুরু করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি মীমাংসা করার উদ্দেশ্যে গত সাত অক্টোবর সন্ধ্যায় মাগুরা ট্রাক টার্মিনালে এক গোপনীয় বৈঠকে বসেন শাকের, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক গোলাম জাহিদ, পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক মারুফসহ চারজন ব্যক্তি।

সেই বৈঠকে শাকের ও মারুফের মধ্যকার সোনার হিসাব নিয়ে চরম বাকবিতণ্ডা, হাতাহাতি ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি যখন অত্যন্ত উত্তপ্ত ও জটিল হয়ে ওঠে, তখন গোলাম জাহিদ নিজে মধ্যস্থতা করে সাময়িকভাবে বিষয়টি শান্ত করেন এবং মারুফকে কিছু অর্থ দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে কিছুদিন বাদে এর স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দেন। এর পরের দিন অর্থাৎ আট অক্টোবর মারুফ হোসেন শাকেরকে পাঁচ লাখ টাকা প্রদান করলেও শাকের তাতে বিন্দুমাত্র সন্তুষ্ট না হয়ে পুরো সোনার হিসাব এবং নিজের পূর্ণ অংশের দাবিতে অনড় থাকেন।

পুলিশ সুপার আরও জানান যে, অতিরিক্ত চাপের মুখে পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়ে মারুফ তখন চক্রের আরেক প্রভাবশালী সদস্য গোলাম জাহিদের সঙ্গে পরামর্শ করে শাকেনকে স্থায়ীভাবে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত ছক কষেন। এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সফলভাবে বাস্তবায়ন করার মানrie মারুফ এগারো অক্টোবর সন্ধ্যায় গোলাম জাহিদকে নগদ বিশ লাখ টাকা প্রদান করেন। এর পরদিন বারো অক্টোবর গোলাম জাহিদ সেই প্রাপ্ত অর্থের মধ্য থেকে আঠারো লাখ টাকা একটি বেসরকারি ব্যাংকের মাগুরা শাখায় নিজের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করেন।

পূর্বনির্ধারিত সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ভাড়াটে খুনিদের মাঠে নামানো হয় এবং একুশ অক্টোবর ভোরে মাগুরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রয়েল কাউন্টারের সামনে শাকের হোসেনের মাথায় সরাসরি গুলি চালিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এই রোমহর্ষক ঘটনার পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থান্দার খায়রুল হাসানের নেতৃত্বে আট সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ তদন্ত দল মাঠে নামে এবং দুটি পৃথক মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে মোট এগারো জন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে।

অভিযান পরিচালনার সময় প্রধান আসামি মারুফের ঘরের পেছন থেকে প্রায় বায়ান্ন ভরি ওজনের পাঁচটি সোনার বার এবং আসামি মিল্টনের স্ত্রী মারুফার কাছ থেকে প্রায় পৌনে দুই ভরি ওজনের একটি খণ্ডিত সোনার দণ্ড উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডে সরাসরি ব্যবহৃত দুটি মোটরসাইকেল, একটি বিলাসবহুল প্রাইভেট কার, তাজা গুলি এবং ব্যবহৃত বুলেটের বেশ কিছু খালি কার্তুজও জব্দ করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

এই জোড়া অপরাধের ঘটনায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহবায়ক কমিটির সদস্য রনি শিকদার, শামীমা তাবাসসুম, ঝিনাইদহের সোনা ব্যবসায়ী অনিমেষ মজুমদার, বহিষ্কৃত নেতা মারুফ হোসেন, গোলাম জাহিদ এবং বশির আলী। এর মধ্যে গোলাম জাহিদ ও মারুফ হোসেনকে সোনা লুটের মামলাতেও নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

এছাড়াও ডাকাতির মামলায় আলাদাভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জুয়েল হোসেন, তৌকির আহমেদ, ফরিদ মণ্ডল, মিল্টন মোল্যা ও তাঁর স্ত্রী মারুফা আকতারকে। পুলিশ সুপার জানান যে গ্রেপ্তারকৃত গোলাম জাহিদ ইতোমধ্যে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জবানবন্দি দিয়েছেন এবং সরাসরি গুলি চালানো ভাড়াটে শুটারদেরও শনাক্ত করা হয়েছে।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি নাম জড়িয়ে যাওয়ায় এবং পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক গোলাম জাহিদ এবং পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক মারুফ হোসেনকে তাদের দলীয় পদসমূহ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দল।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার ও বাজেট বৃদ্ধির দাবিতে গ্রিসে বিক্ষোভ

শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার ও বাজেট বৃদ্ধির দাবিতে গ্রিসে বিক্ষোভ