ঢাকা | বঙ্গাব্দ

গোলকিপাররা কেন আজও ব্যালন ডি’অর জয়ের স্বাদ থেকে বঞ্চি??

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 20, 2026 ইং
গোলকিপাররা কেন আজও ব্যালন ডি’অর জয়ের স্বাদ থেকে বঞ্চি?? ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনালের স্মৃতি হাতড়ালে জার্মান কিংবদন্তি গোলকিপার অলিভার কানের কথা সবার আগে মনে পড়ার কথা। কানের সেই ভুলের কথা ভোলার নয়, অথচ সেবার ফাইনালের আগে তিনি প্রমাণ করেছিলেন গোলকিপাররাও বিশ্বকাপে পারফরম্যান্স দিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে পারেন। জার্মানির গোলপোস্টে তিনি এক অপ্রতিরোধ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

যদিও ফাইনালে রিভালদোর শট ধরে রাখতে না পেরে ফিরতি শটে রোনালদোর গোল হজম করায় কানের সব অর্জন দর্শকদের চোখে ম্লান হয়ে যায়। তবে সেই আসরে গোল্ডেন বলজয়ী কান আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতা একমাত্র গোলকিপার। ২০০২ সালের ব্যালন ডি’অরেও তিনি তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। ব্রাজিলের বিপক্ষে ওই ফাইনালের ফলাফল ভিন্ন হলে কান হয়তো তৃতীয় না হয়ে প্রথম হতেন এবং ব্যালন ডি’অর জয় করতেন। ফলে ১৯৬৩ সালে লেভ ইয়াশিনের পর ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার জয়ী দ্বিতীয় গোলকিপার হতে পারতেন তিনি।

২০১১ সালের ব্যালন ডি’অরেও তৃতীয় হওয়া কানের ওই বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স গোলকিপারদের ব্যালন ডি’অর জয়ের দাবিকে আরও জোরালো করে তোলে। কিন্তু গোলকিপারের পজিশনটি যেন এক কৃতজ্ঞতাহীন কাজ, যেখানে গোটা ম্যাচে বুক চিতিয়ে সব আক্রমণ ঠেকানোর পরও সামান্য এক ভুলে গোল খেলেই চারপাশ থেকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রাও তো ভুল করেন, তাহলে গোলকিপাররা কেন ব্যালন ডি’অর জয়ে ফরোয়ার্ডদের চেয়ে পিছিয়ে থাকবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসে ফুটবল কীভাবে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স পরিমাপ করে, উদযাপনের জন্য ঠিক কী নির্বাচন করা হয় এবং গোলকিপারদের অবদান মূল্যায়ন করা কেন এত কঠিন, তার নানা দিক।

সেই অনুসন্ধানে নামার আগে একটি তথ্য জানিয়ে রাখা ভালো যে, এবারের ব্যালন ডি’অর পুরস্কারের জন্য মনোনীত ৩০ জন খেলোয়াড়ের তালিকায় কোনো গোলকিপার নেই। অর্থাৎ লন্ডনে ব্যালন ডি’অর ট্রফি হাতে কোনো গোলকিপারকে দেখার বিন্দুমাত্র সুযোগ এবার থাকছে না।

ফুটবল ইতিহাসে ইয়াশিনের পর এই পুরস্কার জয়ের খুব কাছাকাছি অনেকেই পৌঁছেছেন, কিন্তু ইয়াশিনের সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি আর হয়নি। ইতালির কিংবদন্তি দিনো জফ ১৯৭৩ সালে ব্যালন ডি’অর জয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। জুভেন্টাসের হয়ে দুর্দান্ত ফর্মের পাশাপাশি তিনি ইতালির গোলপোস্টে টানা ১০৪২ মিনিট কোনো গোল হজম করেননি। অন্যদিকে ইতালি ২০০৬ বিশ্বকাপ জয়ের পর সে বছর ব্যালন ডি’অরে দ্বিতীয় হন জিয়ানলুইজি বুফন। একইভাবে জার্মানি বিশ্বকাপ জেতার পর ২০১৪ সালের ব্যালন ডি’অরে দ্বিতীয় হয়েছিলেন ম্যানুয়েল নয়্যারও।

প্রতিটি উদাহরণের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয় যে গোলকিপারদেরও বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। দিনো জফ তাঁর যুগে ধারাবাহিকতা ও রক্ষণাত্মক দক্ষতার প্রতীক ছিলেন। কান দেখিয়ে গেছেন কীভাবে বিশ্বকাপে সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা যায়, বুফনের শট ঠেকানোর ক্ষমতা ছিল অবিশ্বাস্য, আর নয়্যার তো এক ধাপ এগিয়ে থেকে শুধু গোল ঠেকানোই নয়, বক্সের বাইরে পাস দেওয়া এবং সুইপারের ভূমিকাও পালন করেছেন।

অথচ এই কিংবদন্তিদের কেউই কখনো ব্যালন ডি’অর ট্রফি জিততে পারেননি।

ফুটবলে গোলই শেষ কথা এবং বল জালে জড়ালেই গ্যালারি উল্লাসে ফেটে পড়ে। কিন্তু তার ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে কোনো গোলকিপার যদি অবিশ্বাস্য কোনো সেভ করেন, তবে গ্যালারিতে সেভাবে উল্লাস হয় না। ম্যাচের শেষ মিনিটে কোনো ফরোয়ার্ডের করা গোলই পরের দিন পত্রিকার প্রধান শিরোনাম হয়, আর সেই ম্যাচেরই হয়তো পঞ্চাশ মিনিটে গোলকিপারের করা অবিশ্বাস্য সেভটি কেবল প্রতিবেদনের বর্ণনায় বা পটভূমিতে জায়গা পায়। ব্যক্তিগত পুরস্কার জেতার ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রেক্ষাপট বা বিবরণ খুব একটা কাজে আসে না, কারণ সমস্যাটা শুধু মূল্যায়নের নয়, পারফরম্যান্স পরিমাপের পদ্ধতিতেও রয়েছে।

আক্রমণভাগে খেলোয়াড়দের অবদান গোল এবং অ্যাসিস্ট বা গোল বানানোর মাধ্যমে সহজেই বোঝা যায়, কিন্তু গোলকিপারের কাজটা এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল। প্রত্যাশিত গোল মডেল মাঠে দলগুলোর তৈরি করা সুযোগের মান বুঝতে সাহায্য করে এবং শট-পরবর্তী প্রত্যাশিত গোলগুলো দিয়ে অনুমান করা যায় একজন গোলরক্ষক মুখোমুখি হওয়া শট এবং সেগুলোর পজিশন বিবেচনা করে কয়টি গোল আটকিয়েছেন। তবে এসব পরিসংখ্যান ফুটিয়ে তুলতে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় এবং গোলকিপার দলে যে অবদান রাখেন, তার সবটুকু এই মেট্রিকস পুরোপুরি ফুটিয়ে তুলতে পারে না।

কল্পনা করুন একজন গোলকিপারের কথা, যিনি প্রতিপক্ষের থ্রু পাস আগেই বুঝতে পেরে এগিয়ে যান এবং কেউ শট নেওয়ার আগেই বল বিপদমুক্ত করেন। এতে হয়তো কোনো অফিশিয়াল সেভ থাকে না, কোনো হাইলাইটস তৈরি হয় না এবং তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ার মতো কোনো পরিসংখ্যানও থাকে না। তবুও সেই সিদ্ধান্তটি যেকোনো দুর্দান্ত ওয়ান-অন-ওয়ান সেভের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গোলরক্ষক বিপদ আঁচ করতে পেরে আগেই সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু মানুষের মুখে মুখে যতটা গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা ঘোরে, ম্যাচে এসব অবদানের প্রভাব কি ততটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে?

একই কথা প্রযোজ্য গোলকিপারের পজিশনিং, যোগাযোগ রক্ষা, বল বিতরণ এবং রক্ষণভাগের পেছনের জায়গার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ক্ষেত্রেও। বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে না দেওয়া এবং আগেই বিপদ টের পেয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার মতো কাজগুলো গোলকিপাররা কতটা করে থাকেন, তা কি ঠিকমতো মূল্যায়ন করা হয়?

একজন ফরোয়ার্ডের অবদান অত্যন্ত দৃশ্যমান এবং তা সহজেই প্রকাশ করা যায়, অথচ একজন গোলরক্ষকের প্রভাব মূলত প্রতিরোধমূলক, সূক্ষ্ম প্রকৃতির এবং পুরো নব্বই মিনিটের বিভিন্ন ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে।

এর পেছনে একটি মানসিক দিকও রয়েছে, যা নটিংহাম ফরেস্টে পিটার শিলটনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন কিংবদন্তি কোচ ব্রায়ান ক্লফ। তাঁর জোরালো দাবি ছিল, একজন ভালো গোলকিপার পুরো মৌসুমে দলকে পনেরো থেকে কুড়ি পয়েন্ট পাইয়ে দেন। ক্লফ বুঝতে পেরেছিলেন শিলটনের মতো মানের গোলকিপার দলের বাকি সতীর্থদের মনে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাতেন। ডিফেন্ডাররা নিজেদের অনেক বেশি নিরাপদ মনে করতেন এবং আরও আগ্রাসীভাবে খেলতে পারতেন, কারণ তাঁরা জানতেন পেছনের পোস্টে একজন ত্রাতা আছেন। ফরোয়ার্ডরাও বিশ্বাস করতেন যে ম্যাচ জেতার জন্য তাঁদের হয়তো একটি গোলই যথেষ্ট।

দল যখন চরম বিপদে থাকে, তখন একটি দুর্দান্ত সেভ সতীর্থদের শান্ত রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। প্রতিপক্ষ একের পর এক সহজ সুযোগ বা ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে গোল করতে না পারলে তারাও মানসিকভাবে চাপে পড়ে যায়। এই ধরনের প্রভাবের সঠিক হিসাব রাখা বেশ কঠিন, আর মূল সমস্যা হলো এর বেশির ভাগ কাজই পরোক্ষ। ম্যাচ-পরবর্তী আলোচনায় হয়তো এসব বিষয় সেভাবে আসে না, অথচ ম্যাচের প্রতিটি পদক্ষেপে গোলকিপারের অবদান লুকিয়ে থাকে।

আক্রমণভাগের একজন খেলোয়াড় বেশ কয়েকটি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করতে পারেন, ম্যাচের বেশির ভাগ সময় একদম নিষ্ক্রিয় থাকতে পারেন এবং কেবল শেষ মুহূর্তের একটি গোল করে ঠিকই ম্যাচের নায়ক বনে যেতে পারেন। পক্ষান্তরে একজন গোলরক্ষক নিরানব্বই মিনিট ধরে দুর্দান্ত পারফর্ম করেও কেবল একটি ছোট্ট ভুলের কারণে নিজের পুরো পারফরম্যান্সের সব গৌরব মুহূর্তেই হারাতে পারেন। ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে কানের সেই ভুলটি এর সবচেয়ে নিখুঁত উদাহরণ।

ব্যক্তিগত পুরস্কার অর্জনের জন্য যে ধারাবাহিক গল্প বা ন্যারেটিভ তৈরি করা প্রয়োজন, গোলরক্ষকদের ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত কঠিন। এই কারণেই গোলকিপারদের ছেলেদের ব্যালন ডি’অর জয় করতে দেখা যায় না। এর পরিবর্তে ২০১৯ সাল থেকে শুধু তাঁদের জন্যই প্রবর্তন করা হয়েছে ‘ইয়াশিন ট্রফি’, যা তাঁরা অর্জন করে থাকেন।

ফলে গোলকিপারদের নিয়ে সামগ্রিক আলোচনার ধরনেও এখন পরিবর্তন আনা জরুরি। ক্লিন শিট বা গোলশূন্য ম্যাচগুলোকে কেবল দলীয় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়, যা হয়তো গোলকিপারের শ্রেষ্ঠত্বের পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য পরিমাপক নয়। তবে একজন গোলকিপার ঠিক কতগুলো নিশ্চিত গোল প্রতিহত করেছেন, বক্সের কোন কোন জায়গা নিয়ন্ত্রণ করেছেন, কেমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তাঁর এসব কাজ দলকে কতটা ভিন্নভাবে খেলতে সাহায্য করেছে, সেই হিসাবগুলোও এখন সমানভাবে জরুরি। যদিও এসব বিষয় নিয়ে একেবারে আলোচনা করা হয় না তা নয়, তবে গোল ও অ্যাসিস্টের তুলনায় সেগুলোর চর্চা হয় খুবই কম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
রমজানে ১২ দিন ধরে আল–আকসা বন্ধ, ৮ মুসলিম দেশের নিন্দা

রমজানে ১২ দিন ধরে আল–আকসা বন্ধ, ৮ মুসলিম দেশের নিন্দা