ঢাকা | বঙ্গাব্দ

২০২৭ সালে চিরতরে বন্ধ হচ্ছে লিপ সেকেন্ড

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 22, 2026 ইং
২০২৭ সালে চিরতরে বন্ধ হচ্ছে লিপ সেকেন্ড ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

মুহূর্তের ব্যবধানে চোখের পলক পড়তে না পড়তেই যে সময়টুকু ফুরিয়ে যায়, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের তেমন মাথাব্যথা না থাকলেও, বিগত তিন দশক ধরে বিশ্বের প্রথমসারির গবেষক ও বিজ্ঞানীদের মাঝে এই অতি ক্ষুদ্র এক সেকেন্ড সময়কে ঘিরে চলেছে অত্যন্ত চুলচেরা বিশ্লেষণ ও ব্যাপক তর্কবিতর্ক। অবশেষে গবেষকদের সেই দীর্ঘ আলোচনার অবসান ঘটতে চলেছে, কারণ তাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মানবজাতির সময়ের খাতা বা ক্যালেন্ডার থেকে চিরতরে মুছে যেতে চলেছে বহুল আলোচিত লিপ সেকেন্ড প্রথা।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে এই লিপ সেকেন্ড আসলে কী এবং এটি বাতিল হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের জীবনেই বা এর কী ধরনের প্রভাব পড়বে। মূলত বিজ্ঞানের কোনো জটিল ও তাত্ত্বিক বিষয় বলে এটিকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, কারণ ইন্টারনেট, জিপিএস এবং স্মার্টফোনসহ গোটা পৃথিবীর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবস্থার আগামী দিনের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে এই একক সেকেন্ড বাতিলের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ওপর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই যুগান্তকারী ঘোষণার মধ্য দিয়ে সমগ্র মানবসভ্যতাকে বিজ্ঞানীরা এক ভয়াবহ ও অদ্ভুত বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন, যাকে তারা অভিহিত করেছিলেন নেগেটিভ লিপ সেকেন্ড হিসেবে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ব্যুরো অফ ওয়েটস অ্যান্ড মেজারমেন্টস বা বিআইপিএম সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে যে, আগামী ২০২৭ সালের মে মাসের পর থেকে ঘড়ির কাঁটায় আর কোনো নতুন লিপ সেকেন্ড সংযুক্ত করা হবে না। ঐতিহাসিক তথ্যাবলীর দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে এই নির্দিষ্ট প্রথার সূচনা হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত আমাদের বৈশ্বিক সময়ের সঙ্গে মোট বত্রিশ বার অতিরিক্ত এক সেকেন্ড যোগ করার ঘটনা ঘটেছে।

কেন আমাদের বৈশ্বিক সময়ের সঙ্গে এই একটি মাত্র সেকেন্ড অতিরিক্ত হিসেবে যুক্ত করতে হতো, তা একদম সহজ ও বাস্তবসম্মত উদাহরণের সাহায্যে পরিষ্কার করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ কল্পনা করা যাক, একজন মানুষ এবং একটি নিখুঁত রোবট পাশাপাশি দুটি ট্র্যাকে दौड़ বা দৌড়াচ্ছে, যেখানে রোবটটি বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ একই গতি বজায় রেখে চলতে পারে এবং এর সময়ের মধ্যে কোনো ধরনের নড়চড় হয় না, পক্ষান্তরে মানুষের দৌড়ানোর গতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এখন ওই মানুষ এবং রোবটকে সর্বাবস্থায় একে অপরের পাশাপাশি রাখতে হলে মাঝেমধ্যেই সুনির্দিষ্ট সেই রোবটটিকে ক্ষণিকের জন্য থামিয়ে রেখে মানুষের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, আর ঠিক এই অপেক্ষার কাজটিই এতদিন সম্পাদন করত লিপ সেকেন্ড।

চাঁদ ও পৃথিবীর মধ্যকার জোয়ার-ভাটার প্রবল ঘর্ষণ এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা উত্তপ্ত গলিত লাভার নানাবিধ প্রভাবে আমাদের এই পৃথিবীর লাটিমের মতো ঘূর্ণন গতি ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছিল। যার কারণে পারমাণবিক ঘড়ির অত্যন্ত নিখুঁত সময়ের সঙ্গে পৃথিবীর প্রাকৃতিক মহাজাগতিক সময়ের নির্ভুল তাল মেলাতে মাঝেমধ্যেই ঘড়িতে অতিরিক্ত এক সেকেন্ড যোগ করার প্রয়োজন পড়ত।

সবকিছু অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই চললেও হঠাৎ করে কেন এই সুপ্রাচীন লিপ সেকেন্ড প্রথা চিরতরে বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তার পেছনেও রয়েছে এক সুনির্দিষ্ট কারণ। এতদিন ধরে বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছিলেন যে পৃথিবী ক্রমান্বয়ে ধীর গতিতে ঘুরছে এবং সেই অনুযায়ী তারা ঘড়িতে এক সেকেন্ড করে যোগ করে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সম্প্রতি তারা খেয়াল করলেন যে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি কমার বদলে উল্টো আরও বেশি দ্রুততর হতে শুরু করেছে এবং এর নেপথ্যেও ভূমিকা রাখছে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে মেরু অঞ্চলের বিশাল সব বরফখণ্ড গলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, যার ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিতে এক অভিনব ও অদ্ভুত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং পৃথিবী এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত গতিতে ঘুরছে। এই পুরো বিষয়টি অনেকটা কোনো আইস স্কেটিং খেলোয়াড়ের ঘূর্ণনের মতো, যারা বরফের ওপর ঘোরার সময় নিজেদের হাত গুটিয়ে নিলেই যেমন তাদের ঘূর্ণন গতি হঠাৎ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, গলিত বরফের কারণে বর্তমানে পৃথিবীর দশাও ঠিক একই রকম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত ২০২৪ সালে নেচার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি গবেষণা পত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে পৃথিবী এত বেশি দ্রুত গতিতে আবর্তন করছে যে সম্ভবত আগামী ২০২৯ সালের মধ্যেই মানবজাতিকে প্রথমবারের মতো নেগেটিভ লিপ সেকেন্ড প্রয়োগ করতে হতো, অর্থাৎ ঘড়িতে সেকেন্ড যোগ করার পরিবর্তে উল্টো ঘড়ি থেকেই এক সেকেন্ড জোরপূর্বক সরিয়ে বা গায়েব করে দিতে হতো।

আর ঠিক এই জায়গাতেই বেঁধেছিল মূল বিপত্তি ও বড় ধরনের শঙ্কা। ইতিপূর্বে ঘড়িতে মাত্র এক সেকেন্ড যোগ করার ফলেই বিশ্বের বাঘা বাঘা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বড়সড় গলদঘর্ম অবস্থা তৈরি হতো, যেখানে গুগল কিংবা মেটার মতো টেক জায়ান্টরা সেই অতিরিক্ত এক সেকেন্ডকে সুস্বাদু চুইংগামের মতো টেনেটুনে সারা দিনের সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিত, যাতে তাদের প্রধান সার্ভারগুলো হঠাৎ ক্র্যাশ না করে বসে। এমনকি ২০১২ সালে মাত্র এক সেকেন্ড অতিরিক্ত যোগ করার ফলে বিখ্যাত এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠান কোয়ান্টাসের পুরো অনলাইন বুকিং ও পরিচালনা সিস্টেম সম্পূর্ণ ধসে পড়েছিল। এমতাবস্থায় যদি হঠাৎ করেই ঘড়ি থেকে এক সেকেন্ড পাকাপাকিভাবে গায়েব বা বাদ দিয়ে দেওয়া হতো, তবে তা সমগ্র বিশ্বের ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট এবং ব্যাংকিং সেক্টরে কেমন ভয়াবহ ধস নামাতে পারত, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষিত বা নির্ভরযোগ্য ধারণা কারোরই ছিল না। ফলস্বরূপ, বিজ্ঞানীরা এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা না বাড়িয়ে বরং লিপ সেকেন্ড প্রথাটি চিরতরে বর্জন করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

বিআইপিএমের টাইম ডিপার্টমেন্টের সম্মানিত ডিরেক্টর প্যাট্রিজিয়া তাভেলা জোরালোভাবে নিশ্চিত করেছেন যে মূলত নেগেটিভ লিপ সেকেন্ড সংক্রান্ত এই অজানা ও অপার্থিব ভয় থেকেই তারা সম্মিলিতভাবে এই প্রথা বাতিলের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা আগামী ২০২৭ সালের কুড়ি মে তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হবে।

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, আমরা যদি বৈশ্বিক ঘড়িতে লিপ সেকেন্ড যোগ করা সম্পূর্ণ বন্ধই করে দিই, তবে আমাদের অত্যন্ত নিখুঁত পারমাণবিক ঘড়ির সঙ্গে পৃথিবীর নিজস্ব প্রাকৃতিক সময়ের যে দূরত্ব ও ব্যবধান তৈরি হতে থাকবে, তার ভবিষ্যৎ কী হবে? এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানীদের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য হলো, একটি সেকেন্ড করে জমতে জমতে সময়ের মাঝে বিশাল কোনো ব্যবধান বা পার্থক্য তৈরি হতে হাজার হাজার বছর সময় লেগে যাবে, তাই এ নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের অহেতুক দুশ্চিন্তা করার বা মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজনই নেই। সুদূর ভবিষ্যতে হাজার বছর পর যখন এই সময়ের পুঞ্জীভূত ব্যবধান বাড়তে বাড়তে পুরো এক ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকবে, তখন হয়তো সেই যুগের ভবিষ্যতের মানুষরা একটি লিপ আওয়ার বা অতিরিক্ত এক ঘণ্টা তাদের সময়ের সঙ্গে যুক্ত করে নেবে।

সহজ ও সাবলীল ভাষায় বলতে গেলে, আজকের যুগের বিজ্ঞানীরা আগামী হাজার বছরের দূরের ভবিষ্যতের বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বিরাট ধাঁধা বা অমীমাংসিত সমীকরণ ফেলে রেখে বেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছেন। সবচেয়ে আনন্দের এবং স্বস্তির বিষয় হলো বর্তমানের সাধারণ মানুষকে এ নিয়ে বাড়তি কোনো পরিশ্রম করতে হবে না এবং আমাদের প্রাত্যহিক যান্ত্রিক জীবনের সঙ্গে এক সেকেন্ডের হিসাব মেলাতে না পারার যে দীর্ঘদিনের বিরক্তিকর ও যন্ত্রণাদায়ক ঝামেলা ছিল, তার অবসান ঘটল চিরকালের মতো।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
ফেনীতে বিজিবির অভিযানে বিপুল ভারতীয় মালামাল জব্দ

ফেনীতে বিজিবির অভিযানে বিপুল ভারতীয় মালামাল জব্দ